প্রথম দৃশ্য
ঘটক নিত্যানন্দ যেদিন বললেন পাত্র বিলেতফেরত, সেদিনই সন্দেহ হলো; কারণ, ঘটকমশাই আজ পর্যন্ত একটাও সত্যি কথা বলেননি।
গত বছর তিনি দিদির জন্য এক ডাক্তার পাত্র এনেছিলেন। শেষে দেখা গেল সে ডাক্তারখানার কম্পাউন্ডার, আর ডাক্তারি বিদ্যার দৌড় বড়জোর কুইনাইন আর পুরোনো ভাতের তফাত বোঝা পর্যন্ত। তার আগের বছর এনেছিলেন ‘জমিদারের একমাত্র ছেলে’। পরে জানা গেল জমিদার একজনই, কিন্তু ছেলে সাতজন। আর তাঁদের মধ্যে ইনি সপ্তম, যাঁকে বাড়ির কুকুরটাও ঠিকমতো চেনে না।
সালটা ১৯২৪। আমাদের কালীগঞ্জ গাঁয়ে তখন সবে ডাকঘর বসেছে, স্টিমার আসে সপ্তাহে তিন দিন, আর সাহেব বলতে লোকে চেনে শুধু ভাঙা নীলকুঠির গল্প। ঘটকমশাই সপ্তাহখানেক ধরে আমাদের অতিথিশালায় ডেরা বাঁধা, কলকাতার চিঠির অপেক্ষায়। তাঁর একটা নিয়ম আছে—পাত্র পাকা না হওয়া পর্যন্ত মেয়ের বাড়ির অন্ন মুখে তোলেন না। চা খান, জল খান, কিন্তু ভাত নয়। খিদে পেলে পকেট থেকে মুড়ির ঠোঙা বের করেন। বলেন, ওটা ঘটকদের ব্রত। আমি বলি, ওটা ঘটকদের বাহানা।
সেদিন সকালে সেই ঘটকমশাই যখন অতিথিশালা থেকে ছুটে এসে আমাদের উঠানে হাজির হলেন, বাড়িসুদ্ধ লোকের মুখ এমন উজ্জ্বল হয়ে উঠল যেন ভাদ্র মাসে হঠাৎ পূর্ণিমা উঠেছে।
‘কর্তামশাই, এবার আর ফসকাবে না,’ ঘটক হাঁপাতে হাঁপাতে দাওয়ায় বসে পড়লেন। ‘সাত বছর বিলেতে ছিলেন, বুঝলেন? লন্ডন শহরে। ইংরেজি বলেন স্বপ্নেও।’
বাবা হাতের হুঁকা নামিয়ে রাখলেন। বাবার মুখে তখন এমন ভাব, যেন কেউ তাঁর হাতে স্বর্গের চাবি তুলে দিয়েছে।
‘সাত বছর!’ বাবা গদগদ হয়ে বললেন। ‘বিলেতে এত বছর কী করতেন?’
‘পড়াশোনা, কর্তামশাই, পড়াশোনা। রাজা-মহারাজার সঙ্গে ওঠাবসা। শুনেছি টেমস নদীর জলে নাকি রোজ সকালে স্নান করতেন।’
আমি রান্নাঘরের জানালার আড়াল থেকে সবটা শুনছিলাম। টেমস নদীতে রোজ স্নান! লন্ডনের শীতে সাহেবরাই তো জমে যায়, আর এই লোক নাকি রোজ ভোরে ডুব দিত। হয় লোকটা অতিমানব, নয় ঘটকমশাই অতিমিথ্যুক। দুটোর মধ্যে কোনটার সম্ভাবনা বেশি, সেটা বুঝতে অঙ্ক কষার দরকার হয় না।
আমার নাম অনুপমা। বয়স ষোলো। গ্রামের লোক বলে আমি নাকি বড্ড বেশি বুঝি। আমার মতে ব্যাপারটা উল্টো, গ্রামের লোকই বড্ড কম বোঝে।
‘পাত্রের নাম?’ দিদির জন্য বাবার এত ব্যাকুলতা দেখে আমার একটু মায়াই হচ্ছিল।
‘মৃণাল। মৃণালকান্তি দত্ত। তবে বিলেতে সবাই তাঁকে “মিস্টার মৃণাল” বলে ডাকত।’
রান্নাঘরের এক কোণ থেকে পিসিমার গলা ভেসে এল। পিসিমা সারা দিন ঘুরে ঘুরে সব কথায় একটা করে উল্টো মন্তব্য করেন, আর সেটাই তাঁর একমাত্র সংসারধর্ম।
‘বিলেতে গিয়ে কেউ ফেরে নাকি?’ পিসিমা বড় হাতাটা নাড়তে নাড়তে বললেন। ‘আমার ভাশুরের শ্যালক গিয়েছিল কাশী, সেই যে গেল আর এল না। বিলেত তো কাশীর চেয়েও দূর। ফিরে এসেছে যখন, নিশ্চয়ই কোনো গোলমাল আছে।’
ঘটকমশাই এ কথায় একটুও না ঘাবড়ে বললেন, ‘না, না, দিদিঠাকরুন, ফেরার ইচ্ছে ছিল না। দেশের মাটির টানে ফিরেছেন। দেশপ্রেমিক মানুষ।’
‘দেশপ্রেমিক হলে বিলেত গেল কেন?’ পিসিমা চুপ করলেন না।
বাবা বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘দিদি, তুমি রান্নাঘরে ফিরে যাও তো।’
‘আমি তো রান্নাঘরেই আছি,’ পিসিমা গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘তোমরাই উঠোনে এসে রান্নাঘরের কান ভারী করছ।’
আমি হাসি চেপে রাখতে গিয়ে প্রায় বিষম খেলাম।
ওদিকে ঘটকমশাই পকেট থেকে একটা কাগজ বের করলেন। কাগজটা হলুদ হয়ে যাওয়া, কোণ ছেঁড়া, আর তাতে সাহেবি অক্ষরে কী যেন লেখা।
‘এই দেখুন, বিলেতের সার্টিফিকেট।’
বাবা কাগজটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ উল্টেপাল্টে দেখলেন। বাবা ইংরেজির এক বর্ণও জানেন না, কিন্তু গম্ভীর মুখ করে এমনভাবে পড়লেন যেন প্রতিটি শব্দ তাঁর মুখস্থ।
‘হুম। ভালো, ভালো। অক্ষরগুলো দেখেই বোঝা যাচ্ছে খাঁটি মাল।’
ঘটকমশাই আড়চোখে একবার আমার দিকে তাকালেন। আমি জানালার ফাঁক দিয়ে ঠিক তাঁর চোখে চোখ রাখলাম। তিনি চোখ সরিয়ে নিলেন। যে মানুষ সত্যি বলে, সে চোখ সরায় না। ওটাই আমার প্রথম প্রমাণ।
দ্বিতীয় প্রমাণ পেলাম একটু পরে। ঘটকমশাই যখন চা খেতে খেতে বিলেতের গল্প শোনাচ্ছিলেন। লক্ষ করলাম, তিনি লন্ডনের কথা বলছেন, কিন্তু কোনো রাস্তার নাম বলছেন না, কোনো দোকানের নাম বলছেন না। শুধু বলছেন ‘বিশাল’, ‘সুন্দর’, ‘অপূর্ব’। যে মানুষ কোনো জায়গা সত্যিই দেখেছে, সে ‘অপূর্ব’ বলে না; বলে ‘ওখানে বড্ড কাদা ছিল’ কিংবা ‘চায়ের দাম ছিল চড়া’।
রাতে শুতে যাওয়ার আগে দিদি আমার পাশে এসে বসল। দিদির নাম মালবিকা, বয়স উনিশ। সে এত দিন পাত্র দেখার ধাক্কায় এমন ক্লান্ত যে বিয়ের কথা উঠলেই তার চোখ আপনা থেকেই ছাদের দিকে চলে যায়।
‘তুই কিছু বলছিস না কেন রে?’ দিদি আস্তে করে জিজ্ঞেস করল।
‘কী বলব?’
‘বিলেতফেরত পাত্রের কথা। সবাই তো খুব খুশি।’
আমি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললাম, ‘দিদি, তোকে একটা কথা দিচ্ছি। এই মৃণালবাবু যদি সত্যিই বিলেত গিয়ে থাকেন, আমি তোর বিয়েতে সবার আগে নাচব। আর যদি না গিয়ে থাকেন...’
‘তাহলে?’
‘তাহলে আমি সবচেয়ে আগে সেটা ধরব।’
দিদি হেসে ফেলল। ‘তুই না পারিস এমন কিছু আছে?’
‘আছে। আমি এখনো জানি না ঘটকমশাই পকেটে সব সময় মুড়ির ঠোঙা রাখেন কেন।’
দিদি খিলখিল করে হেসে উঠল, আর পাশের ঘর থেকে পিসিমার ঘুমন্ত গলা শোনা গেল—
‘রাতবিরেতে হাসাহাসি! বিলেতফেরত এলে এ বাড়ির মেয়েরা আরও কী কী করবে কে জানে!’
আমি বালিশে মুখ গুঁজে নিজেকে বললাম, ‘অনুপমা, কাল থেকে কাজে লেগে পড়তে হবে।’
শিক্ষার্থী, কক্সবাজার সরকারি কলেজ
