বিদেশে ভালো বেতনের চাকরি, পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা আর ঋণমুক্ত জীবনের স্বপ্ন নিয়ে রাশিয়ায় গিয়েছিলেন প্রায় ৩০ বাংলাদেশি। নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে কাজ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের কাছ থেকে গড়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা করে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর পর সেই স্বপ্নই পরিণত হয় দুঃস্বপ্নে। পাসপোর্ট ও মুঠোফোন কেড়ে নিয়ে তাদের রুশ সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। মাত্র ২১ দিনের সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে পাঠানো হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সম্মুখসারিতে। সেখানে প্রথম দিনেই ড্রোন হামলায় প্রাণ হারান ১৭ জন। পরে আরও তিনজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে ২০ বাংলাদেশির মৃত্যুর বিষয়ে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি ব্যুরো (এসআরবি)। বেঁচে ফেরা দুজনের শরীরে যুদ্ধের ক্ষত, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরও দুজন। আর ছয়জন এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে রয়েছেন। মানব পাচারের এই অভিযোগের তদন্তে উঠে এসেছে দেশীয় চক্রের পাশাপাশি রাশিয়া ও কিরগিজস্তানের দুই ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার তথ্য।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান এসআরবি-১০ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহা. আসাদুজ্জামান।
এসআরবির প্রাথমিক অনুসন্ধান অনুযায়ী, চলতি বছরের ৭ মে জাবালে নূর, আরএস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপ নামের তিনটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় ৩০ বাংলাদেশিকে রাশিয়ায় পাঠানো হয়। নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে চাকরির আশ্বাস দিয়ে তাদের কাছ থেকে গড়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা আদায় করা হয়েছিল। কেউ ঋণ করে, কেউ পরিবারের সঞ্চয় বা সম্পদ বিক্রি করে এই অর্থ জোগাড় করেন। কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর প্রতিশ্রুত কর্মস্থলে নেওয়ার পরিবর্তে তাদের পাসপোর্ট ও মুঠোফোন কেড়ে নেওয়া হয় এবং রুশ সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয় বলে প্রাথমিক তদন্তে জানতে পেরেছে এসআরবি। এরপর মাত্র ২১ দিনের সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে তাদের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের বিভিন্ন অংশে মোতায়েন করা হয়। সংস্থাটির ভাষ্য, এসব বাংলাদেশির যুদ্ধ করার মতো প্রয়োজনীয় দক্ষতা, শারীরিক প্রস্তুতি ও কৌশলগত প্রশিক্ষণ ছিল না। এত অল্প সময়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
সংবাদ সম্মেলনে এসআরবির কর্মকর্তা মোহা. আসাদুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশ থেকে যাওয়া ব্যক্তিদের যুদ্ধ করার মতো যোগ্যতা বা যথাযথ প্রস্তুতি ছিল না। এত অল্প সময়ের প্রশিক্ষণ শেষে তাদের সম্মুখসারিতে পাঠানোর বিষয়টি উদ্বেগজনক।
প্রথম দিনেই প্রাণ গেল ১৭ জনের: যুদ্ধক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের মোতায়েন করা হয়েছিল প্রথম সারি, মধ্যভাগ ও শেষভাগ—এই তিনটি অংশে। এসআরবির প্রাথমিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সেখানে প্রথম দিনেই ড্রোন হামলায় ১৭ জনের মৃত্যু হয়। পরবর্তী সময়ে আরও তিনজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে প্রায় ৩০ জনের মধ্যে ২০ জনের মৃত্যুর বিষয়ে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে সংস্থাটি।
জীবিতদের মধ্যে দুজন আহত অবস্থায় বাংলাদেশে ফিরেছেন। অন্য দুজন মস্কোর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। বাকি ছয়জন এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে রয়েছেন বলে জানিয়েছে এসআরবি।
তবে নিহতদের পূর্ণাঙ্গ পরিচয়, মরদেহ কোথায় রয়েছে এবং সেগুলো দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া সম্পর্কে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত জানানো হয়নি। ফলে স্বজন হারানো পরিবারগুলোর সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—প্রিয়জনের শেষ পরিণতি কী এবং তাদের মরদেহ আদৌ দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে কি না।
যেসব পরিবার ধারদেনা করে সন্তানদের বিদেশে পাঠিয়েছিল, তাদের জন্য এই অনিশ্চয়তা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। একদিকে উপার্জনের আশায় বিনিয়োগ করা বিপুল অর্থ হারানোর আশঙ্কা, অন্যদিকে স্বজনের মৃত্যু কিংবা নিখোঁজ থাকার দুশ্চিন্তা—দুই সংকটেই পড়েছে পরিবারগুলো।
আহত রাজনের শরীরে যুদ্ধের ক্ষত: যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আহত অবস্থায় দেশে ফেরা ব্যক্তিদের একজন ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের রাজন হোসেন (২১)। নির্মাণকাজের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাকে ৮ লাখ ২৫ হাজার টাকার বিনিময়ে রাশিয়ায় পাঠানো হয়েছিল। গত ৭ মে দেশটিতে পৌঁছানোর পর অন্য বাংলাদেশিদের মতো তাকেও রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ।
প্রশিক্ষণ শেষে যুদ্ধের সম্মুখসারিতে পাঠানো হলে ড্রোন হামলায় রাজনের কোমরের হাড় ভেঙে যায়। শরীরের নিচের অংশের শক্তি হারিয়ে ফেলেন তিনি। এসআরবির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আহত অবস্থায় বুকের ওপর ভর দিয়ে প্রায় চার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে তিনি ক্যাম্পে পৌঁছান। এরপর চার দিন কষ্ট করে হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নেন।
একপর্যায়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে দূতাবাসের সহায়তায় গত ২৩ আগস্ট বাংলাদেশে ফেরেন রাজন। তবে দেশে ফিরে শারীরিক ক্ষতির পাশাপাশি নতুন সংকটের মুখে পড়েন তিনি ও তার পরিবার।
ক্ষতিপূরণ দাবি করায় মিজানুর রহমান নামের এক ব্যক্তি রাজনের পরিবারের সদস্যদের গালিগালাজ, মারধরের চেষ্টা এবং প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় রাজনের বাবার অভিযোগের ভিত্তিতে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ থানায় মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইনে মামলা করা হয়। সেই মামলার তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই অভিযানে নামে এসআরবি। অর্থাৎ, বিদেশে চাকরির নামে প্রতারণার অভিযোগের পাশাপাশি দেশে ফেরার পর ভুক্তভোগী পরিবারের ওপর চাপ প্রয়োগের অভিযোগও এখন তদন্তের আওতায় এসেছে।
গ্রেপ্তার দুজন, তদন্তে বিদেশি যোগসূত্র: গত মঙ্গলবার ফরিদপুরের নগরকান্দা থানার আটাইল এলাকায় অভিযান চালিয়ে মিজানুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে এসআরবি-১০-এর একটি দল। একই দিন ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ এলাকা থেকে আবু তাহের ওরফে লেন্টুকে গ্রেপ্তার করে এসআরবি-৬।
এসআরবির প্রাথমিক অনুসন্ধানে এই চক্রের সঙ্গে রাশিয়ার ইগর নামের এক ব্যক্তি এবং কিরগিজস্তানের জুলিয়া নামের এক নারীর সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। চক্রের আরেক সদস্য মোস্তাফিজুরকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। অন্য সদস্যদের শনাক্ত করতেও তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
তবে বিদেশি দুই ব্যক্তির সুনির্দিষ্ট ভূমিকা, নিয়োগের নামে অর্থ আদায়ের পুরো প্রক্রিয়া এবং বাংলাদেশ থেকে রাশিয়া পর্যন্ত লোক পাঠানোর ব্যবস্থাপনায় কারা জড়িত—এসব বিষয়ে তদন্তের চূড়ান্ত ফল এখনো জানা যায়নি। ফলে শুধু কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেই পুরো চক্রের কার্যক্রম ও দায় নির্ধারণ করা সম্ভব নয়; তদন্তে অর্থের লেনদেন, নিয়োগের প্রতিশ্রুতি এবং বিদেশে পৌঁছানোর পর কী ঘটেছিল, সেসব বিষয়ও স্পষ্ট হওয়া জরুরি।
দরিদ্র পরিবারের স্বপ্নকে পুঁজি: এসআরবির ভাষ্য অনুযায়ী, রাশিয়ায় যাওয়া বাংলাদেশিদের বাড়ি গোপালগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ, জামালপুর, পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ফরিদপুর, রাজবাড়ী ও গাজীপুরসহ বিভিন্ন জেলায়। তাদের অধিকাংশই দরিদ্র পরিবারের সন্তান।
উন্নত জীবনের আশায় কেউ ঋণ করেছেন, কেউ জমি বা সম্পদ বিক্রি করেছেন। পরিবারের আর্থিক অবস্থা বদলে দেওয়ার প্রত্যাশায় তারা বিদেশে পাড়ি জমালেও এখন সেই পরিবারগুলো উপার্জনক্ষম সদস্য হারানোর শোক, ঋণের বোঝা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। ঘটনাটি বিদেশে কর্মসংস্থানের নামে প্রতারণা ও মানবপাচারের ঝুঁকিকে নতুন করে সামনে এনেছে। বৈধ চাকরির প্রতিশ্রুতি, আকর্ষণীয় বেতন কিংবা বিদেশে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়ার আশ্বাসের আড়ালে কীভাবে মানুষকে বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে ফেলা হতে পারে, এই ঘটনা তারই একটি গুরুতর উদাহরণ।
বিশেষ করে বিদেশে পৌঁছানোর পর পাসপোর্ট ও মুঠোফোন কেড়ে নেওয়া এবং সম্মতি ছাড়া সামরিক বাহিনীতে যুক্ত করার অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে তা শুধু প্রতারণার নয়, ব্যক্তির স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার গুরুতর লঙ্ঘনের বিষয়ও হয়ে দাঁড়ায়।
