সাজেকে সশস্ত্র ইউপিডিএফের গুলী
রাঙামাটির সাজেকে পর্যটক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) সশস্ত্র সদস্যরা ৩০ থেকে ৪০ রাউন্ড গুলী ছুড়েছে বলে জানিয়েছে
- শনিবার রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে সড়ক ও নৌপথ অবরোধের ডাক
- সাধারণ নাগরিকদের জীবন নিয়ে তামাশা করার অধিকার কারও নেই----বিরোধীদলীয় নেতা
রাঙামাটির সাজেকে পর্যটক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) সশস্ত্র সদস্যরা ৩০ থেকে ৪০ রাউন্ড গুলী ছুড়েছে বলে জানিয়েছে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)। গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে সাজেকের গঙ্গারাম বাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। আইএসপিআর জানায়, এ ঘটনায় আটকে পড়া প্রায় তিন হাজার পর্যটককে সেনাবাহিনী ও পুলিশের সহায়তায় নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায় নি।
আইএসপিআরের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গঙ্গারাম বাজার এলাকায় ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যরা স্থানীয় লোকজনকে জোরপূর্বক মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সড়ক অবরোধ করেন। এতে সাজেক-বাঘাইহাট সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ফলে সাজেকে বেড়াতে যাওয়া প্রায় তিন হাজার পর্যটক আটকা পড়েন।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে অবরোধকারীরা সড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে পর্যটকবাহী যানবাহনের চলাচল বন্ধ করে দেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সেনাবাহিনী ও পুলিশের টহল দল অবরোধকারীদের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেয়। তবে সকাল ১০টা ৪৫ মিনিটের দিকে অবরোধকারীরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও পর্যটকদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করে। এ সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী লাঠিচার্জ করে অবরোধকারীদের ছত্রভঙ্গ করে। পরে পর্যটকবাহী যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়।
আইএসপিআর আরও জানায়, বেলা ১১টার দিকে ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও পর্যটকদের লক্ষ্য করে আনুমানিক ৩০ থেকে ৪০ রাউন্ড গুলী ছোড়েন। এসময় আত্মরক্ষা এবং পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনীর টহল দল পাল্টা গুলী ছোড়ে। একপর্যায়ে সশস্ত্র ব্যক্তিরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান। পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশের সমন্বিত প্রচেষ্টায় আটকে পড়া পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেয়া হয়। এ ঘটনায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটে নি বলে জানিয়েছে আইএসপিআর।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, অবরোধ ও সহিংসতার ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। স্থানীয় লোকজনকে ভয়ভীতি দেখিয়ে অবরোধে অংশ নিতে বাধ্য করা এবং তাদের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগও করেছে আইএসপিআর। পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর চলমান অভিযানের প্রেক্ষাপটে ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যদের একটি অংশ কোণঠাসা হয়ে পর্যটন এলাকায় অবস্থান নিয়েছে।
এ ধরনের সহিংস কর্মকাণ্ড পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি, স্থিতিশীলতা ও জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করার পাশাপাশি পর্যটনশিল্প এবং স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে উল্লেখ করেছে আইএসপিআর। পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি, সম্প্রীতি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং স্থানীয় জনগণ ও পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বেসামরিক প্রশাসন ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে সেনাবাহিনীর কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলেও বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে আইএসপিআর।
এদিকে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তৃতীয় দফায় সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের ডাকা অনির্দিষ্টকালের জন্য সড়ক অবরোধ কর্মসূচি শুরু হয়। তবে সকাল পৌনে ৯টার দিকে সাজেকে অবস্থানকারী পর্যটকবাহী গাড়ি নিয়ে প্রায় আড়াই হাজার পর্যটক সাজেক পর্যটনকেন্দ্র ত্যাগ করেন। পরে গাড়িবহরগুলো গঙ্গারামের উজো বাজার এলাকায় পৌঁছালে সেখানে সড়কের ওপর অবরোধকারীরা অবস্থান করায় আটকে পড়েন পর্যটকরা। পরে অবস্থানকারীদের সড়ক থেকে সরিয়ে পর্যটকদের গাড়িবহর নিরাপদে পৌঁছে দেওয়া হয়। এ সময় অবরোধকারীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলে অবরোধকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
সাজেক থানার ওসি মো. তোফাজ্জল হোসেন সত্যতা নিশ্চিত করে বলেছেন, ‘সকাল ১১টার দিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে লক্ষ্য করে ইউপিডিএফ অস্ত্রধারীরা গুলী বর্ষণ করে। এতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও পাল্টা গুলী করলে উভয় পক্ষের মধ্যে গোলাগুলীর বিনিময় হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে জানিয়েছেন রাঙামাটির পুলিশ সুপার আব্দুর রকিব। রাঙামাটি পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার বলেন, সাজেকে অবস্থানরত পর্যটকদের নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দিতে উজোবাজারে অবরোধকারীদের সড়ক ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ জানায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ সময় অবরোধকারীরা বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। এতে সেনাবাহিনীর তিন থেকে চারজন সদস্য এবং পুলিশের দুই সদস্য আহত হন। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলী ছোড়া হলে বাহিনীর সদস্যরাও পাল্টা গুলী চালান। বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত থেমে থেমে প্রায় দুই ঘণ্টা গোলাগুলী হয়।
এদিকে রাঙামাটির সাজেকে সড়ক অবরোধকারীদের ওপর হামলা, লাঠিচার্জ এবং ঘরবাড়ি ও দোকানপাট ভাঙচুরের অভিযোগ এনে আগামীকাল শনিবার রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় অর্ধদিবস সড়ক ও নৌপথ অবরোধের ডাক দিয়েছে ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে সংবাদমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে সংগঠনটি এ কর্মসূচি ঘোষণা করে। এসময় সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক বাবুধন চাকমা ও সাজেক কারবারী এসোসিয়েশনের সভাপতি নতুন জয় চাকমা যৌথ বিবৃতিতে দুই জেলায় শনিবারের অবরোধে সংগঠন দুটির সংহতি প্রকাশ করেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, সাজেকে জেএসএসের সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার দাবিতে আহূত শান্তিপূর্ণ সড়ক অবরোধে হামলা ও ভাঙচুরের প্রতিবাদ এবং সাজেকবাসীর ন্যায্য দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে এ কর্মসূচি পালন করা হবে। বিবৃতিতে সংগঠনটির সভাপতি উষাতন চাকমা জানান, শনিবার সকাল ৫টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত দুই জেলায় সড়ক ও নৌপথে অবরোধ চলবে। কর্মসূচি সফল করতে পার্বত্য চট্টগ্রামের সব গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল সংগঠন এবং রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলার যানবাহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর সহযোগিতা কামনা করেছেন তিনি।
