বাংলাদেশে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে প্রাণঘাতী সংক্রামক রোগ হাম। টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতি, দুর্বল তথ্যব্যবস্থা এবং পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের এই অভিজ্ঞতা বিশ্বের অন্যান্য দেশের জন্যও বড় সতর্কবার্তা। শনিবার রয়টার্সের প্রতিবেদনে এসব উঠে আসে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৯ অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব শুরুর পর সন্দেহভাজন আক্রান্তের সংখ্যা ২ লাখ ২ হাজারে পৌঁছেছে। এর মধ্যে পরীক্ষাগারে ২২ হাজার রোগীর হাম শনাক্ত হয়েছে। চলতি বছরে বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় বাংলাদেশে সন্দেহভাজন আক্রান্তের সংখ্যা বেশি।
এ পর্যন্ত রোগটিতে ১ হাজার ১৪৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, নথিভুক্ত মৃত্যুর ৯৪ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম প্রতিরোধে টিকাদানের আওতা অন্তত ৯৫ শতাংশে রাখা প্রয়োজন। এই হার বজায় রাখতে ব্যর্থ হলে রোগটির প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি বেড়ে যায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ এ লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি পৌঁছালেও ২০২৫ সালে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি দুর্বল হয়ে পড়ে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের পর্যালোচনা করা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নথি এবং এক ডজনের বেশি বিজ্ঞানী, স্বাস্থ্যকর্মী ও কর্মকর্তার সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশকে নানা বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে লাখ লাখ শিশুর তথ্য তালিকায় না থাকা, প্রস্তুতির ঘাটতি এবং পর্যাপ্ত অভিভাবকের কাছে পৌঁছাতে না পারা।
নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব গ্লোবাল পাবলিক হেলথের অধ্যাপক এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার টিকাবিষয়ক উপদেষ্টা মার্ক জিট বলেন, ‘এটি প্রতিটি দেশের জন্যই একটি বাস্তব সতর্কবার্তা।’
তিনি বলেন, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার তুলনায় টিকাদানের মাধ্যমে আগেই প্রাদুর্ভাব ঠেকানো সহজ, সাশ্রয়ী ও নিরাপদ। জরুরি কর্মসূচির মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হলেও এর মধ্যে অনেক মানুষ আক্রান্ত হবেন এবং কারও কারও মৃত্যু হবে।
জরুরি টিকাদান কর্মসূচিতে বাদ পড়েছে লাখ লাখ শিশু
হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর বাংলাদেশ দ্রুত জরুরি টিকাদান কর্মসূচি চালু করে। এপ্রিল ও মে মাসে প্রায় দুই কোটি শিশুকে টিকা দেওয়ার পর আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধির গতি প্রথম দিকে কমে আসে। সরকার জানিয়েছিল, ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী লক্ষ্যভুক্ত প্রতিটি শিশুকে টিকার আওতায় আনা হয়েছে।
কিন্তু পরবর্তী তথ্য সেই দাবির সঙ্গে অসংগতি তুলে ধরে। জুন মাসে পরিচালিত আরেকটি নিয়মিত স্বাস্থ্য কর্মসূচিতে একই বয়সসীমার শিশুদের জন্য তৈরি তালিকায় হামের টিকাদান কর্মসূচির তুলনায় ৪০ লাখ বেশি শিশুর নাম পাওয়া যায়। এতে জরুরি কর্মসূচিতে বিপুলসংখ্যক শিশু বাদ পড়ার বিষয়টি সামনে আসে।
১৪ সেপ্টেম্বর রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, তালিকার এই ব্যবধানের পেছনে অভিভাবকদের টিকা নিয়ে অনীহা কিংবা শিশুদের অসুস্থতার কারণে টিকাকেন্দ্রে না আসার বিষয়টি ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রস্তুতির ঘাটতিও বাড়িয়েছে চ্যালেঞ্জ
রয়টার্সের পর্যালোচনা করা সরকারি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও অন্যান্য স্বাস্থ্য সহযোগী সংস্থার এপ্রিল ও আগস্টের বৈঠকের নথিতেও জরুরি কর্মসূচির কিছু সীমাবদ্ধতার তথ্য উঠে এসেছে।
নথি অনুযায়ী, সময়ের সীমাবদ্ধতার কারণে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরুর আগে প্রচলিত চার দফা প্রস্তুতি যাচাইয়ের পরিবর্তে মাত্র এক দফা যাচাই করা হয়েছিল। এসব যাচাইয়ের মধ্যে টিকা সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত শীতলীকরণ ব্যবস্থা রয়েছে কি না এবং কতসংখ্যক শিশুকে টিকা দিতে হবে, তা নির্ধারণের বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত থাকে।
১৯ এপ্রিলের বৈঠকের কার্যবিবরণীতে বলা হয়, এক দফা যাচাইয়ে অধিকাংশ জেলা প্রস্তুত বলে প্রতীয়মান হলেও সব জেলার প্রস্তুতি নিশ্চিত করা যায়নি।
এদিকে, সেপ্টেম্বরে রয়টার্সকে জিয়াউদ্দিন হায়দার জানিয়েছিলেন, প্রাদুর্ভাব বন্ধে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। তবে এ প্রতিবেদন তৈরির জন্য অক্টোবরে পাঠানো অতিরিক্ত প্রশ্নের জবাব দেয়নি সরকার।
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে, নিয়মিত টিকাদানের আওতা কমে গেলে এবং জরুরি কর্মসূচিতে তথ্য ও প্রস্তুতির ঘাটতি থাকলে সংক্রামক রোগ দ্রুত ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের সময়মতো টিকা দেওয়া এবং নির্ভুল তথ্যের ভিত্তিতে কর্মসূচি পরিচালনাই এমন বিপর্যয় ঠেকানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
