অ্যাডভোকেট ইউসুফ আরমান
ভোরের আলোয় নরক যন্ত্রণাঃ
২০২৬ সালের ১৭ই অক্টোবর (শনিবার) ভোরে এই হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা। ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ফোটেনি। সাগরের চেনা গর্জন ছাপিয়ে হঠাৎ ভেসে এল কিছু মানুষের বুকফাটা আর্তনাদ। কেউ তখনো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, কেউ হয়তো জানালার পর্দা সরিয়ে নোনা জলের বুকে ভোরের প্রথম সূর্যোদয় দেখছিলেন। কিন্তু কয়েক মুহূর্তের মধ্যে কক্সবাজারের পাটুয়ারটেক সৈকতের ‘টুপটুপ রিসোর্ট অ্যান্ড রেস্তোরাঁ’ পরিণত হলো এক জীবন্ত জাহান্নামে। মাত্র কয়েক ঘণ্টার লেলিহান আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেল ১১টি তাজা প্রাণ, আর সেই সাথে চিরকালের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল কয়েকটি পরিবারের আজীবনের আনন্দ—উচ্ছ্বাস।
স্বপ্নের সলিল সমাধি ও বীভৎস-বিকৃতঃ
যাঁরা সাগরের টানে ঘর ছেড়েছিলেন একটু শান্তির খোঁজে, যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি মুছে ফেলার আশায়; তাঁরা ঘরে ফিরছেন লাশ হয়ে। তাও এমন বীভৎস ও বিকৃত অবস্থায় যে, পরম মমতায় শেষবার একটু ছুঁয়ে দেখার কিংবা চেনার উপায়টুকুও অবশিষ্ট নেই। আগুন থেকে বাঁচতে অবোঝ সন্তানকে বুকে জড়িয়ে মা বাথরুমে আশ্রয় নিয়েছিলেন, ভেবেছিলেন হয়তো পানি তাঁদের রক্ষা করবে। কিন্তু নিষ্ঠুর নিয়তি আর মানুষের তৈরি সীমাহীন অব্যবস্থাপনা তাঁদের সেই সুযোগ দেয়নি। আগুনে পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া সেই নিথর দেহগুলো এখন আমাদের চেনা পর্যটন ব্যবস্থার কদর্য ও কঙ্কালসার রূপটাকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।
দুর্ঘটনা নাকি প্রাতিষ্ঠানিক হত্যাকাণ্ড?
এই মৃত্যুকে কোনোভাবেই শুধুই ‘দুরাশা’ বলে চালিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। এটি মূলত অবহেলা ও ঠাণ্ডা মাথার প্রাতিষ্ঠানিক হত্যাকাণ্ড। তদন্তে যে হাড়হিম করা তথ্য বেরিয়ে এসেছে, তা চরম উদ্বেগজনক। যে কাঠে নির্মিত বহুতল ভবনে মানুষ নিশ্চিন্তে ঘুমাতে গিয়েছিল, সেটির কোনো ফায়ার সেফটি লাইসেন্স ছিল না। পরিবেশ অধিদপ্তর বা কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কোনো অনুমোদনই ছিল না এই মরণ ফাঁদের। আরও ভয়ংকর বিষয় হলো, মাত্র কয়েক মাস আগেই ফায়ার সার্ভিস এই ভবনটিকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ ঘোষণা করে লাল নোটিশ দিয়েছিল। কিন্তু সেই রাষ্ট্রীয় সতর্কবার্তাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে, স্রেফ মুনাফার লোভে পর্যটকদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে ব্যবসা চালিয়ে গেছে মালিকপক্ষ।
কাগজি নোটিশ আর প্রশাসনের নির্লজ্জ ঘুমঃ
আমাদের দেশে একটি ট্র্যাজেডি ঘটে, আর আমরা কিছুদিন তা নিয়ে হাহাকার করি। ফায়ার সার্ভিস নোটিশ দিয়েই তাদের কাগজি দায় সারে, প্রশাসন তদন্ত কমিটি গঠন করে ফাইল বন্দি করে রাখে, আর মাঝখান থেকে ঝরে যায় সাধারণ মানুষের প্রাণ। যদি সেই জুনেই ঝুঁকিপূর্ণ রিসোর্টটি সিলগালা করে দেওয়া হতো, তবে আজ ১০টি পরিবারকে ডিএনএ টেস্টের রিপোর্টের জন্য মর্গের সামনে দাঁড়িয়ে বুক চাপড়ে কাঁদতে হতো না। সন্তানের লাশ শনাক্ত করতে কোনো অসহায় বাবাকে এভাবে নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকতে হতো না।
স্মৃতির সাগরে অশ্রু আর অনন্ত শূন্যতাঃ
যে মানুষগুলো হাসিমুখে ট্রলি ব্যাগ গুছিয়ে ছিলেন, ঘরে ফেরার জন্য ট্রেনের কিংবা বাসের টিকিট কেটে রেখেছিলেন, তাঁরা আজ চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেলেন এক নিথর নীরবতায়। সমুদ্রের নোনা জল দেখতে এসে তাঁরা নিজেরাই পরিবারগুলোর চোখকে নোনা জলের অন্তহীন সমুদ্রে পরিণত করে গেলেন। এই ১১টি প্রাণ কেবল সংখ্যার কোনো হিসাব নয়; তাঁরা ছিলেন কারও আদরের সন্তান, কারও নির্ভরতার সঙ্গী, কিংবা কোনো পরিবারের একমাত্র আলো। আজ তাঁদের টেবিল গুলো শূন্য, তাঁদের রেখে যাওয়া ঘরগুলো হাহাকারে ভারী। যে অনাগত স্বপ্নগুলো নিয়ে তাঁরা জীবনের গল্প বুনতে চেয়েছিলেন, এক নিমিষেই তা মিলিয়ে গেল পাটুয়ারটেকের কালো ধোঁয়ায়। মৃত এই নিরপরাধ আত্মাদের প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা। রাষ্ট্র হয়তো এই অপূরণীয় ক্ষতির ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করতে পারবে না, কিন্তু তাঁদের এই করুণ বিদায় যেন আমাদের বিবেককে অনন্তকাল ধরে তাড়িয়ে বেড়ায়।
শেষ আকুতি ও আমাদের দাবিঃ
টুপটুপ রিসোর্টের এই ছাইয়ের স্তূপ আসলে আমাদের পুরো পর্যটন খাতের অনিয়ম, গাফিলতি আর লোভের এক নগ্ন প্রতীক। আমরা আর কতটি প্রাণ হারালে জাগব? আর কতটি ভোরের আলো এভাবে মানুষের পোড়া মাংসের গন্ধে ভারী হলে প্রশাসনের ঘুম ভাঙবে? পাটুয়ারটেকের সমুদ্রের বাতাস এখন আর শুধু নোনা জলের স্নিগ্ধতা বয়ে আনে না, এতে মিশে আছে ১১টি পুড়ে যাওয়া মানুষের শেষ আকুতি ও আর্তনাদ।
এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে পলাতক মালিকসহ সকল দায়ীকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া প্রয়োজন। একই সাথে কক্সবাজারসহ দেশের সকল পর্যটন কেন্দ্রের অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনাগুলো চিহ্নিত করে এখনই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। লোভের আগুনে আর কোনো স্বপ্নের যেন এভাবে সলিল সমাধি না হয়—আজ এটাই হোক সবার একচ্ছত্র দাবি।
লেখক: অ্যাডভোকেট ইউসুফ আরমান , কলামিস্ট ও সাহিত্যিক, দায়রা জজ আদালত, কক্সবাজার।
