তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের জন্য মজুরি বোর্ড গঠনে সদস্যদের নাম চেয়েছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। গতকাল বৃহস্পতিবার মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের কাছে মালিকপক্ষের প্রতিনিধি চেয়ে চিঠি দিয়েছে মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধির জন্য জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতিকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের দাবির মুখে চলতি মাসের শুরুতে তৈরি পোশাকশ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণের জন্য নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। তখন শ্রম মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দেন, অক্টোবরের মধ্যেই ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠিত হতে পারে।
এদিকে মজুরি বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন দাবিতে তিন দিন ধরে উত্তরায় সড়ক অবরোধ করছেন কয়েকটি তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা। গতকাল সকাল সাড়ে আটটার দিকে একাধিক পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের আজমপুর সড়কের দুপাশে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন। এতে যান চলাচল মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়। দুর্ভোগে পড়েন যাত্রীরা।
শ্রমিকদের এই আন্দোলনের মধ্যে মজুরি বোর্ড গঠনের জন্য মালিক ও শ্রমিকপক্ষের নাম চেয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের চিঠি দেওয়া হয়। বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনকে দেওয়া চিঠিতে মন্ত্রণালয় বলেছে, বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী, নিম্নতম মজুরি বোর্ড পুনর্গঠনের জন্য একজন নিরপেক্ষ সদস্য, একজন মালিকদের প্রতিনিধি, একজন শ্রমিকদের প্রতিনিধি নিয়োগের জন্য প্রত্যেক সদস্যের বিপরীতে তিনজন সদস্যের নাম চাওয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামীম এহসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘শ্রম মন্ত্রণালয় থেকে আমরা চিঠি পেয়েছি। বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সঙ্গে আলোচনা করে আগামী সপ্তাহের মধ্যে আমরা নাম চূড়ান্ত করে মন্ত্রণালয়ে পাঠাব।’ অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শুরু থেকেই মজুরি বোর্ড গঠনের বিষয়ে সরকার ইতিবাচক। তারপরও একটি গোষ্ঠী আন্দোলন করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করছে। এতে সাধারণ শ্রমিকের সুনাম নষ্ট হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সরকার শ্রম আইন সংশোধন করে শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণের সময়কাল পাঁচ বছর থেকে কমিয়ে তিন বছর নির্ধারণ করেছে। তৈরি পোশাকশ্রমিকদের সর্বশেষ ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করা হয়েছিল ২০২৩ সালের নভেম্বরে। আর কার্যকর হয় ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে। আগামী নভেম্বরে মজুরি ঘোষণার তিন বছর পূর্ণ হবে। ২০২৩ সালে তৈরি পোশাক খাতের ন্যূনতম মজুরি ৮ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১২ হাজার ৫০০ টাকা হয়। এ ক্ষেত্রে মজুরি বেড়েছিল ৫৬ দশমিক ২৫ শতাংশ। ওই মজুরিকাঠামোতে সাতটির বদলে পাঁচটি গ্রেড করা হয়।
জানতে চাইলে শ্রম অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আবদুছ সামাদ আল আজাদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘মালিকপক্ষের প্রতিনিধিদের নাম দেওয়ার বিষয়টি সমন্বয় করবে এমপ্লয়ার্স ফেডারেশন। আর শ্রমিকদের নামের প্রস্তাবটি সমন্বয় করবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল। নাম দেওয়ার জন্য চিঠিতে আমরা কোনো সময়সীমা উল্লেখ না করলেও দ্রুত দেওয়ার অনুরোধ করেছি। আশা করছি দুর্গাপূজার ছুটির আগেই নাম পাওয়া যাবে।’
জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সংগতি রেখে পোশাকশ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণ এবং নতুন মজুরিকাঠামো দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানাচ্ছে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন। গত বুধবার গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আয়োজিত সেমিনারে বক্তারা বলেন, ২০১৮ সালে ৮ হাজার টাকায় যে পরিমাণ পণ্য ও সেবা কেনা যেত, ২০২৬ সালে তা কিনতে প্রায় ১৪ হাজার ৫০০ থেকে ১৫ হাজার টাকা প্রয়োজন হচ্ছে। অথচ শ্রমিকদের আয় সেই অনুপাতে বাড়েনি। ফলে খাদ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও যাতায়াতের খরচ মেটাতে গিয়ে অনেক শ্রমিককে অতিরিক্ত সময় কাজ করতে হচ্ছে। এরপরও তাঁদের পক্ষে পরিবারের ন্যূনতম জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
জানতে চাইলে গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির সভাপ্রধান তাসলিমা আখতার প্রথম আলোকে বলেন, ‘ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আমরা দেখেছি, মালিক, শ্রমিক ও নিরপেক্ষ প্রতিনিধি শেষ পর্যন্ত একটি পক্ষ হয়েই কাজ করেছেন। তাঁরা মালিকদের স্বার্থই দেখেন। সে জন্য আমরা চাই, মজুরি বোর্ডে প্রকৃত শ্রমিক প্রতিনিধি দেওয়া হোক। নিরপেক্ষ প্রতিনিধি নির্বাচন যথাযথ হওয়া দরকার, যাতে করে তিনি সত্যিকার অর্থেই নিরপেক্ষভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তাহলেই শ্রমিকদের জীবনমান, খাদ্যদ্রব্যের দাম, মূল্যস্ফীতি, উৎপাদনশীলতা ইত্যাদি বিবেচনায় নিয়ে জীবনধারণের উপযোগী মজুরি নির্ধারণ সঠিকভাবে সম্পন্ন হবে।’
