দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার এবং শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে দ্বিমুখী উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। একদিকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির অর্থসংস্থান সহজ করতে বিশ্বব্যাংকের কাছে ৩৫ কোটি ডলারের গ্যারান্টি সহায়তা চাওয়া হয়েছে, অন্যদিকে দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে নতুন দুটি কূপ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ৫৯২ কোটি টাকার এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দৈনিক প্রায় ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। উদ্যোগ দুটি কার্যকর হলে জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সামলানো এবং শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিশ্বব্যাংকের কাছে ২৭৭ কোটি ডলারের প্রকল্প অর্থায়ন এবং ১০০ কোটি ডলারের বাজেট সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি প্রস্তাবিত ‘রেজিলিয়েন্স, রিফর্ম অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট পার্টনারশিপ’ (আরআরআইপি) কাঠামোর আওতায় আগামী তিন বছরে নিয়মিত বরাদ্দের বাইরে অতিরিক্ত ১ হাজার কোটি ডলারের অর্থায়ন চাওয়া হয়েছে। এর মধ্যে এলএনজি আমদানির জন্য বিশ্বব্যাংকের সহযোগী সংস্থা আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (আইডিএ) কাছে ৩৫ কোটি ডলারের গ্যারান্টি সহায়তা চেয়েছে সরকার। এ ধরনের গ্যারান্টি ঋণদাতা ও সরবরাহকারীর কাছে অর্থ পরিশোধের ঝুঁকি কমিয়ে আমদানির অর্থায়ন সহজ করতে পারে। তবে এটি সরাসরি নগদ অর্থ পাওয়ার সমান নয়; প্রকৃত সুবিধা নির্ভর করবে গ্যারান্টির শর্ত ও অর্থায়ন কাঠামোর ওপর।
প্রস্তাবিত আরআরআইপি কাঠামোয় ৪০০ কোটি ডলার জ্বালানি তেল, সারসহ জরুরি পণ্য আমদানিতে ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য ১৫০ কোটি, ব্যাংকিং খাতের সংস্কারে ৩০০ কোটি এবং আপৎকালীন সহায়তা ও যৌথ অর্থায়নের জন্য ১৫০ কোটি ডলার রাখার প্রস্তাব রয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা চলছে, তবে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। আগামী ৬০ দিনের মধ্যে কারিগরি দল গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের লক্ষ্য ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে চুক্তি চূড়ান্ত করা।
এদিকে, আমদানিনির্ভরতা কমাতে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তিতাস-৩২ ও তিতাস-৩৩ নামে দুটি অনুসন্ধানমূলক ও উন্নয়ন কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৯২ কোটি টাকা। অনুমোদনের জন্য এটি ২৫ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে পেট্রোবাংলার কোম্পানি বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৯ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল নির্ধারণ করা হয়েছে। মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকারি অর্থায়ন থেকে ৪১৪ কোটি ৪০ লাখ এবং কোম্পানির নিজস্ব তহবিল থেকে ১৭৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। প্রাথমিকভাবে ৬৩২ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হলেও পরে তা ৪০ কোটি টাকা কমানো হয়।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান জানিয়েছেন, কূপ দুটি থেকে দৈনিক প্রায় ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস এবং ১৮ ব্যারেল কনডেনসেট পাওয়ার আশা করা হচ্ছে। প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী, ১০ বছরে প্রায় ১০০ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ও ৬০ হাজার ৪৪৪ ব্যারেল কনডেনসেট উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।
বিজিএফসিএল বর্তমানে পাঁচটি উৎপাদনশীল গ্যাসক্ষেত্র থেকে দৈনিক প্রায় ৪৮০ থেকে ৪৮৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করছে। এর মধ্যে তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের ২৩টি কূপ থেকে দৈনিক প্রায় ৩৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হচ্ছে।
২০১০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে তিতাস ও বাখরাবাদ গ্যাসক্ষেত্রে পরিচালিত ত্রিমাত্রিক ভূকম্পন জরিপের তথ্য বিশ্লেষণের ভিত্তিতে নতুন কূপ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় কূপ খননের পাশাপাশি গ্যাস সংগ্রহের পাইপলাইন স্থাপন এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শক সেবা নেওয়া হবে।
সরকার ২০৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি এবং ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে আরও ১৫০টি কূপ খননের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। তবে নতুন কূপ থেকে প্রত্যাশিত উৎপাদন নিশ্চিত করতে ভূতাত্ত্বিক পরিস্থিতি ও মজুতের পরিমাণ গুরুত্বপূর্ণ।
এলএনজি আমদানির অর্থায়ন সহজ হলে গ্যাস সরবরাহের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্পকারখানার উৎপাদন পরিকল্পনা উন্নত করা সম্ভব হতে পারে। অন্যদিকে, তিতাসের নতুন কূপ থেকে গ্যাস পাওয়া গেলে আমদানির ওপর চাপ কমানো এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হবে।
তবে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য আমদানি অর্থায়নের পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, বিদ্যমান কূপের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণ জরুরি। একই সঙ্গে ঋণের সুদ, পরিশোধের মেয়াদ ও মুদ্রার ঝুঁকি বিবেচনায় রেখে অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
বিশ্বব্যাংকের সম্ভাব্য সহায়তা এবং তিতাসে নতুন কূপ খননের উদ্যোগ সমন্বিতভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের জ্বালানি সরবরাহ, শিল্পোৎপাদন ও বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
