করোনাকালে নির্মাণ খাতের ব্যবসায়ে ধস নামে। জীবনঘাতী এ ব্যাধি কমার পর নির্মাণ খাতের ব্যবসায়ে গতি আসতে শুরু করে। কিন্তু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আবারও এ ব্যবসায়ে বিপর্যয় নেমে আসে। ডলারের দাম বেড়ে উচ্চমূল্যেই স্থির হয়ে আছে। ব্যাংকগুলোও এলসি বা ঋণপত্র খোলায় কড়াকড়ি করে। এতে সাধারণ ব্যবসায়ীদের বেশির ভাগেরই পণ্য আমদানির সুযোগ কমে যায়। এ পরিস্থিতির মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা দেখা দেয়। এতে নির্মাণ খাতের বিপর্যয় আরও বেড়েছে, যা এখনো চলছে।
শিল্পখাতসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন থামছে না। আন্তর্জাতিক বিষয়গুলো আমাদের হাতে নেই। কিন্তু যা আমাদের হাতে আছে সেখানে জোর দিতে হবে। তাই নির্মাণ খাতের ব্যবসায়ে গতি আনতে হলে সরকারের কাছে রাজস্ব ছাড়, সুদের হার কমানো, প্রণোদনা প্যাকেজ, বিশেষ তহবিল ঘোষণাসহ নীতি-সহায়তা বাড়ানোর দাবি জানাই।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নির্মাণ খাতের সঙ্গে স্ক্রু, রড, সিমেন্ট, বালু, ইলেট্রিক সামগ্রী, পাইপ, রং, পেইন্ট, কাঠ, রেডিমিক্স তৈরির কারখানা, রি-রোলিং স্টিল মিলস, রেডিমিক্স সাইলো (জেটি) তৈরির শিল্প, স্টিল মিল (স্টিলবার, এঙ্গেল, প্ল্যাটবার ইত্যাদি তৈরি), স্টাইনলেস স্টিল মিল, ব্রিকস ম্যানুফেকচারিং কারখানা, কাস্ট আয়রন মিলস, অটো ব্রিকস ম্যানুফেকচারিং ইন্ডাস্ট্রিজ, সিরামিক ব্রিকস ইন্ডাস্ট্রিজ, করোগেটেড শিট প্রস্তুত কারখানা, সিআই শিট প্রস্তুত কারখানা, সাধারণ ইট প্রস্তুত ব্রিক ফিল্ড, কংক্রিট ব্লক ম্যানুফেকচারিং ইন্ডাস্ট্রি, ব্ল্যাক ও জিপি শিট মেকিং ফ্যাক্টরি, বালি, সাটার মেকিং ফ্যাক্টরি, স্টিল প্রস্তুতকারক মেশিনারিজ তৈরির কারখানা, তারকাটা তৈরির কারখানা, নাট, বোল্ট, সিমেন্ট ব্যাগ তৈরির কারখানা, সিমেন্ট ফিগমেন্ট তৈরির কারখানা, সিমেন্ট ক্লিংকার প্রস্তুত কারখানা, সাটার, লাইম ক্রাশিং ইন্ডাস্ট্রিজসহ ২১১ শিল্প খাত জড়িত।
রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সভাপতি ড. আলী আফজাল খবরের কাগজকে বলেন, গত ৩ বছরে ২১১ শিল্প খাতের গড়ে ৪৩ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় বেড়েছে। এর ফলে আবাসন খাতে বড় ধরনের স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। শুধু আবাসন খাত নয়, ঠিকাদারিসহ নির্মাণ খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ে ব্যয় বেড়েছে।
রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নির্মাণ খাতসংশ্লিষ্ট উপকরণের মধ্যে রডের দাম সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে এখন সবচেয়ে বেশি। রডের দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেকে নির্মাণকাজ চালিয়ে নিতে হিমশিম খাচ্ছে। অনেকে কাজ থামিয়ে দিয়েছেন। অনেকে কাজ শুরুর পরিকল্পনা করেও বসে আছেন।
সকল গ্রেডের রড গত ছয় মাসে গড়ে ৩৮ শতাংশ বাড়তি দামে কিনতে হচ্ছে। এ ছাড়া ইট, বালু, পাথর, সিমেন্ট, থাইগ্লাস, অ্যালুমিনিয়াম পণ্য, এসএস পাইপ, ইনডোর ফিটিংসহ অন্য নির্মাণসামগ্রীর দামও বেড়েছে ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত।
বাংলাদেশ অটো রি-রোলিং অ্যান্ড স্টিল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও শাহরিয়ার স্টিল মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসকে মাসাদুল আলম মাসুদ খবরের কাগজকে বলেন, রডের দাম বাড়ায় সমগ্র নির্মাণ খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। অনেকে প্রস্তুতি নিয়েও কাজ শুরু করছেন না। দাম কমার অপেক্ষায় আছেন। এভাবে নির্মাণ খাত স্থবির হয়ে আছে।
রিহ্যাবের সাবেক সহসভাপতি কামাল মাহমুদ খবরের কাগজকে বলেন, প্রত্যেকটি নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়েছে। কোভিড মহামারি শুরুর আগে ২০২০ সালে রডের দাম ছিল প্রতিটন ৫২ হাজার টাকা। তা বেড়ে ৯০ হাজার টাকা বা তার বেশিও বিক্রি হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, নির্মাণ খাতের কাঁচামালের কিছুটা (৩০ শতাংশ) জোগান দেশি উৎস থেকে সংগ্রহ করা হয়। কম দামে কেনা রড এখন কারও সংগ্রহে নেই। এখন যে বা যারা নির্মাণকাজ করবেন তা বেশি দামে কেনা পণ্য দিয়েই করতে হবে। এতে লাভ তো দূরে থাক, খরচই উঠবে না, বরং লোকসান হবে।
শিল্প খাতসংশ্লিষ্টরা বলেছেন, বিশ্ববাজারে রডের প্রধান কাঁচামাল বিলেট ও স্ক্র্যাপের চাহিদা বেড়ে গেছে। কিন্তু সরবরাহ সেই হারে বাড়েনি, তাই ঘাটতি দেখা দিয়েছে। আর এই কারণে দেশের বাজারে রডের দাম আরও বাড়বে, এমন আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ছাড়া জ্বালানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বব্যাপী জাহাজ ভাড়াও বেড়েছে। অন্যদিকে তুরস্ক, ব্রাজিল, ব্রিটেনসহ রপ্তানিকারক দেশগুলোতে নির্মাণসামগ্রীর অভ্যন্তরীণ চাহিদা বেড়ে যাওয়ার রপ্তানি কমেছে। এটাও আন্তর্জাতিক বাজারে নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ।
রাজধানীর গাবতলীতে আমিনবাজার সেতুর পাশে বালুঘাট এলাকায় রয়েছে ইট, বালি, পাথরসহ নির্মাণশিল্পের বেশ কিছু উপকরণের দোকান। এখানকার বিক্রেতা মো. সালে উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, পাথরের দাম বেড়েছে। কিন্তু সরবরাহ কমে গেছে। আরেক বিক্রেতা হাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ইটের দাম অনেক বেড়েছে। শীতের শুরুতে নতুন ইট কাটা শুরু হয়। আশা করছি ইটের দাম কমবে। ইটের দাম প্রতি গাড়িতে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা বেড়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বালুর দামও দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা বেড়েছে। চলতি বছরে এসএস পাইপের দাম তিন দফায় বেড়েছে। এভাবে চলতি বছরের মাঝামাঝিতে ১৭ শতাংশ করে দাম বাড়ানো হয়েছিল। এর আগে ৫ শতাংশ করে দাম বেড়েছিল। আবার ১০ শতাংশ করে দাম বাড়ানোর ঘোষণা এসেছে কারখানার মালিকদের কাছ থেকে।
অথৈ ডেভেলপারস্ লিমিটেডের চেয়ারম্যান শামীমুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, নির্মাণ উপকরণের দাম অনেক বেড়েছে। এত দাম দিয়ে নির্মাণকাজ করে লাভ করা সম্ভব না। আর এ জন্য আমার কয়েকটি আবাসন প্রকল্প, বাণিজ্যিক প্রকল্প বন্ধ রেখেছি। প্রকল্প না চললেও কর্মচারী-নির্মাণশ্রমিকদের বেতন দিতে হচ্ছে। জানি না, এভাবে কত দিন চলতে পারব! এ পরিস্থিতি থেকে কীভাবে উত্তরণ ঘটবে, তা জানি না।
