The Sangbad · সাধারণ
লাল দুর্গা: তিন শ বছরের ঐতিহ্যে আজও জাগ্রত দেবী
১৭/১০/২০২৬

সাধারণত দুর্গোৎসবের প্রতিমায় যে গৌরবর্ণ বা স্বর্ণাভ রূপ দেখা যায়, তার ব্যতিক্রম চোখে পড়ে সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলার পাঁচগাঁও গ্রামে। এখানকার দেবী দুর্গা পূজিত হন রক্তবর্ণ বা গাঢ় লাল রূপে। প্রায় তিন শ বছরের প্রাচীন এই পূজার সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক সাধকের সাধনা, কামাখ্যাধামকে ঘিরে প্রচলিত অলৌকিক কাহিনি এবং ইতিহাসের নানা বাঁক। মুক্তিযুদ্ধের ক্ষত ও নানা প্রতিকূলতা পেরিয়েও এই ঐতিহ্যের প্রদীপ আজও জ্বলছে।কামাখ্যাধাম ও সর্বানন্দ দাসের সাধনাপাঁচগাঁওয়ের রক্তবর্ণা দুর্গার ইতিহাসের প্রধান চরিত্র সর্বানন্দ দাস। প্রায় তিন শ বছর আগে তিনি আসামের শিবসাগর জেলায় মুন্সি পদে কর্মরত ছিলেন। এক শারদীয় দুর্গোৎসবের সময় তিনি কামাখ্যাধামে গিয়ে কুমারীপূজা করার সিদ্ধান্ত নেন। মহাষ্টমীর দিন এক পাঁচ বছর বয়সী কুমারীকে দেবীজ্ঞানে ষোড়শোপচারে পূজা করেন তিনি। পূজা শেষে কুমারীকে প্রণাম করতে গিয়ে তিনি দেখতে পান, তার গায়ের বর্ণ লাল হয়ে উঠেছে। প্রচলিত কাহিনি অনুসারে, কুমারীরূপী দেবী তাকে আশ্বস্ত করে জানান, এই রূপেই তিনি পাঁচগাঁওয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন, তাই ভবিষ্যতেও তাকে লাল বর্ণেই পূজা করতে হবে। দেবী তাকে নিজের মাথার সোনার সিঁথি খুলে দিয়ে মহাস্নানের সময় তা ব্যবহারের নির্দেশ দেন।অলৌকিক নির্দেশনা ও স্থানীয় বিরোধিতাকামাখ্যাধাম থেকে ফিরে সর্বানন্দ দাস পাঁচগাঁওয়ে প্রতিমাকে লাল রঙে রাঙানোর উদ্যোগ নিলে গ্রামবাসীরা তীব্র আপত্তি জানান। শাস্ত্রীয় রীতির বাইরে গিয়ে লাল প্রতিমা নির্মাণকে অনেকে পাগলামি বলে উড়িয়ে দেন এবং ষষ্ঠীর রাত পর্যন্ত কেউ মণ্ডপে আসেননি। তবে রাতের শেষ প্রহরে গ্রামবাসী ও পুরোহিতরা স্বপ্নাদেশ পান যে দেবীকেই লাল বর্ণেই পূজা করতে হবে। এরপর থেকেই পাঁচগাঁওয়ে শুরু হয় রক্তবর্ণা দুর্গার ব্যতিক্রমী পূজা।সোনার সিঁথির উত্তরাধিকারপাঁচগাঁওয়ের পূজার সবচেয়ে বড় পবিত্র নিদর্শন হলো কামাখ্যাধাম থেকে প্রাপ্ত সেই সোনার সিঁথি। বহু প্রতিকূলতা ও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্যেও এই অলংকারটি সযত্নে রক্ষা করা হয়েছে। প্রতি বছর মহাস্নানের সময় সিঁথিটি ব্যবহার করার রীতি বংশপরম্পরায় আজও পালন করা হচ্ছে।মুক্তিযুদ্ধের ক্ষত ও বিশ্বাসের ধারাবাহিকতা১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পুরো গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হলেও অলৌকিক কারণে মণ্ডপটি রক্ষা পেয়েছিল। সে বছর বড় আয়োজন সম্ভব না হলেও মণ্ডপসংলগ্ন বাড়ির বাসিন্দা পরেশচন্দ্র নাথ একটি ঘট স্থাপন করে দেবীর আরাধনা করেছিলেন। যুদ্ধ শেষে ১৯৭২ সালে এলাকাবাসীর সম্মিলিত উদ্যোগে মণ্ডপটি পাকা করে নতুনভাবে পূজার আয়োজন শুরু হয়।আজ পাঁচগাঁওয়ের রক্তবর্ণা দুর্গাপূজা শুধু একটি পরিবারের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই; এটি মৌলভীবাজার তথা দেশের অন্যতম ঐতিহাসিক ও আকর্ষক পূজামণ্ডপ। লাল বর্ণের প্রতিমা, দীর্ঘদিনের পারিবারিক রীতি এবং সোনার সিঁথিকে ঘিরে থাকা ঐতিহ্য দেখতে দেশ-বিদেশের হাজারো ভক্ত ও দর্শনার্থী সেখানে সমবেত হন।
মূল প্রতিবেদনে যান ↗