পিঁড়ির উপর আসন পেতে ছোট্ট প্রতিমা। পাশে একগাছি ধান, এক হাঁড়ি খই-নাড়ু, পাঁচটা ফল, আখ আর লক্ষ্মীর পায়ে পদ্ম দিয়ে পুজো করতে এ বছর ঠিক কত খরচ পড়বে? আনন্দবাজার ডট কম কলকাতা-সহ বিভিন্ন জেলার বাজার ঘুরে যে হিসাব করেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে নমো নমো করে পুজো সারতে অন্তত হাজার টাকা পড়বে খরচ। ভোগ দিলে খরচ পড়বে অন্তত তার আড়াই গুণ।
রাত পোহালেই কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো। থলে হাতে শনিবার সকাল থেকে বাজারে বেরিয়ে পড়েছেন অনেকেই। ক্রেতাদের একাংশের অভিযোগ, সেই থলে ভরতে নাভিশ্বাস উঠছে। সবচেয়ে বেশি ছ্যাঁকা দিচ্ছে শসা, নারকেল। কেউ কেউ বলছেন, দু’-একটা ফল, সব্জি ছাড়া বাকি আনাজের দামের খুব একটা হেরফের হয়নি। ক্রেতাদের বেশির ভাগেরই দাবি, যেগুলি লক্ষ্মীপুজোয় লাগে, সেগুলির দামই রাতারাতি বেড়ে গিয়েছে। যা অবস্থা, তাতে খিচুড়ির সঙ্গে পাঁচটা ভাজা, লাবড়া দিয়ে ভোগের থালা সাজানোর পরিকল্পনাও কাটছাঁট করতে হচ্ছে। দুর্গাপুজোয় যে আনাজের দাম ছিল নাগালে, লক্ষ্মীপুজোর আগে তাই মহার্ঘ হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ।
এ বছর প্রতিমা কিনতে গিয়েও ফাঁপরে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। মাটির দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় কাপড়-গয়নায় সাজানো ছোট মূর্তির দাম শুরু হচ্ছে ২০০ টাকা থেকে। হাত পোড়াচ্ছে পদ্ম। দুর্গাপুজোর দিনে কলকাতার বাজারে একটি পদ্মের দাম ছিল ১৫ থেকে ২০ টাকা। লক্ষ্মীপুজোর আগে তার দাম হয়েছে ৫০ টাকা। ছোট গাঁদা-রজনীগন্ধার মালার দাম ২০ টাকা। বড় গাঁদার মালা ৫০ টাকা। বড় গাঁদার মালা কিনে সঙ্গে খুচরো ফুল, পান, আমসড়া কিনতে দিতে হবে অন্তত আরও ৩০ টাকা। লক্ষ্মীর আসনে সাধ করে ধানের ছড়া সাজানোর আগেও ভাবতে হচ্ছে গৃহস্থকে। এক ছড়া ধানের দাম ১৫ টাকা। অন্তত পাঁচ ছড়া না হলে পিঁড়ি ভরে না। পাঁচ ছড়ার দাম পড়ছে প্রায় ৭৫ টাকা। গোড়া-সমেত আখের দাম কলকাতা থেকে জেলা— সর্বত্রই প্রায় ৫০ টাকার আশপাশে। অনেকের বাড়িতেই লক্ষ্মীর প্রতিমা বা ভেলার নৌকোর পাশে এক কাঁদি কলা দেওয়ার রীতি রয়েছে। তার দাম পড়ছে ৬০ থেকে ৮০ টাকার মধ্যে। নারকেল কলকাতার বাজারে ৬০ থেকে ৮০ টাকা। কোনও কোনও জেলায় আকার-আয়তন অনুসারে হেরফের করছে দাম। এক-একটি নারকেলের দাম পড়ছে প্রায় ১০০ টাকা। এক কেজি আখের গুড়ের দামও ৮০ টাকা। চিনির দাম আগেই বেড়ে হয়েছে ৬৫ টাকা। বাজারে একটা নাড়ু কিনতে গেলে দাম পড়ছে ১০ টাকা। বাড়িতে গড়লে তার চেয়ে কিছুটা কম। বাজার থেকে অন্তত ১০টা নাড়ু কিনলে খসবে ১০০ টাকার নোট।
এ বার ফলের বাজারে ঢুকলে প্রথমেই চোখ রাঙাচ্ছে শসা। পুজোর আগে কেজি প্রতি দাম ছিল ৬০ টাকা। এখন তা বেড়ে হয়েছে ৮০ থেকে ১০০ টাকা। কোথাও ১১০ টাকা। লক্ষ্মীর সামনে পাঁচটা গোটা ফল— আপেল, কলা, শসা, মুসম্বি, পেয়ারা সাজাতে খরচ পড়বে অন্তত ৭৫ টাকা। কাটা ফল দিয়ে নৈবেদ্য সাজিয়ে দিতে কম করে খরচ পড়বে আরও ১৫০ টাকা। চিনির দাম বাড়ার পরে মিষ্টির দামও বেড়েছে বেশির ভাগ দোকানে। প্রতি পিস মিষ্টির দাম যেখানে ১০ টাকা ছিল, সেখানে বেড়ে হয়েছে ১২ টাকা। ১০টা মিষ্টি কিনলেই খরচ পড়বে ১২০ টাকা। সঙ্গে ১০০ গ্রামের এক ভাঁড় দই ৩৫ টাকা। বাতাসা, মুড়কি, মঠ, তিলের কদমা— এক-এক প্যাকেট ১৫ থেকে ২০ টাকা হিসাবে খরচ পড়বে ৬০ থেকে ৮০ টাকা। রবিবার কোজাগরী পূর্ণিমার দিনে ন্যূনতম এই উপকরণ জোগাড় করে পুজো সারতে খরচ পড়ছে ১১০০ টাকা। এ গেল একেবারে নমো নমো করে পুজো সারার খরচ। প্রসাদের ভাগ বাড়ির লোক ছাড়া আর কেউ পাবেন না। পুরোহিত ডাকলে বাকি থাকে তাঁর প্রণামী। তা মিলিয়ে অন্তত দেড় হাজার টাকা পড়বে খরচ। খিচুড়ি, পাঁচ রকম ভাজা, লাবড়া, পায়েস দিয়ে ভোগ দিলে খরচ বাড়বে অন্তত আড়াই গুণ। যাঁদের ইলিশ নিবেদনের রীতি রয়েছে, তাঁদের বাড়তি আরও অন্তত গুনতে হবে দেড় থেকে ২০০০ টাকা।
কলকাতা
একশো ছুঁই ছুঁই বেশ কিছু আনাজ। আর যারা তা পারেনি, তারা হাফ সেঞ্চুরি করেছে। একটা কপি কিনতে গেলে দিতে হচ্ছে ৫০ টাকা। বাঁধাকপির কেজিও ততই প্রায়। বেগুন ৮০ টাকা কেজি। পেয়ারা সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছে! বেদানা ডাবল সেঞ্চুরি। কাঁঠালি কলার একটির দাম ৭ টাকা। প্রতিমা ১৫০ টাকার কমে কোথাও নেই।
উত্তর ২৪ পরগনা
শসার কেজি ১০০ টাকা, আদার কেজি ৩০০ টাকা! কুমড়ো ৪০ টাকা, বেগুন ৮০ টাকা, আলু ২০ থেকে ৩০ টাকা, বরবটি ৬০ টাকা, ফুলকপি ৪০ টাকা পিস এবং বাঁধাকপি ৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। কাঁচা হলুদের দামও কম নয়। কেজিপ্রতি ২০০ থেকে ২৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে কাঁচা হলুদ। শুধু সবজি নয়, ফলের বাজারেও চড়া দাম। আপেলের কেজি ২৫০ টাকা, বেদানা ২০০ থেকে ২৫০ টাকা, আখ ৬০ টাকা এবং পানিফল ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এক ডজন কলা কিনতে খরচ হচ্ছে প্রায় ৮০ টাকা। এছাড়া মুসম্বি ১০০ টাকা, কমলা ১৫০ টাকা এবং পেয়ারা ১০০ থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। নাসপাতির কেজিপ্রতি দাম প্রায় ২০০ টাকা। নৈবেদ্য সাজাতে চড়া দাম দিয়েই কিনতে হচ্ছে ফল। অনেকে মাকে ভোগে ইলিশ মাছ দেন। সে মাছ এমনিই দুর্মূল্য। বাজারে মাঝারি ইলিশের দাম ১,৫০০ থেকে ২,০০০ টাকা। ছোট প্রতিমার দাম শুরু হচ্ছে ২৫০ টাকা থেকে।
পূর্ব বর্ধমান
পুজোর প্রাক্কালে বাজারে ফল, সবজি এবং পুজোর সামগ্রী কিনতে ভিড় বাড়ছে। কাঁচামাল ও শ্রমের খরচ বাড়ায় প্রতিমার দাম কিছুটা বেশি হলেও লক্ষ্মী আরাধনার উৎসাহে তার প্রভাব পড়েনি বলেই জানাচ্ছেন বিক্রেতারা। সবচেয়ে বেশি হাত পোড়াচ্ছে শসার দাম। দুর্গাপুজোর সময় থেকেই শসার দাম কেজি প্রতি ৮০ থেকে ১০০ টাকার আশপাশে ঘোরাফেরা করছে। লক্ষ্মীপুজোর সময়ও সেই দাম বিশেষ কমেনি। তবে সব্জির দাম সাধ্যের মধ্যেই বলে দাবি করেছেন বিক্রেতারা।
হুগলি
ছোট ছাঁচের লক্ষ্মী প্রতিমার দাম ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। মাঝারি আকারের প্রতিমা কিনতে গুনতে হচ্ছে প্রায় ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা। শুধু প্রতিমাই নয়, দাম বেড়েছে ফলেরও। পুজোর প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনতে গিয়ে কার্যত হিমশিম খেতে হচ্ছে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলিকে। হুগলির চুঁচুড়ার রবীন্দ্রনগর বাজারে এক ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, প্রতি বছর লক্ষ্মীপুজোর আগে ক্রেতাদের ভিড়ে ঠাসা থাকে বাজার। তবে এ বছর বাজারে ক্রেতাদের ভিড় কিছুটা কম। লক্ষ্মী পুজো মানেই খিচুরি-লাবড়া। সব্জি কিনতে গিয়েও বেগ পেতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বিক্রেতারা। তাঁদের দাবি, বেগুন, পটল, মূলো, ঝিঙে, কপি— সব জিনিসের দাম চড়া। উৎসবের মরশুমে পুজোর বাজেটে কাটছাঁট করতে হচ্ছে বলে জানান ক্রেতারা।
পশ্চিম মেদিনীপুর
পশ্চিম মেদিনীপুরের বাজারেও ‘আগুন দাম’ শসার। প্রতি কেজি প্রায় ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আতা ২০০ টাকা কেজি, বেদানা ২৫০ কেজি, আপেল ১৫০ থেকে ২০০ টাকা কেজি, পেয়ারা ১২০ থেকে ১৫০ টাকা, আঙুর ২০০ টাকা, লাল আঙুর ৪০০ টাকা, রাঙা আলু ১০০ টাকা, শাঁকালু ১৫০ টাকা, পানিফল ১০০ টাকা, কলা ৫০ টাকা ডজন দরে বিক্রি হচ্ছে। একটি আখের দাম ৪০ থেকে ৫০ টাকা। প্রতিটি আনারস বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা পিস। নাড়ু ছাড়া কি লক্ষ্মীর আরাধনা হয়! সেই নাড়ু গড়তে গিয়েই বেগ পেতে হচ্ছে বাঙালিকে। একটি নারকেল বিকোচ্ছে প্রায় ৬০ টাকায়। কম নয় খই, মুড়কি, বাতাসা, নকুলদানা, খেজুর, তিলা— প্যাকেট প্রতি প্রায় ১০ থেকে ২০ টাকা। নারকেল নাড়ু বাজারে কিনতে গেলে একটির দাম পড়ছে ১০ টাকা। ধানের ছড়া ১০ থেকে ২০ টাকা প্রতি পিস। মাটির দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় জরির কাপড়-চুল-গয়নায় সাজানো প্রতিমার দাম শুরু হচ্ছে প্রায় ২০০ টাকা থেকে।
মুর্শিদাবাদ
শসা কিনতে গিয়ে মুর্শিদাবাদের বাজারেও বিপাকে পড়ছেন অনেকেই। সেখানে শসা বিকোচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজিতে। একটি পদ্মফুলের দাম ৫০ টাকা। সবচেয়ে ভাবাচ্ছে নারকেলের দাম। ছোট থেকে বড়— দাম ঘোরাফেরা করছে ৮০ থেকে ১৪০ টাকার মধ্যে। নাড়ুতে নারকেলের সঙ্গে মেশানোর জন্য চিনির দাম আগেই বেড়েছে। এখন এক কেজি চিনির দাম প্রায় ৬৫ টাকা। আখের গুড়ের দামও কেজি প্রতি ৮০ টাকা। ক্রেতারা বলছেন, নাড়ু এখন ‘মহামূল্য’। খিচুড়ির সঙ্গে পাঁচ রকম ভাজা দিতেও ভাবতে হচ্ছে। আলুর দামই যা সাধ্যের মধ্যে। এক কেজি বেগুনের দাম ৮০ টাকা। এক কেজি কাঁকরোল ৬০ টাকা। কুমড়ো ৩০ থেকে ৪০ টাকা কেজি। এক কেজি বাঁধাকপির দামও ৫০ টাকা।
শিলিগুড়ি
ইচ্ছে থাকলেও ব্যাগ ভরে বাজার করার সাধ প্রায় ঘুচেছে বলে অভিযোগ করছেন ক্রেতাদের বড় অংশ। যতটুকু না হলেই নয়, ঠিক ততটাই বাজার করছেন সাধারণ মানুষ। শিলিগুড়ির বিধানমার্কেট থেকে হায়দর পাড়া বাজার বা সুভাষপল্লির বাজার— সব জায়গাতেই একই পরিস্থিতি। দশকর্মের বাজার কোনও মতে হলেও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে সব্জির বাজারে। একটি ফুলকপি বিকোচ্ছে ৬০ থেকে ৮০ টাকায়। কাঁচালঙ্কা কেজি প্রতি ১১০ থেকে ১২০ টাকা। ক্রেতা-বিক্রেতাদের দর কষাকষি চললেও তাতেও খুব একটা লাভ হচ্ছে না। ক্রেতা শ্রেয়সী চক্রবর্তী বলেন, ‘‘সব্জি বাজারে দাম শুনেই থমকে যেতে হচ্ছে। সামান্য ভোগ রান্নার জন্য যে পরিমাণ সব্জির দরকার, তা কিনতেই পকেট হাল্কা হয়ে যাচ্ছে।’’
দেবীর আসনের পাশে যে ধানের শিষ রাখতে হয়, তাতেও এ বার রাশ টানতে হচ্ছে বাঙালিকে। একটি করে ধানের শিষ বিকোচ্ছে ১০ থেকে ১৫ টাকায়। মালা থেকে চাঁদমালা সবের দামই বেড়েছে ১০ থেকে ২০ টাকা। পুজোর ডাব বিকোচ্ছে ৬০ থেকে ৮০ টাকাতেও। বিধান মার্কেটে দশকর্মের দোকান রয়েছে সৌরভ সাহার। তিনি বলেন, ‘‘ক্রেতারা এসে শুধু দাম বৃদ্ধি নিয়ে অভিযোগ করছে। দর কষাকষি করছে। আমাদের পক্ষে যতটা সম্ভব কমিয়ে আনার চেষ্টা করি। কিন্তু সবটা আমাদের হাতেও নেই। আমাদের উপরে নিয়ন্ত্রিত বাজার রয়েছে। জিনিসপত্রের জোগান কম। আক্ষরিক অর্থেই গত বারের তুলনায় এবার দাম অনেকটাই বেশি।’’
