বিভিন্ন জেলায় রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে শক্তি বাড়ানো, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি এবং চলমান আন্দোলনের পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে দেশব্যাপী গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। রাজধানী থেকে তৃণমূল পর্যন্ত এই কর্মসূচিতে দলের শীর্ষ নেতাদের পাশাপাশি সম্ভাব্য প্রার্থীরাও সক্রিয়। বৈষম্যহীন ও ইনসাফপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ার আহ্বানের পাশাপাশি গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ সাত দফা দাবিতে ১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চের পক্ষেও জনমত তৈরির চেষ্টা করছে দলটি। গণসংযোগে পাওয়া সাড়া স্থানীয় নির্বাচনে কতটা প্রভাব ফেলবে এবং আন্দোলনের পক্ষে কতটা জনসমর্থন তৈরি হবে, এখন সেদিকেই নজর জামায়াতের।
দলটির একাধিক সূত্রে জানা গেছে, মাসব্যাপী কর্মসূচিতে দাওয়াতি কার্যক্রমের পাশাপাশি বই ও লিফলেট বিতরণ, পথসভা এবং সামাজিক ও সেবামূলক উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় এবং অন্য রাজনৈতিক দল থেকে আসা নেতাকর্মীদের দলে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগও ছিল। জামায়াত নেতাদের দাবি, এসব কর্মসূচিতে সাধারণ মানুষের সাড়া পাওয়া গেছে। এখন তৃণমূলের প্রতিবেদন সংগ্রহ করে কার্যক্রমের ফলাফল পর্যালোচনা করবে কেন্দ্র।
সম্প্রতি রাজধানীর ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্সে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের গণসংযোগ কর্মসূচি উদ্বোধন করেন দলের আমির ও সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। ওই অনুষ্ঠানে বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, সাবেক বিচারপতি, ব্যবসায়ী ও কওমি আলেমসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার
৬৫০ জন জামায়াতে যোগ দেন। গণসংযোগের পাশাপাশি দেশজুড়ে সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদারেও বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে জামায়াত। গত ৪ অক্টোবর রাজধানীর হাতিরঝিলের মধুবাগ মাঠে ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা সপ্তাহের উদ্বোধন করে মহানগর উত্তর জামায়াত। ১০ অক্টোবর পর্যন্ত এ কর্মসূচি চলে। একই দিন সিলেটে জেলা ও মহানগর কর্মপরিষদ সদস্যদের শিক্ষাশিবিরে প্রধান অতিথি ছিলেন দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। দিনাজপুরে জেলা জামায়াতের ষাণ¥াসিক রুকন সম্মেলন ও শিক্ষাশিবিরে প্রধান অতিথি ছিলেন মাওলানা এটিএম মাছুম। কক্সবাজারে পৃথক তিনটি শিক্ষাশিবিরে অংশ নেন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম।
এসব কর্মসূচির মধ্য দিয়ে কর্মীদের সক্রিয় করা ও সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে দলটি। গতকাল যশোর প্রেসক্লাবের মিলনায়তনে আগামী ৩১ অক্টোবর অনুষ্ঠিতব্য খুলনা-যশোর-ঝিনাইদহ কুষ্টিয়া লংমার্চের প্রস্তুতির বিষয়ে মতবিনিময় সভা হয়েছে। সেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। তার মতে, সরকার জুজুর ভয় দেখিয়ে গণভোটের রায়, আইনশৃঙ্খলা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের সংকট অস্বীকার করছে বলে অভিযোগ করেন জামায়াত নেতা।
এদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে দলের মেয়র প্রার্থী ও নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোহাম্মদ সেলিম বিভিন্ন স্থানে বুথ স্থাপন করে দলের পরিচিতি ও আদর্শ তুলে ধরছেন। বাসাবাড়ি, অফিস ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে নেতাকর্মীরা দাওয়াতি সামগ্রী বিতরণ করছেন। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং ১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চের দাবিগুলো নিয়েও প্রচার চালানো হচ্ছে। দলীয় নেতাদের মতে, এসব কার্যক্রম নির্বাচনের আগাম প্রস্তুতিতে ভূমিকা রাখছে।
গণসংযোগ উপলক্ষে প্রচারিত লিফলেটে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান দেশবাসীকে দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানান। এতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি ও অবিচারের অবসান, ভোট ও মৌলিক অধিকার সুরক্ষা এবং বৈষম্যহীন, শান্তিপূর্ণ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় তুলে ধরা হয়।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখেও সক্রিয় রয়েছে জামায়াত। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে নির্বাচনের উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে দলটি। গত ১৬ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন, নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না এবং সরকারের নির্দেশনায় পরিচালিত হচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে দলীয় লোকদের বসানো হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তার দাবি, সব প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ, নিরাপদ পরিবেশ এবং প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষ ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় নির্বাচনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে নেতাকর্মীদের আগাম প্রস্তুতির ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন গোলাম পরওয়ার। তার মতে, জনগণের সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ, জনকল্যাণমূলক কাজে অংশগ্রহণ এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মাধ্যমে মানুষের আস্থা অর্জন করতে হবে। জনগণের সঙ্গে দূরত্ব না বাড়িয়ে তাদের কথা শুনতে হবে এবং নির্বাচনের জন্য সুপরিকল্পিত কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।
এ নিয়ে ময়মনসিংহ জেলা ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি ও উদ্যোক্তা মো. শামসুদ্দোহা মাসুম আমাদের সময়কে বলেন, কেন্দ্র থেকে নেতাকর্মীদের দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখার পাশাপাশি চলমান আন্দোলনে সম্পৃক্ততা বাড়ানোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে। তার ভাষ্য, পদ-পদবির বিষয়কে গুরুত্ব না দিয়ে তারা দলের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল হালিম আমাদের সময়কে বলেন, রাজনৈতিক দল হিসেবে সারা বছরই জনসংযোগ চালাতে হয়। তবে বার্ষিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সেপ্টেম্বরজুড়ে গণসংযোগ কর্মসূচি পালন করা হয়েছে, যা অক্টোবরেও চলছে। এর আগে আগস্টে মহিলা শাখার গণসংযোগ অনুষ্ঠিত হয়। এবার সাধারণ মানুষের সঙ্গে সংগঠন ও আন্দোলনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মতবিনিময়ের পাশাপাশি আগ্রহীদের মধ্যে দলের পরিচিতি ও বই বিতরণ করা হয়েছে।
তার দাবি, আগে নানা বাধা-প্রতিবন্ধকতা থাকলেও বর্তমানে জামায়াত সম্পর্কে সাধারণ মানুষের আগ্রহ বেড়েছে। গণসংযোগ শেষে তৃণমূলের বিভিন্ন ইউনিটের প্রতিবেদন সংগ্রহ করে কার্যক্রমের ফলাফল পর্যালোচনা করা হবে।
তবে গণসংযোগের পাশাপাশি আন্দোলনের কৌশল নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে উল্লেখ করে রাজনৈতিক বিশ্লেষক হাসনাত কাইয়ূম বলেন, বিশেষ পরিস্থিতিতে নির্দিষ্ট দাবি আদায়ে লংমার্চ কার্যকর হতে পারে। কিন্তু ঘন ঘন এ ধরনের কর্মসূচি দিলে এর গুরুত্ব ও কার্যকারিতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক সারোয়ার জাহান বলেন, দায়িত্বশীল বিরোধী দলের কাজ শুধু সরকারের ভুল ধরিয়ে দেওয়া নয়; কোন সিদ্ধান্ত জনস্বার্থে ইতিবাচক এবং কোথায় সংশোধন প্রয়োজন, সেটিও তুলে ধরা প্রয়োজন। কেবল প্রতিবাদ করার জন্য প্রতিবাদ করলে দীর্ঘ মেয়াদে ইতিবাচক ফল নাও আসতে পারে। সরকারকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে বিরোধী দলের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
