চারদিকে নারী আর নারী। কারও হাতে রঙিন চুড়ি, কারও চোখ বাহারি অলংকারে। কোথাও চলছে দরদাম, কোথাও হাসি-আড্ডায় মেতে উঠেছেন একদল নারী। কেনাবেচা থেকে আনন্দ-উৎসব—সবকিছুর প্রাণ তাঁরা। পুরুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়াই নারীদের সরব উপস্থিতিতে জমে উঠেছে ব্যতিক্রমী এক আয়োজন, যার নাম ‘বউমেলা’। শত বছরের ঐতিহ্য ধরে শারদীয় দুর্গাপূজার বিজয়া দশমীতে বসে এই মেলা। ইছামতীর তীরে এক দিনের এ আয়োজন যেন নারীদের একান্ত আপন ভুবন।
বুধবার বগুড়ার ধুনট পৌর এলাকার সরকারপাড়া ইছামতী নদীর তীরে দিনব্যাপী বসে বউমেলা। শাশুড়ি, ননদ, জা-ঝি থেকে শুরু করে শিশু-কিশোরী—সব বয়সী নারীর পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে সবুজ-শ্যামল চত্বর।
মেলায় কাঁচের চুড়ি, রঙিন ফিতা, লিপস্টিক, কানের দুল ও ঝিনুকের মালাসহ নানা প্রসাধনসামগ্রীর পসরা সাজিয়ে বসেন বিক্রেতারা। পছন্দের জিনিস কেনার ধুমের পাশাপাশি চলে দরদাম আর খুনসুটি। কদমা, নিমকি, শখের মিঠাই, চানাচুর, খই ও বাতাসাসহ হরেক রকম খাবারের ঘ্রাণে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে পুরো মেলাপ্রাঙ্গণ।
মেলার অন্যতম আকর্ষণ মাটির তৈরি বাহারি খেলনা। কুমারদের নিপুণ হাতে গড়া রঙিন ব্যাংক, বউ পুতুল, সাহেব-মেম, গরু, ছাগল, হাতি, বাঘ, সিংহ, ময়ূর ও নানা পাখির প্রতিকৃতি ক্রেতাদের আকৃষ্ট করে। এসব খেলনার মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে গ্রামবাংলার চিরচেনা লোকজ শিল্প ও ঐতিহ্য।
স্থানীয়রা জানান, যুগ যুগ ধরে বিজয়া দশমীতে এ মেলার আয়োজন হয়ে আসছে। শুরুতে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও সময়ের সঙ্গে বউমেলা এখন সব ধর্মের মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।
নারীদের জন্য আলাদা একটি পরিসর তৈরির ভাবনা থেকেই মেলার সূচনা। তাই বছর ঘুরে এই বিশেষ দিনটির জন্য অপেক্ষা করেন অনেকে। এখানে কেনাকাটার পাশাপাশি পরিচিতজনদের সঙ্গে দেখা করা, গল্প করা এবং নিজেদের মতো করে সময় কাটানোর সুযোগ পান নারীরা।
মেলায় আসা অনিতা রানী দাস বলেন, “পুরোনো ঐতিহ্য ধরে রেখেছে সরকারপাড়া বউমেলা। আমি আসি ঐতিহ্যের গরম জিলাপি নিতে। এ ছাড়া এই একটি দিন নিজেদের মতো করে ঘোরাফেরা, কেনাকাটা ও পরিচিতজনদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগির সুযোগ মেলে।”
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি অন্য ধর্মের মানুষও ঘুরতে এসেছেন এক দিনের এ মেলায়। বন্ধুদের নিয়ে মেলায় আসেন মিল্লাত হোসেন। তিনি বলেন, “পুরোনো স্মৃতির পটভূমিতে নতুন করে আঁচড় কাটে মেলাটি। তাই বছর ঘুরে এই দিনটির জন্য অপেক্ষায় থাকি। বৈশাখ আর পূজা ছাড়া এমন আমেজ তো পাওয়া যায় না।”
মেলা আয়োজক কমিটির সাধারণ সম্পাদক পার্থ সেন বলেন, গ্রামীণ ঐতিহ্য ধরে রাখতে তাঁরা যুগ যুগ ধরে শান্তিপূর্ণভাবে এ মেলার আয়োজন করে আসছেন। দিনভর কেনাকাটা, আড্ডা ও আনন্দ-উৎসবের পর সন্ধ্যায় ইছামতী নদীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় আয়োজন।
ইছামতীর তীরে সরকারপাড়া বউমেলা তাই কেবল কেনাবেচার আয়োজন নয়; এটি নারীদের নিজস্ব পরিসর, লোকজ সংস্কৃতি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। শত বছরের ঐতিহ্য বুকে ধারণ করে মেলাটি আজও গ্রামীণ জীবনে আনন্দ ও মিলনের এক বিশেষ উপলক্ষ হয়ে আছে।
The post ধুনটে দূর্গোৎসবকে ঘিরে জমজমাট বউমেলা appeared first on ভোরের চেতনা.
