রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, যানজট কমানো এবং যাত্রীসেবার মান উন্নয়নে সমন্বিত উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। প্রথম ধাপে আগামী ১ নভেম্বর থেকে ছয়টি রুটে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হচ্ছে ‘এক রুট, এক কোম্পানি’ নীতিতে ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক বাস চলাচল। একই সড়কে বাসের অসুস্থ প্রতিযোগিতা কমিয়ে নির্ধারিত রুট ও স্টপেজের মাধ্যমে সমন্বিতভাবে গণপরিবহন পরিচালনা এ উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য।
এ পরিকল্পনার আওতায় ২০ বছরের বেশি পুরোনো বাস সরিয়ে নেওয়া, গুরুত্বপূর্ণ বাস টার্মিনালের ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন, রাজধানীর ৩১টি সড়ক রুট সংস্কার এবং অটোরিকশা চলাচলে নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ রয়েছে। পাশাপাশি বাসস্টপেজ নির্ধারণ, ফুটপাত দখলমুক্ত করা এবং ট্রাফিক আইন প্রয়োগ জোরদারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হবে। তবে এর সুফল পেতে পর্যাপ্ত বাস, নিয়মিত সময়সূচি, কার্যকর নজরদারি এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয় নিশ্চিত করা জরুরি।
ছয় রুটে পরীক্ষামূলক বাস চলাচল: ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) ডেপুটি ট্রান্সপোর্ট প্ল্যানার ধ্রুব আলমের তথ্য অনুযায়ী, ১ নভেম্বর থেকে পাঁচটি নন-এসি ও একটি এসি রুটে পরীক্ষামূলকভাবে বাস চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি তিনটি সার্কুলার রুটে বাস চালুর প্রস্তুতি চলছে, যা শুরু হতে আরও প্রায় দুই মাস সময় লাগতে পারে।
প্রাথমিক ছয়টি রুট হলো গাজীপুর-ঢাকেশ্বরী মন্দির, গাবতলী-ডেমরা, দুয়ারীপাড়া-সদরঘাট, ঘাটারচর-ডেমরা, ঘাটারচর-কাঁচপুর এবং মিরপুর-১২-মাওয়া।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, গাজীপুর-ঢাকেশ্বরী মন্দির রুটে টঙ্গী, বিমানবন্দর, মহাখালী ও নিউমার্কেট হয়ে বাস চলবে। গাবতলী-ডেমরা রুটে শ্যামলী, মহাখালী, গুলশান-১ ও রামপুরা যুক্ত থাকবে। দুয়ারীপাড়া-সদরঘাট রুটে শ্যামলী, সায়েন্সল্যাব ও আজিমপুর হয়ে বাস চলাচল করবে।
অন্যদিকে, ঘাটারচর-ডেমরা রুটে মোহাম্মদপুর, শাহবাগ ও রামপুরা এবং ঘাটারচর-কাঁচপুর রুটে শাহবাগ, পল্টন, যাত্রাবাড়ী ও সাইনবোর্ড হয়ে বাস চলার পরিকল্পনা রয়েছে। মিরপুর-১২ থেকে মাওয়া রুটে ফার্মগেট, শাহবাগ, গুলিস্তান ও কেরানীগঞ্জ হয়ে বাস চলবে। পরবর্তী পর্যায়ে ফার্মগেট-পলাশী, মোহাম্মদপুর-পলাশী এবং কদম চত্বর-পঞ্চবটি সার্কুলার রুট চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
বাসের প্রতিযোগিতা কমানোই লক্ষ্য: বর্তমানে একই সড়কে একাধিক কোম্পানির বাস যাত্রী ওঠানোর জন্য প্রতিযোগিতা করে। আগে যাওয়ার চেষ্টা, হঠাৎ লেন পরিবর্তন এবং নির্ধারিত স্থানের বাইরে বাস থামানোর কারণে যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। নতুন ব্যবস্থায় রুটভিত্তিক পরিচালনা, নির্ধারিত স্টপেজ এবং সমন্বিত সময়সূচি চালু করা গেলে এসব সমস্যা কমানো সম্ভব।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সহকারী অধ্যাপক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজের মতে, গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে রুটভিত্তিক পরিচালনা গুরুত্বপূর্ণ। তবে একটি রুটে কোম্পানি নির্ধারণ করলেই হবে না; বাসের সংখ্যা, চলাচলের বিরতি, স্টপেজে থামা এবং নিয়মিত তদারকিও নিশ্চিত করতে হবে। যাত্রী চাহিদার তুলনায় বাস কম হলে অপেক্ষার সময় ও ভিড় বাড়তে পারে।
পুরোনো বাস ও টার্মিনাল ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন: রাজধানীর ২০ বছরের বেশি পুরোনো বাস সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। দীর্ঘদিন ব্যবহৃত বাসের যান্ত্রিক ত্রুটি ও রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি সড়ক নিরাপত্তা এবং পরিবেশের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তবে পুরোনো বাস অপসারণের পাশাপাশি বিকল্প যানবাহন যুক্ত করা এবং যাত্রী পরিবহন স্বাভাবিক রাখা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে ফিটনেস, যান্ত্রিক অবস্থা ও পরিবেশগত মান বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
সায়েদাবাদ, গাবতলী, মহাখালী ও গুলিস্তানের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বাসের চাপ কমাতে টার্মিনাল ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় আন্তঃজেলা বাসের সঙ্গে নগর পরিবহনের সংযোগ, পার্কিং এবং যাত্রী ওঠানামার সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে রাজধানীর পুরোনো ৩১টি সড়ক রুট সংস্কারের ক্ষেত্রে যাত্রী চাহিদা, মেট্রোরেল স্টেশন এবং গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যের সঙ্গে সংযোগ বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
স্টপেজ, ফুটপাত ও অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে জোর: নতুন বাসব্যবস্থা কার্যকর করতে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ও দুই সিটি করপোরেশনকে বাসস্টপেজ চিহ্নিত করা, টিকিট কাউন্টার স্থাপন এবং ফুটপাতের অবৈধ দখল উচ্ছেদের উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে। অনুমোদনহীন ব্যাটারিচালিত রিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণেও নীতিমালা প্রণয়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুল আলমের মতে, নির্ধারিত স্টপেজে বাস থামানো এবং নিয়ম ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের প্রধান সমন্বয়কারী ও সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাসও ডিটিসিএ, পুলিশ এবং পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোর সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
সড়ক পরিবহন ও সেতু বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক জানিয়েছেন, পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে বাস্তবায়নযোগ্য কর্মপরিকল্পনা, দায়িত্ব বণ্টন ও নিয়মিত অগ্রগতি মূল্যায়নে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বাসের রুট নির্ধারণের পাশাপাশি পর্যাপ্ত যানবাহন, কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ ফুটপাত এবং আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে উদ্যোগটি কার্যকর হতে পারে। সমন্বিত বাস্তবায়নই রাজধানীর যাতায়াতব্যবস্থাকে আরও সুশৃঙ্খল ও যাত্রীবান্ধব করার প্রধান শর্ত।
