আধ্যাত্বিক মহাগুরু এবং বাউল চিন্তার একক নায়ক ফকির লালন শাহ্। অতি নগরায়নের বিজ্ঞান মনজ গতিময় পৃথিবীর মানুষেরা এ সাধকের কাছে প্রতিনিয়ত সমর্পিত হচ্ছেন।
দেশ-বিদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে অসংখ্য মানুষ বেছে নিচ্ছেন এ আধ্যাত্বিক সাধকের দর্শন। গ্রামীন জনপদ থেকে আধ্যত্ব ভাব পিপাসুদের একীভূত করেছেনও মরমি সাধক। অথচ তার সমাজ চিন্তা, মানব প্রেম ও মনুষ্যত্ববোধের পরিচয় আজো উপেক্ষিত। স্রষ্টার প্রতি ভক্তি বা আনুগত্য স্বীকারের কর্ম অনুষ্ঠান, জ্ঞান, কর্মভক্তি ও যোগের মাধ্যমে স্রষ্টার প্রতি নত হওয়া বা প্রভুর সেজদায় লুটিয়ে পড়ার জ্ঞান অবতার প্রেম সুধাকর ফকির লালন সাঁইজি। সহজিয়া সাধনা মানুষের অন্তর থেকে সৃষ্টি। আর এ সাধনায় মধ্যযুগে গতি সঞ্চার হয়েছে। যার মহামিলন ক্ষেত্র ভারতবর্ষ। যুগে-যুগে এখানে নানা ধর্ম ও মতের সৃষ্টি হয়েছে। জ্ঞানপথ, যোগপথ, ভক্তিপথ ও কর্মপথসহ সব পথেরই সন্ধান দিয়েছেন ভারতবর্ষের সাধকেরা। এখানে শক্তির সঙ্গে আনের, আনের সঙ্গে ভক্তির এবং ভক্তির সঙ্গে কর্মের অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে।
এ বঙ্গদেশও এর বাইরে নয়। চৈতনা উত্তরকালে এখানেও কয়েকটি ক্ষুদ্র ধর্ম সম্প্রদায়ের সৃষ্টি হয়েছে। এদের মধ্যে আউল, বাউল, সাঁই, দরবেশ, কর্তাভজা ও সহজিয়াকেই প্রধান ধরা হয়। বে নদীয়ার শ্রোতধারায় বাউল সাধনায় ফকির লালন সাঁই আধ্যত্ব গান ও সাধন ভজনে সবচেয়ে প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। সে সময় তাঁর আধ্যাত্ব জ্ঞান পরিমাপ করা সম্ভবপর না হলেও তার তত্ত্বকথার সুর আচ্ছাদিত গানের বাণী সাধারণ মানুষের আনুগত্য এনেছে। এ ধারাবাহিকতা থেমে নেই, ক্রমেই বেড়ে চলেছে তাঁর ভক্ত-শিষ্য ও অনুসারী। এ সাধকের ঘরানায় গানের দেশ ও করণ দেশ দুইই গ্রহন করে দীতি হয়েছেন অসংখ্য বাউল। তাঁরা আজো কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেউরিয়া আখড়া বাড়ির প্রাণ। এ বাউলরা তাঁর বাণীর মধ্যে সহজ পথ ও মতের মিলনে সহজ মানুষ হওয়ার চেষ্টা এবং অপর সাঁইজিকে খুজে ফিরেছেন একতারায়। এদের প্রত্যেকের জীবন বৈচিত্র্যময়। ভক্তি-কর্ম ও সাধনার যোগসূত্র পরস্পরায় মিশে আছে। গানের মধ্যে অপার সাইজিকে স্মরণ করা ও তাঁর সান্নিধ্য পাওয়ার আকাঙ্খা তাদের মধ্যে প্রকটভাবে রয়েছে। লালন ফকির প্রথমত ছিলেন একজন মানুষ। আর সেখানে তাঁর সাধনা ও উপলব্ধির মাধ্যমে জাগরণের যে তরঙ্গ তুলেছিলেন তা বিস্ময়কর।
তবে তাঁর সমাজ চিন্তা, মানব প্রেম ও মনুষ্যত্ববোধের পরিচয় আজো উপেক্ষিত। এরপরও অতি নগরায়ণের বিজ্ঞান মনষ্ক পৃথিবীর গতিময় মানুষরা নিরড়গর লালনের কাছে নতি স্বীকার করেছে। দেশ-বিদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে অসংখ্য মানুষ এ আধ্যাত্বিক সাধকের দর্শন অনুসরণ করতে আসছেন। গ্রামীন জনপদে লালন ফকির লোকায়ত জীবনের প্রভাবে মানব সমাজের একাংশকে যে একীভূত করেছেন তা অতুলনীয়। সহজ ভাবনার ভাববাদী মানুষরা এ সাধককে অনুসরণ করতে তাঁর দোল পূর্ণিমা উৎসব এবং মৃত্যুবার্ষিকী (স্মরণ) উৎসবে আখড়া বাড়িতে আসেন। কিন্তু নদীরায় স্রোতধারার উদার মানবতাবাদী ও ধর্ম সমন্বয়ের প্রাণ রামমোহন যেভাবে ভারত পথিক ও বাংলার নবজাগতির ‘ঋত্বিক’ হিসেবে সম্মানিত হয়েছে। এদিক থেকে লালন ফকিরকে একেবারেই স্পর্শ করা হয়নি। কিন্তু নবজাগতিক প্রেক্ষাপটে রামমোহন ও লালনের অসাম্প্রদায়িক চেতনা, মানবতাবাদ, সংস্কার ও জাতিভেদ বিদ্ধদ্ধ মনোভাবের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনেকখানি। এ দুই মহাপুরুষের জন্মই কাছাকাছি সময়ে (১৭৭৪-১৮৯০)।
তৎকালীন সময়ে শহর কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবীদেরই শুধু তুলে ধরার প্রবণতায় উপেক্ষিত হয়েছে গ্রাম-বাংলার বাউল সাধক ও মরমি কবি। এ বৈষম্য ঠেকাতে পারেনি লালন ফকিরের গতিময় দর্শন। যুগ যুগ ধরে যেমন ধর্ম শাস্ত্র আচ্ছাদিত গণ্ডি ভেদ করে একদল মানুষ ঠিকই মানব মুক্তি এবং ঈশ্বর লাভের পথ খুঁজেছেন। এখানে লালনের দর্শন থেকেছে সমন্বিত। ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও কলহ, জাতি-কুল ভেদাভেদ, বিরোধ, বর্ণ-শোষণ সামাজিক ও শ্রেণী-বৈষম্যে আচার-সর্বস্ব ধর্মানুষ্ঠান প্রত্যক্ষ করে সর্ব-সংস্কার মুক্ত মানবিক আদর্শে উদ্ধার হয়ে এক উদার ধর্ম-ধারণার জন্ম দিয়েছে বাংলার বৈষ্ণব বাউলরা। চারিত্রিক বিচারে বাংলার বাউল ও লালনের সাধনা-দর্শন এসব মরমি সম্প্রদায় ও সাধনার সমানধর্ম।
সহজিয়া ভাবনার লালন ফকির দীর্ঘ সাধনায় নিজস্ব দর্শন রেখে গেছেন। যে দর্শণ প্রেম, ভক্তি ও সন্ধানের। তবে এ সাধনার গুরুত্ব, ভূমিকা অগ্রগণ্য। গুরুবাদী এ সাধনায় রয়েছে মানুষ ভাগ, দেহ ভাগ ও আত্মা ভাগ। এর মধ্যে মানুষের ভাগ তিন প্রকার- যোনী সম্ভবা, অযোনী সম্ভবা, ও স্বতঃসিদ্ধ সহজ মানুষ। দেহেরও তিন ভাগ- ভোতিক দেহ, হুত দেহ ও নিত্য দেহ।
আত্মাকেও তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে- দেহাত্মা বা ভূতাত্মা, জীবাত্মা ও পরমাত্মা। তবে এ সহজিয়া ভাবনাকে পুঁজি করেই শুধু বাউল মতবাদ মাথা তুলে দাঁড়ায়নি। সহজিয়া, সুফিবাদ ও বৈষ্ণব সহজিয়া মতবাদের সংমিশ্রণেই বাউল মতবাদ হয়ে উঠেছে নিজস্ব এক ধর্ম ভাবনা। যেখানে সহজেই সহজ মনের মানুষের সন্ধান ও সাধনা ভজনের পথের দেখা মেলে।
লালন ফকির অনুসারী বাউলদের উপাসনা: মানুষ সাধন ভজনই বাউলদের সবচেয়ে বড় উপাসনা। তবে লালনের গানের মধ্যে দিয়ে অপার সাঁইজিকে অনুসরন করা ছাড়া বাউলরা, করণ দেশ নিয়ে বেশ গোপনীয়তা রক্ষা করেন। তাদের সাধনা মূলত দেহকেন্দ্রিক। এ দেহের মধ্যেই পরম পুরুষ, সহজ মানুষ, রসের মানুষ, অটল মানুষ, অধর মানুষ, ভাবের মানুষ, মনের মানুষ, অচিন পাখী বা সাঁই নিরঞ্জনের গুপ্ত খেলা রয়েছে। যা প্রকাশ্যভাবে সাধারণ মানুষ উপলব্ধি করতে পারে না। তবে বাউলরা একতারা হাতে দেহের মধ্যেই সাঁইজিকে খুঁজে ফেরেন। এছাড়াও তাদের যোগ অনুযোগের ব্যাপার রয়েছে।
বর্তমানে লালনের প্রভাবে বাউল মতের অন্য ঘরের বাউলদের পরিচয় একেবারে নিঃশেষ হওয়ার পথে। হাতে গোনা কয়েকজনকে পাওয়া যায়, যারা অন্য ঘরের বাউল। লালনের পথ ধরেই বেশির ভাগ মানুষ এ সাধন পথে রয়েছেন। শান্তিকামী বাউলদের অন্যতম যজ্ঞ সাধুসঙ্গ: বাউল অনুসঙ্গের অন্যতম একটি যজ্ঞ সাধুসঙ্গত সাধু-গুরুদের বাড়ির আঙিনায় এনে খাওয়ানোও সাধনার মধ্যে পড়ে। এ ছাড়া বছরে একবার বাউলরা সাধুসঙ্গ করে থাকে। সাধারণত খিলকা নেয়ার দিনটাকে তারা স্মরণে রেখে এ আয়োজন করে। অথবা কেউ সাধু-গুরুদের খাওয়াবে এ ইচ্ছায় সাধুসঙ্গ আয়োজন করেন। এ অনুষ্ঠানে বাউল অনুসারী ভক্ত ও শিষ্যরা ছাড়া শুধু বাউল মনের মানুষ থাকার সুযোগ পান। এ উপলক্ষে যে কয় ঘন্টার অধিবাস হয়, তা একেবারে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সময় হিসাব করে শেষ হয়।
এখানে থাকা এবং খাওয়া থেকে শুরু করে চলা ও বলাতেও নানা সংযমী নিয়ম রয়েছে। এ কারণে এ আচার শুধু বাউলরাই মেনে চলেন। তবে খুবই শৃংখলা ও ভক্তির সঙ্গে অধিবাস অতিবাহিত হয়। আর অধিবাস শুরু হয় “আলেক সাই” ডেকে। সাধুসঙ্গে সকালে বাল্য সেবা, দুপুরে পূর্ণ সেবা দেয়া হয়। বাল্য স্নোয় দুধ এবং দইয়ের সঙ্গে মুড়ি কলাপাতায় দেয়া হয় সবাইকে। দুপুরে ডাল-ভাত, সবজি দেয়া হয়। রাতেরও একই রকম খাবার খাওয়ানো হয় বাউলদের।
লালনের শেষ দিনগুলোঃ বঙ্গদেশ ঘুরে লালন ফকির ছেউড়িয়ায় আখড়া বাড়ি স্থাপন করেন। এখানেই থেকেছেন শেষ দিন পর্যন্ত। তিনি বার্ধক্যজনিত কারণে অসুস্থ হয়ে পড়লেও ঘোড়ায় চরে ঘুরতে বের হতেন। তাঁর এ বয়সে শিষ্য-ভক্তরা জীবিকার দায়িত্ব গ্রহন করেন। সঙ্গিনী বিশোখা, পালিত ছেলে শীতল শাহ্, বলাই শাহ, মেয়ে পিয়ারী এবং অন্য ভক্ত-অনুসারীরা তাঁর পাশে সব সময় থাকতেন।
শেষ বয়সেও তিনি তাঁর গানের আসর খুব পছন্দ করতেন। তাই ভক্ত-অনুসারীরা সব সময় তাঁর গান নিয়ে মেতে থাকতো। নিরামিষ ভোজী হওয়ায় তাঁর দেহে রোগের আক্রমণ ছিল না বলেই চলে। কিন্তু বার্ধক্য তাঁকে জাপটে ধরে।
আর এতেই তিনি অসুস্থতায় নিমজ্জিত হন। হঠাৎ পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হন। এতে তিনি ক্রমেই দুর্বল হতে থাকেন। তাঁর হাত-পা ফুলে যায়। এ সময় তাঁর খাবারে বেশ সাবধানতা অবলম্বন করা হতো। শুধু দুধ খাওয়ানো হতো। তবে তাঁর মাছের প্রতি খুব আসক্তি ছিল। প্রায় মাস খানেক অতিবাহিত হয়ে যায় কিন্তু তাঁর শারীরিক কোনো উন্নতি হয় না। পেটের পীড়া আরো ভয়াবহ হয়ে ওঠে। এতে তিনি ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়তে থাকেন। বিছানাকে সাথী করে দিন পার করতে থাকেন। তবে মৃত্যুর রাতেও সারা রাত গান চলে। শেষ রাতে অবস্থার ক্রমেই অবনতি হতে থাকে। এ সময়কার ইচ্ছায় শিষ্যরা ‘পার কর হে দয়াল চাঁদ আমারে /ম হে অপরাধ আমার ভব কারাগারে’ গান করছিলেন। এরই মধ্যে গানও শেষ হয়। আধ্যাত্বিক জগতের মহাগুরু ও বাউল চিন্তার একক নায়ক লালন ফকির বললেন, আমি চলিলাম। পৃথিবীতে বাউল মতের আলো জ্বেলে তিনি এ শেষ কথাটি বলেই বিদায় নেন। চারদিক নিস্তব্ধ। তখন সূর্য পূর্ব আকাশে লাল হয়ে উঠেছে। ভক্ত-অনুসারীদের মধ্যে কান্নার রোল। দুর-দুরান্ত থেকে বাউলরা খবর পেয়ে ছুটে আসছেন। বেলা গড়ানোর আগেই তাঁর অন্তিম কাজ সম্পন্ন করা হয়। তবে এতে মোল্লা বা পুরোহিত দরকার হয়নি।
গত ১৭ থেকে ২৬ বাংলা ২ ও ৩ কার্তীক ১৪৩৩ দিন ব্যাপী লালন স্মরণোৎসব কুষ্টিয়া জেলার ছেঁউড়িয়ায় লালন একাডেমিতে অনুষ্ঠিত হয়। এই মহাউৎসব একাডেমির আয়োজনে ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সাংস্কৃতিক বিষয়ক মন্ত্রালয়ের সহযোগীতায় পালিত হয়। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন জেলা প্রশাসক মোঃ তৌহিদ বিন হাসান ও পুলিশ সুপার মোঃ আমিনুর ইসলাম, অনুষ্ঠানে দেশ, বিদেশ থেকে আগত হাজার হাজার লালন ভক্তনুরাগীরা অংশ গ্রহণ করেন।
আজীবন সদস্য লালন একাডেমী, ছেঁউড়িয়া কুষ্টিয়া
লেখক, কবি, কলামিষ্ট ও সাংবাদিক
বগুড়া প্রেসক্লাব, বগুড়া।
The post আধ্যাত্বিক জগতের মহাগুরু ফকির লালন শাহ্ appeared first on Dhaka Protidin.
