৩৫ মিনিট আগে
![]()
তুহিন শুভ্র অধিকারী
২০২৪ সালে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীর চাপ সবচেয়ে বেশি থাকলেও বাড়ানো হয়নি শয্যার সংখ্যা। ছবি: স্টার
বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত আট মাসে ১৪ জেলার ১৯টি সরকারি হাসপাতালে ২ হাজার ৮৭৯টি শয্যা বাড়ানো হয়েছে।
এর মধ্যে ২ হাজার ৬৮৮টি শয্যা বাড়ানো হয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ কয়েকজন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর নিজ জেলা বা নির্বাচনী এলাকার ১৪টি হাসপাতালে।
অর্থাৎ, নতুন শয্যার ৯৩ শতাংশই গেছে এসব হাসপাতালে। অথচ দেশের অনেক হাসপাতালে রোগীর চাপ আরও বেশি হলেও শয্যা বাড়ানো হয়নি।
অন্যদিকে, মন্ত্রীদের নিজ জেলা বা নির্বাচনী এলাকার বাইরে পাঁচটি হাসপাতালে শয্যা বাড়ানোর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে মাত্র ১৯১টির।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নথি অনুযায়ী, গত ২৮ এপ্রিল থেকে ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা বাড়ানোর এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এছাড়া, বিএনপি সরকার দুটি নতুন সরকারি মেডিকেল কলেজ স্থাপনের অনুমোদন দিয়েছে। এর একটি ১৫ মে ঠাকুরগাঁওয়ে। তৎকালীন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নিজ জেলা এটি। অন্যটি ১৪ জুন নরসিংদীতে, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের নিজ জেলা।
স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মন্ত্রীদের এলাকার কিছু হাসপাতালে রোগীর চাপ অনুমোদিত শয্যাসংখ্যার চেয়ে বেশি হওয়ায় সেগুলোর সম্প্রসারণ প্রয়োজন ছিল। তবে দেশের অন্য অনেক হাসপাতালেও রোগীর চাপ আরও বেশি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) চলতি বছরের এপ্রিলের স্বাস্থ্য বুলেটিনের তথ্যেও তা দেখা যায়।
সাবেক স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের সদস্য অধ্যাপক মোজাহেরুল হক দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘কোন হাসপাতালের শয্যা আগে বাড়ানো দরকার, তা নির্ধারণ করতে হবে শয্যার ব্যবহার এবং বিদ্যমান সক্ষমতার তুলনায় কত রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন, তার ভিত্তিতে।’
তিনি আরও বলেন, ঢাকামুখী রোগীর চাপ কমানোও অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। এ জন্য ঢাকার আশপাশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে শয্যা ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা বাড়াতে হবে, যেন মানুষ বাড়ির কাছেই চিকিৎসা নিতে পারেন।
রাজনৈতিক বিবেচনায় হাসপাতালকে অগ্রাধিকার দেওয়া অন্যায্য বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষ্য, ‘মন্ত্রী বা নীতিনির্ধারকদের নিজ জেলা ও নির্বাচনী এলাকাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলে তা অন্যায্য হবে। এতে মানুষের জন্য যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হবে না।’
১৯টি হাসপাতালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি শয্যা বাড়ানো হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর নিজ জেলা বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। গত ৮ সেপ্টেম্বর হাসপাতালটির শয্যাসংখ্যা ১ হাজার ২০০ থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৮০০ করা হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, হাসপাতালটিতে প্রতি শয্যার বিপরীতে তিনজনের বেশি রোগীকে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। এ কারণে হাসপাতালটির সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন ছিল।
তবে একই যুক্তি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়নি। ২০২৪ সালে দেশের মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোর মধ্যে এই হাসপাতালে শয্যাপ্রতি রোগীর চাপ ছিল সবচেয়ে বেশি। অথচ ২০১৩ সালের পর থেকে হাসপাতালটির শয্যাসংখ্যা বাড়ানো হয়নি।
এক হাজার শয্যার এই হাসপাতালে ২০২৪ সালে শয্যা ব্যবহারের হার ছিল ৩২৯ শতাংশ। বগুড়া মেডিকেলে এ হার ছিল ৩০৮ শতাংশ।
এছাড়া ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ওই বছর ৩ লাখ ২১ হাজার ৫২৪ জন রোগী ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। বগুড়ায় এই সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২৩ হাজার ৩৬৪, অর্থাৎ ময়মনসিংহের তুলনায় অর্ধেকের কম।
সম্প্রতি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, শয্যার তীব্র সংকটের কারণে অনেক রোগীকে মেঝে ও বারান্দায় রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
৭ অক্টোবর ফুসফুসের সংক্রমণ নিয়ে ভর্তি হওয়া ৬৫ বছর বয়সী ইসহাক আলী হাসপাতালের বারান্দায় চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমি একটা বেডের জন্য চেষ্টা করছি, কিন্তু কোথাও খালি নাই।’
হাসপাতালের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ মইনুদ্দিন খান বলেন, ৬ অক্টোবর এক হাজার শয্যার বিপরীতে হাসপাতালে রোগী ছিলেন ৪ হাজার ৯৮ জন।
তিনি বলেন, ‘ভর্তি হওয়া সব রোগীকে খাবার ও জরুরি ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সবার জন্য শয্যার ব্যবস্থা করা যাচ্ছে না।’
শয্যা বাড়ানোর ক্ষেত্রে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেয়েছে ঢাকার মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং দিনাজপুরের মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। হাসপাতাল দুটির প্রতিটির শয্যাসংখ্যা বাড়িয়ে ১ হাজার করা হয়।
মুগদা হাসপাতালটি ঢাকা-৯ আসনে, যা সড়ক পরিবহন, সেতু ও রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিবের নির্বাচনী এলাকা। আর দিনাজপুর সমাজকল্যাণমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেনের নিজ জেলা।
গত ২১ মে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং ১৯ আগস্ট দিনাজপুরের মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা ৫০০ করে বাড়ানো হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতাল দুটিতে শয্যা ব্যবহারের হার ছিল যথাক্রমে ১৫৭ এবং ১৬৯ শতাংশ।
অন্যদিকে, খুলনা, সিলেট, কুমিল্লা, রংপুর ও বরিশালের হাসপাতালগুলোতে শয্যাসংখ্যা বাড়ানো হয়নি। অথচ এসব হাসপাতালে শয্যা ব্যবহারের হার ছিল যথাক্রমে ২৬৬, ২৫৯, ২২১, ১৯৯ ও ১৯০ শতাংশ।
শয্যাসংকটে থাকা হাসপাতালগুলোর মধ্যে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিস্থিতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
গত ৮ অক্টোবর ৯০০ শয্যার এই হাসপাতালে রোগী ছিলেন ৩ হাজার ১৭২ জন। অর্থাৎ অনুমোদিত শয্যাসংখ্যার তিন গুণের বেশি রোগী সেখানে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন।
সিলেট নগরের জালালাবাদ এলাকার বাসিন্দা রুস্তম আলী হাত ও পায়ে আঘাত নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। তিনি বলেন, ‘গত দুই দিন ধরে একটা বেডের জন্য চেষ্টা করছি, কিন্তু তারা দিতে পারছে না।’
সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার বাসিন্দা আসমা বেগম তার নাতি জিসানকে নিয়ে হাসপাতালের মেঝেতে ছিলেন। শিশুটির হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছিল।
৭ অক্টোবর তিনি সিলেটে দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিনিধিকে বলেন, ‘একটু জায়গা পেয়েছি। তাই নাতিকে শোয়ানোর জন্য মাদুর বিছিয়ে দিয়েছি। একজন চিকিৎসক একবার এসে তাকে পরীক্ষা করে বলেছেন, আপাতত এখানেই থাকতে পারি।’
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও প্রতি শয্যার বিপরীতে দুইজনের বেশি রোগী চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। তবে জুলাইয়ে হাসপাতালটির শয্যাসংখ্যা ১ হাজার ২০০ থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৩০০ করা হয়। হাসপাতালটি ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনুর নির্বাচনী এলাকায় অবস্থিত।
এছাড়া একই মাসে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়মের নিজ জেলা রাজবাড়ীর সদর হাসপাতাল এবং জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারীর নিজ জেলা জয়পুরহাটের জেনারেল হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা ১৫০টি করে বাড়ানো হয়।
তৎকালীন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের নিজ জেলা রাঙামাটির রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতাল ও লংগদু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শয্যাসংখ্যাও বাড়ানো হয়েছে।
এর আগে মে মাসে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নিজ জেলা নরসিংদীর ১০০ শয্যার জেলা হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা বাড়িয়ে ২৫০ করা হয়। ওই হাসপাতালের শয্যা ব্যবহারের হার ছিল ১১৭ শতাংশ। দেশের অন্তত ২৫টি হাসপাতালের তুলনায় এ হার কম ছিল। এছাড়া জেলায় আরও একটি ১০০ শয্যার হাসপাতাল রয়েছে।
জেলা হাসপাতালের পাশাপাশি দুই মন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকার তিনটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শয্যাসংখ্যাও ১৭ মে থেকে ২ আগস্টের মধ্যে দ্বিগুণ করা হয়।
১৭ মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের নির্বাচনী এলাকা কক্সবাজার-১-এর চকরিয়া ও পেকুয়ার দুটি ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়।
একইভাবে ২ আগস্ট কিশোরগঞ্জ-৬ আসনের ভৈরব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শয্যাসংখ্যাও বাড়ানো হয়। এই আসনের সংসদ সদস্য বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম।
দেশজুড়ে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বাড়াতে জুনে সরকার সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে ১২ আগস্ট সেই সিদ্ধান্ত সংশোধন করে পর্যায়ক্রমে সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১৫১ শয্যায় উন্নীত করার নতুন পরিকল্পনা নেওয়া হয়।
এর প্রায় এক মাস পর বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শয্যাসংখ্যা ৩১ থেকে বাড়িয়ে ৫০ করা হয়। একই সময়ে ফেনীর আরেকটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শয্যাসংখ্যাও বাড়ানো হয়।
এছাড়া সেপ্টেম্বরে ঢাকার জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা ৫০০ থেকে বাড়িয়ে ৭০০ করা হয়।
অন্যদিকে, মন্ত্রীদের এলাকার বাইরের পাঁচটি হাসপাতালে নতুন করে মাত্র ১৯১টি শয্যা অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে রংপুরের তারাগঞ্জ, সিলেটের ওসমানীনগর, পাবনার আটঘরিয়া ও ফেনীর ফুলগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রতিটিতে ১৯টি করে শয্যা বাড়ানো হয়। এসব স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আগে ৩১টি করে শয্যা ছিল।
বাকি ১১৫টি শয্যা ঢাকার জাতীয় নাক-কান-গলা ইনস্টিটিউটে অনুমোদন দেওয়া হয়। এতে প্রতিষ্ঠানটির শয্যাসংখ্যা ২৫০-এ উন্নীত হয়েছে।
হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা বাড়ানোর সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক বিবেচনার অভিযোগ নাকচ করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
১৪ অক্টোবর দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, আমরা সম্পূর্ণ প্রয়োজনের ভিত্তিতে কাজ করছি। যেসব এলাকায় চিকিৎসাসেবার ঘাটতি রয়েছে, সেখানেই সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হচ্ছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, লালমনিরহাটে ১ হাজার ৬০০ শয্যার একটি হাসপাতাল স্থাপন এবং দেশের বিভিন্ন জেলায় আরও কয়েকটি স্বাস্থ্য প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে।
মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের নির্বাচনী এলাকায় কেন হাসপাতাল সম্প্রসারণের বেশির ভাগ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, রাঙ্গামাটিতে হাসপাতাল সম্প্রসারণের বিষয়টি কি ওই এলাকার জনপ্রতিনিধির পরিচয় দিয়ে বিচার করবেন, নাকি সেখানকার মানুষের স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন দিয়ে? দুর্গম ও অবহেলিত এলাকাগুলোকে মূলধারায় নিয়ে আসতে হবে।
এরপর বেশি শয্যা ব্যবহারের হার আছে, এমন অনেক হাসপাতাল একই ধরনের সম্প্রসারণ সুবিধা না পাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন এই প্রতিবেদক। জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ওই হাসপাতালগুলোর জন্যও বিভিন্ন প্রকল্প বিবেচনায় রয়েছে। অগ্রগতি দেখতে সবাইকে এক বছর অপেক্ষা করার আহ্বান জানান তিনি।
(দ্য ডেইলি স্টারের ময়মনসিংহ ও সিলেট সংবাদদাতারা এই প্রতিবেদনের জন্য তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন)
