সৌদি আরবের রিয়াদের বিমানবন্দরে হামলা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতিতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে ঢাকা-রিয়াদ আকাশপথের যোগাযোগ। শনিবার রাত থেকে রবিবার পর্যন্ত রিয়াদগামী ১০টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এতে প্রায় ৪ হাজার যাত্রীর সৌদি আরব যাত্রা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে রিয়াদ থেকে ঢাকায় ফিরতে পারছেন না
প্রায় চার হাজার যাত্রী। সব মিলিয়ে দুই দেশের আকাশপথে আটকে পড়েছেন
হাজার হাজার মানুষ। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকায় এসে বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর ফ্লাইট বাতিলের খবর পেয়ে বিপাকে পড়েছেন প্রবাসী কর্মীরা। কারও সৌদি আরবে কর্মস্থলে ফেরার তাড়া, কারও আবার পরিবারের কাছে ফেরার অপেক্ষা। ফ্লাইট বাতিলের কারণে চাকরি হারানোর আশঙ্কার পাশাপাশি নতুন করে যাতায়াত ও থাকা-খাওয়ার খরচের চাপও তৈরি হয়েছে। কবে আবার যাত্রা শুরু হবে, তা নিয়েও নিশ্চিত কোনো তথ্য পাচ্ছেন না অনেকে।
এদিকে সৌদি আরবের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর আগামী ১২ অক্টোবর ভোর ৩টা পর্যন্ত সব ধরনের ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে বলে জানা গেছে। ফলে ঢাকা থেকে রিয়াদগামী আরও ফ্লাইট বাতিল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে দ্রুত কর্মস্থলে ফিরতে বিকল্প রুটে টিকিট খুঁজছেন প্রবাসীরা। তবে ঢাকা-জেদ্দা ও ঢাকা-মদিনা রুটসহ বিকল্প গন্তব্যের টিকিটের দাম কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় নতুন করে বিপাকে পড়েছেন তারা। বিকল্প পথে যাত্রার ক্ষেত্রেও ফ্লাইট পরিচালনা ও ট্রানজিটের অনিশ্চয়তা রয়েছে।
গতকাল রবিবার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সরেজমিনে দেখা যায়, রিয়াদগামী ফ্লাইটের অপেক্ষায় থাকা যাত্রীরা টিকিট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হাতে নিয়ে বিভিন্ন এয়ারলাইনসের কাউন্টারে খোঁজ নিচ্ছেন। কেউ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ফোনে কথা বলে পরবর্তী করণীয় জানার চেষ্টা করছেন। আবার কেউ টিকিটের তারিখ পরিবর্তন কিংবা বিকল্প ফ্লাইটের ব্যবস্থা করতে এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। কিন্তু অনেকেই জানেন না, কবে সৌদি আরবে ফিরতে পারবেন।
বিমানবন্দরের বহির্গমন টার্মিনালের বাইরে রিয়াদপ্রবাসী আমিনুর রহমান বলেন, ‘রিয়াদে যাওয়ার জন্য বিমানের টিকিট কেটে আগস্টে দেশে এসেছিলাম। রবিবার দুপুরে আমার ফ্লাইট ছিল। এখন হঠাৎ ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় বিপাকে পড়েছি। দেশের বাড়ি কুমিল্লা থেকে ঢাকায় এসে ফ্লাইট ধরার প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। এখন কবে যেতে পারব, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় আছি। সৌদি আরবে আমার কাজ আছে, সময়মতো ফিরতে না পারলে সমস্যায় পড়তে হবে। ফ্লাইটের বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত জানানো হলে আমাদের ভোগান্তি কিছুটা কমত।’
শরীয়তপুরের হামিদুলেরও সৌদি আরব যাওয়ার কথা ছিল। ইন্ডিগো এয়ারলাইনসের টিকিট কেটেছিলেন তিনি। মুম্বাই হয়ে রিয়াদে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও এখন সেই যাত্রা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, ‘ভারতের মুম্বাই হয়ে সৌদি আরবে যাওয়ার কথা। কিন্তু এখন শুনছি, মুম্বাইয়ে যাদের ট্রানজিট, তাদের বোর্ডিং দেওয়া হচ্ছে না, মুম্বাই থেকে নাকি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এখন টিকিট কেটেও যেতে পারব কিনা, সেই নিশ্চয়তা নেই। সরাসরি ফ্লাইট না পেয়ে বিকল্প পথে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলাম। এখন সেই পথও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।’
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এয়ারপোর্ট সিকিউরিটি ম্যানেজার (ফ্লাইট ম্যানেজমেন্ট) স্কোয়াড্রন লিডার সাকিব বলেন, বাতিল হওয়া সাতটি ফ্লাইটে মোট ২ হাজার ৫৩২ জন যাত্রীর রিয়াদে যাওয়ার কথা ছিল। সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসগুলো ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের এ বিষয়ে অবহিত করছে। যাত্রীদের নিজ নিজ এয়ারলাইনসের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরবর্তী যাত্রার বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার অনুরোধ জানানো হচ্ছে। তিনি বলেন, এটি একটি বৈশ্বিক সংকট। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে ধৈর্য ও সহমর্মিতার সঙ্গে অপেক্ষা করার অনুরোধ জানানো হচ্ছে।
এদিকে রিয়াদে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ থাকায় শুধু বাংলাদেশ থেকে যাওয়া যাত্রীরাই নন, দেশে ফিরতে চাওয়া প্রবাসীরাও বিপাকে পড়েছেন। যাদের ছুটি শেষ হয়েছে, তাদের কর্মস্থলে ফেরার তাড়া রয়েছে। আবার যারা দেশে ফেরার পরিকল্পনা করেছিলেন, তাদেরও অপেক্ষা করতে হচ্ছে। দীর্ঘ সময় আটকে থাকলে কর্মস্থলে অনুপস্থিতি, ভিসার মেয়াদ ও অন্যান্য অভিবাসনসংক্রান্ত জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন প্রবাসীরা।
এর আগে শনিবার মধ্যরাতে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। পরিস্থিতি কখন স্বাভাবিক হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন যাত্রীরা। তাদের দাবি, ফ্লাইট পুনরায় চালুর সময়সূচি, টিকিটের তারিখ পরিবর্তন, অর্থ ফেরত এবং বিকল্প ফ্লাইটের বিষয়ে এয়ারলাইনসগুলোর কাছ থেকে দ্রুত ও স্পষ্ট তথ্য দেওয়া হোক। এতে কর্মস্থলে ফিরতে অপেক্ষমাণ প্রবাসীদের ভোগান্তি কিছুটা কমবে।
রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ রাখার সময়সীমা বর্ধিত করায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ঢাকা-রিয়াদ ও রিয়াদ-ঢাকা রুটের ফ্লাইট দুটি স্থগিত করা হয়েছে। স্থগিত এ ফ্লাইট এবং পরিবর্তিত সময়সূচি সম্পর্কে সোমবার জানানো হবে। রবিবার বিকালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছেন। কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ তাদের কার্যক্রম বন্ধ রাখার সময়সীমা ১১ অক্টোবর রাত ৯টা পর্যন্ত, অর্থাৎ বাংলাদেশ সময় ১২ অক্টোবর রাত ৩টা পর্যন্ত বাড়িয়েছে। বিমানবন্দরটি পুনরায় চালুর বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না থাকায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ১১ ও ১২ অক্টোবরের ঢাকা-রিয়াদ ও রিয়াদ-ঢাকা রুটের নির্ধারিত বিজি ৩৩৯ এবং বিজি ৩৪০ ফ্লাইট দুটি স্থগিত করা হয়েছে। সংস্থাটি জানায়, ফ্লাইট এবং পরিবর্তিত সময়সূচি সম্পর্কে সোমবার বাংলাদেশ সময় দুপুর ১২টায় সংশ্লিষ্ট সকলকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হবে।
