স্বাস্থ্য সচেতন হতে অনেকেই স্রেফ বিজ্ঞাপনের চটক দেখে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় রাখেন অনেক তথাকথিত স্বাস্থ্যকর খাবার। প্যাকেটের গায়ে ‘হেলদি’, ‘লো ফ্যাট’, ‘ন্যাচারাল’ বা ‘সুগার ফ্রি’ লেখা থাকলে খাবারটিকে স্বাস্থ্যকর ভাবার প্রবণতাও রয়েছে। কিন্তু এসব আকর্ষণীয় শব্দের আড়ালে কখনো কখনো লুকিয়ে থাকতে পারে অতিরিক্ত চিনি, সোডিয়াম, স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও ক্যালরি।
পুষ্টিবিদদের মতে, কোনো খাবারকে শুধু তার নাম, বিজ্ঞাপন কিংবা প্যাকেটের সামনের লেবেল দেখে স্বাস্থ্যকর বলা যায় না। বরং খাবারটির উপাদান, পুষ্টিমান, খাওয়ার পরিমাণ এবং সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস বিবেচনা করা জরুরি।
প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় থাকা এমন পাঁচটি খাবার রয়েছে, যেগুলো স্বাস্থ্যকর মনে হলেও নির্দিষ্ট ধরনের পণ্য বা অতিরিক্ত পরিমাণে খেলে উল্টো সমস্যা তৈরি করতে পারে।
১. ফ্লেভারড বা মিষ্টি দই
দইয়ে প্রোটিন, ক্যালসিয়াম এবং উপকারী ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে। তাই এটি পুষ্টিকর খাবার হিসেবে পরিচিত। তবে বাজারে পাওয়া সব দইয়ের পুষ্টিমান এক নয়। বিশেষ করে ফলের স্বাদযুক্ত, মিষ্টি বা ডেজার্টজাতীয় দইয়ে বাড়তি চিনি থাকতে পারে।
নিয়মিত বেশি চিনি গ্রহণ করলে মোট ক্যালরি গ্রহণ বেড়ে যায়। দীর্ঘমেয়াদে অতিরিক্ত ক্যালরি ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ওজন বৃদ্ধি এবং বিপাকীয় সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
কী করবেন: চিনি ছাড়া সাধারণ দই বেছে নিন। স্বাদ বাড়াতে তাজা ফল বা অল্প পরিমাণ বাদাম যোগ করতে পারেন। প্যাকেটজাত দই কেনার আগে পুষ্টি-তথ্য ও উপাদানের তালিকা দেখে নিন।
২. প্যাকেটজাত ব্রেকফাস্ট সিরিয়াল
সকালের নাশতায় গ্রানোলা কিংবা ব্রেকফাস্ট সিরিয়াল অনেকের পছন্দ। ওটস, বাদাম ও বীজ দিয়ে তৈরি গ্রানোলায় আঁশ ও কিছু উপকারী পুষ্টি উপাদান থাকতে পারে। কিন্তু সব গ্রানোলা সমান স্বাস্থ্যকর নয়।
কিছু পণ্যে মধু, সিরাপ, চিনি, চকোলেট বা অতিরিক্ত তেল যোগ করা হয়। ফলে অল্প পরিমাণ খাবার থেকেও প্রত্যাশার চেয়ে বেশি ক্যালরি পাওয়া যেতে পারে। একইভাবে, পরিশোধিত শস্য ও বাড়তি চিনিযুক্ত কিছু ব্রেকফাস্ট সিরিয়ালে আঁশ কম থাকতে পারে।
কী করবেন: কেনার আগে প্রতি পরিবেশনে মোট চিনি, আঁশ ও ক্যালরির পরিমাণ যাচাই করুন। সম্ভব হলে চিনি ছাড়া ওটস, বাদাম ও বীজ দিয়ে ঘরে তৈরি নাশতা বেছে নিন। প্যাকেটের নির্ধারিত পরিবেশনের আকারও খেয়াল রাখুন।
৩. ফলের জুস ও স্মুদি
ফল ভিটামিন, খনিজ ও আঁশের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। কিন্তু গোটা ফল খাওয়া আর ফলের জুস পান করার মধ্যে বিরাট পার্থক্য রয়েছে। জুস তৈরির সময় ফলের অনেক আঁশ বাদ পড়ে যেতে পারে। আবার বাজারের প্যাকেটজাত জুসে বাড়তি চিনি থাকতে পারে।
এক গ্লাস জুসে একাধিক ফলের সমপরিমাণ রস থাকায় অল্প সময়ে অনেক ক্যালরি ও প্রাকৃতিক চিনি গ্রহণ করা সম্ভব। স্মুদিতেও ফলের পাশাপাশি চিনি, সিরাপ, আইসক্রিম কিংবা মিষ্টি দই যোগ করলে ক্যালরির পরিমাণ দ্রুত বেড়ে যেতে পারে।
কী করবেন: জুসের বদলে গোটা ফল খাওয়াকে অগ্রাধিকার দিন। স্মুদি তৈরি করলে বাড়তি চিনি না দিয়ে পরিমিত ফল ব্যবহার করুন। প্যাকেটজাত পানীয় কেনার আগে উপাদানের তালিকা ও মোট চিনির পরিমাণ দেখুন। ‘১০০ শতাংশ ফলের জুস’ লেখা থাকলেও সেটিকে গোটা ফলের সমতুল্য ভাববেন না।
৪. ডায়েট বিস্কুট ও প্রোটিন বার
ওজন কমানো কিংবা ব্যায়ামের পর দ্রুত খাবার হিসেবে অনেকেই ডায়েট বিস্কুট ও প্রোটিন বার বেছে নেন। কিন্তু ‘ডায়েট’, ‘প্রোটিন’ বা ‘ফিটনেস’ লেখা থাকলেই কোনো পণ্য কম ক্যালরির বা পুষ্টিগতভাবে ভারসাম্যপূর্ণ হয়ে যায় না।
কিছু প্রোটিন বারে বাড়তি চিনি, সিরাপ ও স্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকতে পারে। আবার কিছু ডায়েট বিস্কুটে পরিশোধিত ময়দা, লবণ ও চর্বির পরিমাণও উল্লেখযোগ্য হতে পারে। প্রোটিন বেশি থাকলেও কোনো পণ্যে অন্য পুষ্টি উপাদানের ভারসাম্য ভালো নাও হতে পারে।
কী করবেন: শুধু পণ্যের নাম দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন না। প্রতি পরিবেশনে ক্যালরি, প্রোটিন, মোট চিনি, স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও সোডিয়ামের পরিমাণ তুলনা করুন। বিকল্প হিসেবে পরিমিত বাদাম, গোটা ফল, সেদ্ধ ডিম খেতে পারেন।
৫. প্যাকেটজাত স্যুপ ও ‘স্বাস্থ্যকর’ স্ন্যাকস
তাৎক্ষণিক স্যুপ, ফ্লেভারড ক্র্যাকার, প্যাকেটজাত ভেজিটেবল চিপস এবং কিছু বেকড স্ন্যাকসকে অনেকেই তুলনামূলক স্বাস্থ্যকর মনে করেন। কিন্তু এসব খাবারে সোডিয়াম বা লবণের পরিমাণ বেশি থাকতে পারে। কিছু পণ্যে বাড়তি তেল, পরিশোধিত শর্করা ও স্যাচুরেটেড ফ্যাটও থাকে।
অতিরিক্ত সোডিয়াম গ্রহণ উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। অন্যদিকে, চিপস বা ক্র্যাকারের মতো খাবার অল্প সময়ে বেশি পরিমাণে খাওয়া সহজ হওয়ায় মোট ক্যালরি গ্রহণও বেড়ে যেতে পারে।
কী করবেন: প্যাকেটের সোডিয়াম, চর্বি ও ক্যালরির পরিমাণ যাচাই করুন। স্যুপ তৈরির সময় লবণ কম ব্যবহার করে শাকসবজি, ডাল বা অন্যান্য পুষ্টিকর উপাদান যোগ করতে পারেন। নাশতায় ফল, লবণ ছাড়া বাদাম কিংবা ঘরে তৈরি খাবারকে অগ্রাধিকার দিন।
খাবার কেনার আগে যে বিষয়গুলো খেয়াল রাখবেন
কোনো খাবার স্বাস্থ্যকর কি না, তা বোঝার জন্য কয়েকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—
- উপাদানের তালিকা পড়ুন: চিনি, সিরাপ, গ্লুকোজ, ফ্রুক্টোজ কিংবা সোডিয়ামসমৃদ্ধ উপাদান আছে কি না দেখুন।
- পুষ্টি-তথ্য যাচাই করুন: মোট ক্যালরি, চিনি, সোডিয়াম, স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও আঁশের পরিমাণ তুলনা করুন।
- পরিবেশনের আকার বুঝুন: প্যাকেটে উল্লেখ করা পুষ্টিমান অনেক সময় পুরো প্যাকেটের নয়, নির্দিষ্ট এক পরিবেশনের হিসাব।
- বিজ্ঞাপনের ভাষায় বিভ্রান্ত হবেন না: ‘ন্যাচারাল’, ‘ফিটনেস’, ‘লো ফ্যাট’ বা ‘সুগার ফ্রি’ লেখা থাকলেই খাবারটি সামগ্রিকভাবে স্বাস্থ্যকর—এমন নয়।
- খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য রাখুন: গোটা ফল, শাকসবজি, ডাল, পূর্ণশস্য, বাদাম এবং উপযুক্ত প্রোটিনের উৎস নিয়মিত রাখুন।
স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে কোনো একটি খাবার সম্পূর্ণ বাদ দেওয়ার চেয়ে খাবারের ধরন, উপাদান ও পরিমাণের দিকে নজর দেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দই, গ্রানোলা, জুস বা প্রোটিন বার—কোনোটিই স্বয়ংক্রিয়ভাবে অস্বাস্থ্যকর নয়। সঠিক উপাদানে তৈরি ও পরিমিত পরিমাণে খেলে এগুলোও খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে।
তাই বাজারে খাবার কেনার সময় শুধু প্যাকেটের সামনের আকর্ষণীয় দাবি নয়, পেছনের পুষ্টি-তথ্যও পড়ুন। মনে রাখবেন, স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নেওয়ার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সচেতনভাবে উপাদান যাচাই করা এবং সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসে ভারসাম্য বজায় রাখা।