সংগঠনের মাসিক চাঁদা দিতে দেরি হলে সদস্যদের কাছ থেকে জরিমানা আদায় করা যাবে কি না, তা নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে জরিমানার টাকা সংগঠনের ব্যবসায়িক লাভ হিসেবে গণ্য করে সদস্যদের মধ্যে বণ্টন করা কিংবা বাধ্যতামূলকভাবে সদকা ফান্ডে জমা দেওয়ার বিধান কী, তা নিয়েও রয়েছে জিজ্ঞাসা।
এ বিষয়ে একটি ফতোয়ায় বলা হয়েছে, মাসিক চাঁদা পরিশোধে বিলম্বের কারণে অতিরিক্ত টাকা জরিমানা হিসেবে আদায় করে সংগঠনের আয় বা সদস্যদের মধ্যে বণ্টন করা জায়েজ নয়। তবে যে অর্থ নির্ধারিত সময়ে জমা না পড়ায় সংগঠনের ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হয়নি, সেই অর্থের বিপরীতে সংশ্লিষ্ট সদস্যকে লভ্যাংশ না দেওয়ার নিয়ম করা যেতে পারে।
চাঁদা দিতে দেরি হলে লভ্যাংশ পাবেন কি?
ফতোয়ায় বলা হয়েছে, কোনো সদস্য যে পরিমাণ চাঁদা যে সময় পর্যন্ত পরিশোধ করেননি, সেই অর্থ ওই সময় সংগঠনের ব্যবসায় বিনিয়োগ করা সম্ভব হয়নি। তাই ওই বকেয়া অর্থের বিপরীতে সংশ্লিষ্ট সদস্যকে লভ্যাংশ না দেওয়ার নিয়ম করা জায়েজ।
তবে যথাসময়ে জমা দেওয়া তার অন্য মূলধনের বিপরীতে প্রাপ্য লভ্যাংশ থেকে তাকে বঞ্চিত করা যাবে না। অর্থাৎ, যে অর্থ ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হয়নি, শুধু সেই অর্থের বিপরীতে সংশ্লিষ্ট সময়ের লভ্যাংশ না দেওয়ার বিধান রাখা যেতে পারে।
সদকা ফান্ডে বাধ্যতামূলক টাকা দেওয়া যাবে?
ফতোয়ায় বলা হয়েছে, চাঁদা দিতে দেরি হলে প্রতি মাসের জন্য ২০ বা ৫০ টাকা করে সদকা ফান্ডে জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা জায়েজ নয়।
তবে কোনো সদস্য আগে থেকেই স্বেচ্ছায় অঙ্গীকার করেন যে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও নির্ধারিত সময়ে চাঁদা না দিলে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ সদকা করবেন এবং সেই অর্থ সংগঠনের আয় বা সদস্যদের মধ্যে বণ্টন না করে শুধু অসহায়দের কল্যাণে ব্যয় করা হবে, তাহলে এ বিষয়ে সমসাময়িক ফকিহদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
ফতোয়ায় উল্লেখ করা হয়েছে, কোনো কোনো ফকিহ শর্তসাপেক্ষে এ ধরনের অঙ্গীকার গ্রহণযোগ্য মনে করলেও অন্যরা তা বিচারিকভাবে বাধ্যতামূলক বলে গণ্য করেননি। তাই এ পদ্ধতিকে সর্বসম্মতভাবে জায়েজ বলা যাবে না। মতভেদ এড়াতে বকেয়া অর্থের বিপরীতে লভ্যাংশ না দেওয়ার প্রথম পদ্ধতি অনুসরণ করাকে অধিক নিরাপদ বলা হয়েছে।
জরিমানার টাকা লাভ হিসেবে বণ্টন করা যাবে?
ফতোয়ায় তৃতীয় পদ্ধতিকে নাজায়েজ বলা হয়েছে। এ পদ্ধতিতে কোনো সদস্য চাঁদা দিতে দেরি করলে প্রতি মাসের বকেয়ার জন্য অতিরিক্ত ৫০ বা ১০০ টাকা আদায় করে সেটিকে ব্যবসায়িক লাভ হিসেবে গণ্য করা হয় এবং অন্য সদস্যদের মধ্যে বণ্টন করা হয়।
ফতোয়ায় বলা হয়েছে, অতিরিক্ত অর্থকে ‘প্রফিট’ বা লভ্যাংশ নাম দিলেও প্রকৃতপক্ষে তা বিলম্বের কারণে ধার্য করা জরিমানা। তাই এ অর্থ আদায় করে সংগঠনের আয় হিসেবে রাখা কিংবা সদস্যদের মধ্যে বণ্টন করা বৈধ হবে না।
এ প্রসঙ্গে ফতোয়ায় ইসলামি ফিকহের বিভিন্ন গ্রন্থের উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বুহুস ফি কাজায়া ফিকহিয়্যা মুআসিরা, মাজাল্লাতু মাজমাউল ফিকহিল ইসলামী, আল-ফাতাওয়াল আলমগিরিয়্যা এবং রদ্দুল মুহতার।
চাঁদা আদায়ে শৃঙ্খলা বজায় রাখার উপায়
ফতোয়ায় বলা হয়েছে, সদস্যদের সময়মতো চাঁদা আদায়ে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য নির্দিষ্টসংখ্যক কিস্তি বকেয়া হলে সদস্যপদ বাতিল করার নিয়ম করা যেতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সদস্যের মূলধন ও প্রাপ্য লভ্যাংশের শরিয়তসম্মত হিসাব করে তাঁর পাওনা পরিশোধ করতে হবে।
অর্থাৎ, চাঁদা আদায়ে শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য এমন ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে, যাতে বিলম্বের কারণে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে অন্য সদস্যদের মধ্যে বণ্টন করতে না হয়।
ফতোয়াটির উপসংহারে বলা হয়েছে, সংগঠনের জন্য প্রথম পদ্ধতি অনুসরণ করাই উত্তম। অর্থাৎ, যে অর্থ সময়মতো জমা না পড়ায় ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হয়নি, শুধু সেই অর্থের বিপরীতে সংশ্লিষ্ট সদস্যকে লভ্যাংশ না দেওয়ার নিয়ম রাখা যেতে পারে।
ফতোয়া প্রদানকারী: মুহাম্মাদ আশরাফুল আলম, মুফতি, ফতোয়া বিভাগ, জামিয়া দারুল উলুম আল ইসলামিয়া, পল্লবী, ঢাকা; খতিব, দারুল খুলদ কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, মুন্সিবাগ, নারায়ণগঞ্জ।