প্রবাসে মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং যুক্তরাজ্য ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অধ্যাপক আবুল হাশেমকে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও অশ্রুসিক্ত নয়নে শেষ বিদায় জানিয়েছেন ব্রিটেনের বাংলাদেশি কমিউনিটির বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি কমিউনিটির রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও সমাজসেবক অধ্যাপক আবুল হাশেম। তাঁর মৃত্যুতে মৌলভীবাজারসহ দেশে ও প্রবাসে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
শনিবার, ২৪ অক্টোবর, সকাল থেকেই গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি উপেক্ষা করে তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন শহর থেকে রাজনৈতিক ও কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ, ধর্মপ্রাণ মুসল্লি এবং সর্বস্তরের মানুষ জানাজায় অংশ নেন। এতে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। জানাজায় ইমামতি করেন ব্রিকলেন সেন্ট্রাল মসজিদের ইমাম ও খতিব মুফতি মাওলানা নজরুল ইসলাম। পরে লন্ডনের এটারনেল গার্ডেনস কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
শেখ হাসিনার শোকবার্তা
প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা অধ্যাপক আবুল হাশেমের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মরহুমের জীবন ও কর্মের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন।
শোকবার্তায় শেখ হাসিনা বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শে উজ্জীবিত অধ্যাপক আবুল হাশেম ছাত্রজীবন থেকেই যুক্তরাজ্যে প্রবাসী বাঙালি সমাজকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে সংগঠিত করতে এবং দলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় দীর্ঘদিন নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করেছেন। ১৯৬৮ সালে যুক্তরাজ্যে ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন এবং সংগঠনটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন।
শেখ হাসিনা আরও বলেন, যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে তিনি দলের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তাঁর মৃত্যুতে যুক্তরাজ্যপ্রবাসী বাঙালিরা একজন প্রিয়জনকে হারিয়েছেন, আর তিনি হারিয়েছেন একজন অভিভাবকতুল্য শুভাকাঙ্ক্ষীকে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রবাসে জনমত গঠনে অধ্যাপক আবুল হাশেমের ভূমিকার কথা স্মরণ করে শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর মতো অভিজ্ঞ ও দক্ষ সংগঠকের অভাব পূরণ হওয়ার নয়। দেশের বর্তমান সংকটকালে তাঁকে আরও বেশি প্রয়োজন ছিল। দেশ ও দলের জন্য তাঁর দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের অবদান কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন তিনি।
আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর শোক
যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ জালাল উদ্দীন ও সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ সাজিদুর রহমান ফারুক, সাবেক মন্ত্রী শফিকুর রহমান চৌধুরী, সাবেক মেয়র আনোয়ার উজ্জামান চৌধুরী, সাবেক সংসদ সদস্য হাবিবুর রহমান হাবিব, উপদেষ্টা পরিষদের চেয়ারম্যান ও যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আলহাজ শামসুদ্দিন খাঁন, সহসভাপতি হরমুজ আলী, শাহ আজিজুর রহমান ও শামসুদ্দিন আহমেদ মাস্টার, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নঈম উদ্দিন রিয়াজ ও মারুফ আহমেদ চৌধুরী এবং সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল আহাদ চৌধুরীসহ নেতৃবৃন্দ এক যৌথ শোকবার্তায় গভীর শোক প্রকাশ করেন।
তাঁরা শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান এবং মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। অধ্যাপক আবুল হাশেমের মতো ত্যাগী, নিবেদিতপ্রাণ, বিনয়ী ও আদর্শবান রাজনৈতিক সংগঠকের প্রয়াণে তাঁরা গভীরভাবে মর্মাহত বলে শোকবার্তায় উল্লেখ করেন।
নেতৃবৃন্দ বলেন, দুঃসময়ে অধ্যাপক আবুল হাশেম দৃঢ় হাতে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের হাল ধরেছিলেন। ত্যাগ, সংগ্রাম ও ভালোবাসার মধ্য দিয়ে তিনি প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সংগঠনকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন।
যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ ওয়েলস শাখার সভাপতি মোহাম্মদ মকিস মনসুর ও সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মালিকসহ অন্যান্য শাখার নেতৃবৃন্দও যৌথ শোকবার্তায় গভীর শোক প্রকাশ করেন। তাঁরা বলেন, প্রবাসে স্বাধীনতার সংগ্রামের অন্যতম সংগঠক ও বিশিষ্ট কমিউনিটি নেতা অধ্যাপক আবুল হাশেমের মৃত্যুতে তাঁরা একজন শ্রদ্ধেয়, অভিজ্ঞ অভিভাবককে হারিয়েছেন। তাঁর মতো নিবেদিতপ্রাণ ও প্রাণবন্ত মানুষের চলে যাওয়ায় যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা পূরণ হওয়ার নয়।
এ ছাড়া যুক্তরাজ্য আওয়ামী যুবলীগের সভাপতি ফখরুল ইসলাম মধু, সাধারণ সম্পাদক সেলিম আহমেদ খাঁন ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জামাল আহমেদ খাঁন; যুক্তরাজ্য আওয়ামী যুবলীগ ওয়েলস শাখার সভাপতি ভিপি সেলিম আহমেদ ও সাধারণ সম্পাদক মফিকুল ইসলাম; যুক্তরাজ্য ছাত্রলীগের সভাপতি তামিম আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক নিহাল হাসান সজিব ভূঁইয়া ও সিনিয়র সহসভাপতি এম আক্তার উজ্জামান খাঁন জাকির; এবং যুক্তরাজ্য ছাত্রলীগ ওয়েলস শাখার সভাপতি মোহাম্মদ বদরুল হক মনসুর ও সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান তালুকদার শাওনসহ নেতৃবৃন্দ শোক প্রকাশ করেছেন।
তাঁরা অধ্যাপক আবুল হাশেমকে বিনয়ী, পরিপাটি ও অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী মানুষ হিসেবে স্মরণ করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।
দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবন:
অধ্যাপক আবুল হাশেমের জন্ম ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ থানার গালিমপুর ইউনিয়নের চানহাটি গ্রামে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৩ অক্টোবর শুক্রবার লন্ডনের কিংস কলেজ হাসপাতালে স্থানীয় সময় রাত ১২টা ১০ মিনিটে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর।
তিনি স্ত্রী, দুই মেয়ে, নাতি-নাতনিসহ দেশে-বিদেশে অসংখ্য বন্ধু, আত্মীয়স্বজন, সহকর্মী, সহযোদ্ধা ও শুভাকাঙ্ক্ষী রেখে গেছেন।
১৯৬৮ সালে যুক্তরাজ্য ছাত্রলীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর অধ্যাপক আবুল হাশেম যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, সাধারণ সম্পাদক ও সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রবাসে স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গঠন ও সংগঠিত করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
ইএন/এসএ
