৩৩ মিনিট আগে
সর্বশেষ আপডেট: ৩৩ মিনিট আগে
ডা. সিফাত তানজিলা
ছবি: সংগৃহীত
এক সময় পেটের বড় অংশ কেটে ইনসিশনাল হার্নিয়ার অপারেশন করা হতো। চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে অস্ত্রোপচারের পদ্ধতিতে এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। বর্তমানে আধুনিক ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারির মাধ্যমে কয়েকটি ছোট ছিদ্র করে এই রোগের সমাধান সম্ভব।
এতে রোগীর ক্ষত শুকাতে ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে কম সময় লাগে।
ইনসিশনাল হার্নিয়া কী?
অতীতে যদি কারও অস্ত্রোপচার হয়ে থাকে, কখনো কখনো সেই কাটা স্থানে পেটের দেয়াল দুর্বল হয়ে যায়। ওই স্থান দিয়ে পেটের ভেতরের চর্বি বা অন্ত্রের অংশ বাইরে ফুলে ওঠাকে ইনসিশনাল হার্নিয়া বলে। নারীদের ক্ষেত্রে সিজারিয়ান সেকশন, জরায়ু অপসারণ, ডিম্বাশয়ের অপারেশন ও পেটের বিভিন্ন অস্ত্রোপচারের ইতিহাস থাকলে ইনসিশনাল হার্নিয়া দেখা দিতে পারে।
তবে এটি যে নারীদেরই বেশি হয়, এমন নয়। এর ঝুঁকি মূলত পূর্ববর্তী অস্ত্রোপচারের ধরন ও শারীরিক অন্যান্য অবস্থার ওপর নির্ভর করে। বিশেষ করে পেটে একাধিকবার অস্ত্রোপচার ও পরবর্তীতে ক্ষতস্থানে সংক্রমণ, স্থূলতা, ডায়াবেটিস, ধূমপান, দীর্ঘস্থায়ী কাশি এর ঝুঁকি বাড়তে পারে।
কীভাবে বুঝবেন ইনসিশনাল হার্নিয়া হয়েছে?
পেটে আগে অস্ত্রোপচারের সেলাইয়ের আশপাশে ফোলা বা চাকা দেখা দিলে ইনসিশনাল হার্নিয়ার আশঙ্কা বিবেচনা করতে হবে। সাধারণত দাঁড়ালে, কাশলে, ভারী কাজ করলে বা পেটে চাপ দিলে ফোলাটি বেশি বোঝা যায়। আবার শুয়ে পড়লে অনেক সময় তা ছোট হয়ে যায় বা মিলিয়ে যায়। কারও কারও ক্ষেত্রে পেটে টান, অস্বস্তি বা ব্যথাও থাকতে পারে।
তবে হঠাৎ তীব্র ব্যথা, ফুলে যাওয়া, শক্ত হয়ে যাওয়া, বমি অথবা পায়খানা বন্ধ হয়ে গেলে বুঝতে হবে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন। এগুলো অন্ত্র আটকে যাওয়ার লক্ষণ হতে পারে।
আল্ট্রাসনোগ্রাফিতে সব সময় হার্নিয়া ধরা পড়ে না কেন?
অনেক রোগী অভিযোগ করেন, পেটে অস্ত্রোপচারের স্থানে ফোলা থাকলেও আল্ট্রাসনোগ্রাফি রিপোর্টে হার্নিয়া পাওয়া যায়নি।
শুয়ে থাকায় অনেকের ক্ষেত্রে হার্নিয়া ভেতরে চলে যায়। বিশেষ করে ছোট হার্নিয়া ও স্থূল রোগীর ক্ষেত্রে এমন হতে পারে—এমন অবস্থায় সাধারণ আল্ট্রাসনোগ্রাফিতে হার্নিয়া শনাক্ত করা কখনো কখনো কঠিন হতে পারে।
হার্নিয়া জটিল বা বড় হলে কিংবা অপারেশনের পরিকল্পনার জন্য সিটি স্ক্যান বিশেষভাবে কার্যকর। এতে পেটের দেয়ালের ত্রুটির আকার, সংখ্যা, অবস্থান, হার্নিয়ার ভেতরে থাকা অঙ্গ ও পেশীর অবস্থা স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। তবে প্রত্যেক রোগীর সিটি স্ক্যান প্রয়োজন হয় না।
বড় করে পেট না কেটে ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারি কেন?
ইনসিশনাল হার্নিয়ার চিকিৎসায় আগে পূর্ববর্তী অপারেশনের দাগ বরাবর বড় করে কেটে অস্ত্রোপচার করা হতো। এখনো কিছু বড় ও জটিল হার্নিয়ায় ওপেন সার্জারিই বেশি উপযুক্ত হতে পারে।
তবে নির্বাচিত রোগীদের ক্ষেত্রে অ্যাডভান্সড ল্যাপারোস্কোপিক পদ্ধতিতে ছোট কয়েকটি ছিদ্র দিয়ে ক্যামেরা ও বিশেষ যন্ত্র প্রবেশ করিয়ে হার্নিয়ার সমাধান সম্ভব।
এই পদ্ধতির সম্ভাব্য সুবিধাগুলো হলো—
অপারেশনের তুলনামূলক ছোট ক্ষত হয়।
ক্ষতস্থানে সংক্রমণের ঝুঁকি কম হতে পারে।
অপারেশন-পরবর্তী ব্যথা তুলনামূলক কম হতে পারে।
তুলনামূলক কম সময়ে স্বাভাবিক দৈনন্দিন কাজে ফেরা যায়।
বড় কাটার পরিবর্তে ছোট দাগ হয়।
পেটের ভেতরে হার্নিয়ার অবস্থান ও অন্যান্য ত্রুটি পর্যবেক্ষণের সুবিধা হয়।
তবে ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারি সবার জন্য সমানভাবে উপযুক্ত নয়। রোগীর হার্নিয়ার আকার, পূর্ববর্তী অপারেশন, পেটের ভেতরের আঠালো অবস্থা ও সার্জনের অভিজ্ঞতা বিবেচনা করে পদ্ধতি নির্বাচন করতে হয়।
ল্যাপারোস্কোপিক হার্নিয়া সার্জারিতে ৬টির পরিবর্তে ৩টি ছিদ্র!
আধুনিক ল্যাপারোস্কোপিক হার্নিয়া সার্জারিতে অনেক ক্ষেত্রেই মাত্র তিনটি ছোট পোর্ট বা ছিদ্র করে অপারেশন সম্পন্ন করা সম্ভব। আগে কিছু জটিল অপারেশনে পাঁচ থেকে ছয়টি পোর্টের প্রয়োজন হতো। উন্নত যন্ত্রপাতি ও সার্জিক্যাল দক্ষতার কারণে নির্বাচিত ক্ষেত্রে কম পোর্ট ব্যবহার করা যায়।
তবে মনে রাখতে হবে, কম ছিদ্র মানেই সব সময় ভালো অপারেশন নয়।
আধুনিক বায়োলজিক্যাল ও বায়োডিগ্রেডেবল মেশ: শরীরের সঙ্গে কীভাবে কাজ করে?
ইনসিশনাল হার্নিয়া অপারেশনে পেটের দুর্বল দেয়ালকে শক্তিশালী করতে অনেক ক্ষেত্রেই মেশ ব্যবহার করা হয়।
বর্তমানে স্থায়ী সিনথেটিক মেশের পাশাপাশি বিশেষ পরিস্থিতিতে বায়োলজিক্যাল এবং ধীরে ধীরে শোষিত হওয়া বায়োঅ্যাবজর্বেবল বা বায়োডিগ্রেডেবল মেশও ব্যবহার করা হয়।
বায়োলজিক্যাল মেশ সাধারণত প্রক্রিয়াজাত জৈব টিস্যু দিয়ে তৈরি। এটি শরীরের টিস্যুর সঙ্গে একীভূত হয়ে পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারে। অন্যদিকে নির্দিষ্ট ধরনের বায়োঅ্যাবজর্বেবল মেশ সময়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে ভেঙে শোষিত হয়।
তবে বায়োলজিক্যাল ও বায়োডিগ্রেডেবল মেশ এক জিনিস নয়। সব মেশ শরীরে সম্পূর্ণ মিশে যায় না এবং সব ধরনের মেশের স্থায়িত্ব ও পুনরায় হার্নিয়া হওয়ার ঝুঁকিও সমান নয়।
বর্তমানে অনেক সাধারণ ইনসিশনাল হার্নিয়ার ক্ষেত্রে স্থায়ী সিনথেটিক মেশই কার্যকর ও প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসা। বিশেষ মেশ ব্যবহারের সিদ্ধান্ত রোগীর অবস্থা, অপারেশনের ধরন, সংক্রমণের ঝুঁকি ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ বিবেচনা করে নিতে হয়।
হার্নিয়া অপারেশনের পর কি আবার সন্তান নেওয়া সম্ভব?
এটি নারীদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন। আগে অনেক রোগীকে পরিবার সম্পূর্ণ করার পর হার্নিয়া অপারেশনের পরামর্শ দেওয়া হতো। কারণ গর্ভধারণে পেটের দেয়াল প্রসারিত হয় এবং মেরামত করা হার্নিয়ার ওপর চাপ পড়তে পারে।
আধুনিক ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারি এবং উন্নত মেশের কারণে হার্নিয়া অপারেশনের পরও অনেক ক্ষেত্রে গর্ভধারণ সম্ভব। অপারেশনের ছয় মাস পরই প্রত্যেক নারী নিরাপদে গর্ভধারণ করতে পারবেন—সেটা বলা যায় না। হার্নিয়ার আকার, অপারেশনের ধরন, মেশের অবস্থান, অপারেশনের পর সুস্থতা এবং ভবিষ্যৎ গর্ভধারণের পরিকল্পনা বিবেচনা করতে হয়।
যাদের পরিবার বাড়ানোর পরিকল্পনা থাকে, তাদের অবশ্যই চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে নিতে হবে। কারণ ছোট ও উপসর্গহীন হার্নিয়ার ক্ষেত্রে কখনো কখনো সন্তান নেওয়ার পর অপারেশন করাই যুক্তিযুক্ত হতে পারে।
ল্যাপারোস্কোপিক অপারেশনের পর হার্নিয়া পুনরায় হওয়ার ঝুঁকি কতটা?
আধুনিক সার্জারির অন্যতম লক্ষ্য হলো হার্নিয়া পুনরায় হওয়ার ঝুঁকি কমানো। সঠিকভাবে পেটের দেয়ালের ত্রুটি মেরামত, উপযুক্ত মেশ নির্বাচন, পর্যাপ্ত মেশ কভারেজ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পেশী ও ফ্যাসিয়া পুনর্গঠনের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি ভালো ফলাফল পাওয়া সম্ভব।
তবে ল্যাপারোস্কোপিক অপারেশন করলেই হার্নিয়া আর কখনো হবে না, এমন নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না। রোগীর স্থূলতা, ডায়াবেটিস, ধূমপানের অভ্যাস, ক্ষতস্থানে সংক্রমণ, হার্নিয়ার আকার ও ভবিষ্যতে গর্ভধারণের মতো বিষয়গুলো পুনরায় হার্নিয়া হওয়ার ঝুঁকিকে প্রভাবিত করে। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে ওপেন অথবা রোবোটিক পদ্ধতিও সমানভাবে বা বেশি উপযোগী হতে পারে।
অপারেশনের পর কী কী সতর্কতা প্রয়োজন?
হার্নিয়া অপারেশনের পর ভালো ফলাফলের জন্য রোগীর নিজের যত্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম থেকেই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী হালকা হাঁটাহাঁটি শুরু করা উচিত। তবে ভারী বস্তু তোলা, অতিরিক্ত চাপ দেওয়া ও কঠোর ব্যায়াম সাধারণত চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত সীমিত রাখতে হয়।
এছাড়া কোষ্ঠকাঠিন্য ও দীর্ঘস্থায়ী কাশি নিয়ন্ত্রণ, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, পর্যাপ্ত পুষ্টি গ্রহণ এবং নিয়মিত ফলোআপ জরুরি।
অপারেশনের ক্ষত লাল হয়ে গেলে, জ্বর বা অস্বাভাবিক ব্যথা হলে, পুঁজ বের হলে কিংবা নতুন করে ফুলে গেলে দ্রুত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।
হার্নিয়া শুধু পেটের একটি ফোলা অংশ নয়; এটি পেটের দেয়ালের গঠনগত দুর্বলতা, যার যথাযথ মূল্যায়ন ও চিকিৎসা প্রয়োজন।
অ্যাডভান্সড ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারি ইনসিশনাল হার্নিয়ার চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। ছোট ছিদ্র, উন্নত ক্যামেরা, আধুনিক সার্জিক্যাল কৌশল ও উপযুক্ত মেশ ব্যবহারের মাধ্যমে অনেক রোগী কম ক্ষত নিয়ে দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারেন।
সচেতনতা, সময় মতো রোগ নির্ণয় ও সঠিক চিকিৎসাই সুস্থ জীবনের চাবিকাঠি।
লেখক: কনসালট্যান্ট, জেনারেল, ল্যাপারোস্কোপিক ও ব্রেস্ট সার্জারি, ল্যাব এইড হাসপাতাল
