বাংলাদেশে কওমি মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রার ১২৫ বছর পেরিয়েছে। এ সময়ে দেশজুড়ে গড়ে উঠেছে অসংখ্য মাদরাসা, বেড়েছে শিক্ষার্থী ও শিক্ষা কার্যক্রম। কিন্তু এই দীর্ঘ পথচলায় সাধারণ শিক্ষকদের বেতন ও পেশাগত নিরাপত্তার ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসেনি।
- শিক্ষকদের জন্য কোনো বেতন নীতিমালা নেই প্রায় সবাই ন্যায্য বেতন বঞ্চিত
- মাসে ৭ থেকে ১৫ হাজার টাকায় চলে অধিকাংশ শিক্ষকের সংসার; নেই অভিন্ন বেতনকাঠামো ও চাকরির নিশ্চয়তা
আবিদ উল্যাহ জাকের
বাংলাদেশে কওমি মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রার ১২৫ বছর পেরিয়েছে। এ সময়ে দেশজুড়ে গড়ে উঠেছে অসংখ্য মাদরাসা, বেড়েছে শিক্ষার্থী ও শিক্ষা কার্যক্রম। কিন্তু এই দীর্ঘ পথচলায় সাধারণ শিক্ষকদের বেতন ও পেশাগত নিরাপত্তার ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসেনি। এখনো অনেক শিক্ষক মাসে ৭ থেকে ১৫ হাজার টাকা বেতনে দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমান বাজারে এই অর্থ দিয়ে পরিবারের ন্যূনতম চাহিদা পূরণ করাও কঠিন।
অনেক শিক্ষককে নিজের পাশাপাশি স্ত্রী, সন্তান এবং অনেক ক্ষেত্রে বৃদ্ধ মা-বাবার দায়িত্বও বহন করতে হয়। চিকিৎসা, বাড়ি ভাড়া ও সন্তানদের পড়াশোনার খরচ মেটাতে গিয়ে অনেকেই হিমশিম খান। ফলে শিক্ষকতার পাশাপাশি কেউ মসজিদে ইমামতি করছেন, কেউ খতিবের দায়িত্ব পালন করছেন, আবার কেউ ব্যক্তিগতভাবে শিক্ষার্থী পড়িয়ে বা ছোটখাটো ব্যবসা করে সংসারের ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করছেন।
কওমি মাদরাসার শিক্ষকদের জন্য নেই কোনো কেন্দ্রীয় বেতন নীতিমালা। একজন শিক্ষক কত টাকা বেতন পাবেন, কখন বেতন বাড়বে কিংবা কী সুযোগ-সুবিধা পাবেন, তা নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা ও পরিচালকদের সিদ্ধান্তের ওপর। কোথাও নিয়মিত বেতন দেওয়া হলেও কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে মাসের পর মাস বেতন বকেয়া থাকে। নিয়োগপত্র, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, ছুটি ও চাকরির শর্ত নিয়েও অনেক প্রতিষ্ঠানে লিখিত নীতিমালা নেই। ফলে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেও পেশাগত নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকতে হয় তাঁদের।
দেশের অধিকাংশ কওমি মাদরাসা পরিচালিত হয় সাধারণ মানুষের দান-অনুদান, শিক্ষার্থীদের বেতন এবং বিভিন্ন ধর্মীয় আয়োজন থেকে সংগৃহীত অর্থে। এসব অর্থ শিক্ষার্থীদের থাকা-খাওয়া, শিক্ষা উপকরণ, অবকাঠামো ও শিক্ষকদের বেতন-ভাতায় ব্যয় হয়। তবে সব প্রতিষ্ঠানে আয়-ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণ ও প্রকাশের অভিন্ন ব্যবস্থা নেই। কিছু শিক্ষকের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানের আয় ও ব্যয়ের বিষয়ে তাঁদের স্পষ্ট ধারণা দেওয়া হয় না। বেতন বকেয়া থাকলেও অর্থের প্রকৃত অবস্থা জানতে পারেন না তাঁরা। অবশ্য প্রত্যন্ত এলাকার অনেক ছোট মাদরাসা সীমিত অনুদানে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে গিয়ে নিজেরাই আর্থিক সংকটে পড়ে।
মাদরাসার পরিচালনায় মুহতামিম বা প্রতিষ্ঠানপ্রধানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। অর্থ সংগ্রহ, শিক্ষক নিয়োগ, বেতন নির্ধারণ ও সামগ্রিক কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব সাধারণত তাঁদের ওপর থাকে। অনেকেই ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও শ্রম দিয়ে প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখেন। তবে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে শিক্ষকদের প্রশ্ন রয়েছে। তাঁদের মতে, আয়-ব্যয়ের হিসাব পরিচালনা কমিটির কাছে নিয়মিত উপস্থাপন এবং শিক্ষকদের বেতন বাবদ নির্দিষ্ট অর্থ বরাদ্দ করা হলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়বে।
কওমি শিক্ষকদের আর্থিক সংকট নিয়ে ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম বলেন, কওমি মাদ্রাসাগুলো সমাজের একটি শ্রেণিকে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা দিয়ে থাকে। এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের বড় অংশ নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান। তাই রাষ্ট্রের উচিত বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা।
তিনি বলেন, অনেক মাদরাসায় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বেতন নেওয়া হয় না। সমাজের বিত্তবান মানুষের দান ও সহযোগিতায় এসব প্রতিষ্ঠান চলে। ফলে শিক্ষকদের বেতন অনেক ক্ষেত্রে অনিশ্চিত থাকে। একজন শিক্ষককেও নিজের পরিবারের ভরণপোষণ করতে হয়। শুধু ‘লিল্লাহ’ সহায়তার ওপর নির্ভর করে তাঁর পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করা কঠিন। তাই শিক্ষকদের উপযোগী আয়ের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে অধ্যাপক শহীদুল ইসলাম বলেন, মাদ্রাসার আয় ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। কওমি মাদরাসার নিজস্বতা বজায় রেখেও শিক্ষকদের আর্থিক সহযোগিতা দেওয়া সম্ভব। তাঁদের সরকারি সহায়তা কিংবা কল্যাণমূলক কর্মসূচির আওতায় আনা গেলে উপকার হবে।
কওমি মাদরাসার আর্থিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় সরকারের ভূমিকা বাড়ানোর বিষয়টি অতীতেও আলোচনায় এসেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কওমি মাদরাসার প্রতিনিধিদের সঙ্গে রাজধানীর একটি পাঁচ তারকা হোটেলে বৈঠক হয়। সেখানে ‘কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড’ নামে একটি বোর্ড গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। প্রস্তাবে বোর্ডের প্রশাসক সরকার নিয়োগ দেবে এবং অন্য সদস্যরা হবেন কওমি মাদরাসাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এমন পরিকল্পনা ছিল। পাশাপাশি একাডেমিক কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ না করে অবকাঠামো ও আর্থিক বিষয় তদারকির কথা বলা হয়। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, কওমি প্রতিনিধিরা এ প্রস্তাবে সম্মতি দেননি। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, সরকারি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত হলে শিক্ষাব্যবস্থার স্বাতন্ত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এ বিষয়ে কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের (বেফাক) পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মাওলানা আব্দুল জলিল বলেন, শিক্ষকদের বেতনের বিষয়ে তিনি মন্তব্য করবেন না। তবে আর্থিক অডিটের ভয়ে তাঁরা সরকারের সঙ্গে যুক্ত হতে চান না এমন বক্তব্য সঠিক নয়। তাঁর ভাষায়, ‘আর্থিক অডিটের ভয়ে আমরা সরকারের সঙ্গে যুক্ত হতে চাচ্ছি না, এ কথাটি সত্য নয়। আমাদের একটা নিজস্বতা রয়েছে।’
কওমি শিক্ষাব্যবস্থার স্বকীয়তা রক্ষার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হলেও শিক্ষকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার উদ্যোগও জরুরি। নিজস্ব পরিচালনব্যবস্থা বজায় রেখেই প্রতিষ্ঠানগুলো বেতন নির্ধারণে ন্যূনতম মানদণ্ড তৈরি করতে পারে। নিয়োগপত্র, বেতন পরিশোধের সময় ও চাকরির শর্ত লিখিতভাবে নির্ধারণের পাশাপাশি চিকিৎসা ও জরুরি প্রয়োজনে সহায়তার জন্য কল্যাণ তহবিল গঠন করা যেতে পারে। আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়মিত উপস্থাপন ও দাতাদের কাছে উন্মুক্ত রাখলেও প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা বাড়বে।
১২৫ বছরের পথচলায় কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা বিস্তৃত হয়েছে। এখন প্রয়োজন এই ব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি শিক্ষকদের জীবনমান ও আর্থিক নিরাপত্তার দিকে নজর দেওয়া। একজন শিক্ষক যেন সম্মানজনকভাবে পরিবার নিয়ে বাঁচতে পারেন, সেই পরিবেশ তৈরি করা শুধু তাঁর ব্যক্তিগত প্রয়োজন নয়; এটি একটি সুস্থ ও টেকসই শিক্ষাব্যবস্থারও শর্ত।
