ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম অংশে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় যাতায়াত যেন এক আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছে। চালক ও যাত্রীবেশে সক্রিয় ছিনতাইকারী চক্রের দাপটে তীব্র নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন সাধারণ যাত্রীরা। বিশেষ করে চরম ঝুঁকিতে রয়েছেন নারী যাত্রীরা।
গত এক মাসে মহাসড়কের এই অংশে অন্তত ছয়টি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ও নারী চিকিৎসকসহ একাধিক নারী-পুরুষ ভুক্তভোগী হয়েছেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, চৌদ্দগ্রাম বাজার ও ফেনীর মোহাম্মদ আলী বাজারের সিএনজি স্ট্যান্ড থেকে যাত্রী তুলে নির্জন স্থানে নিয়ে মারধর করে টাকা, মুঠোফোন ও স্বর্ণালংকার ছিনিয়ে নিচ্ছে দুর্বৃত্তরা। কখনো আবার চলন্ত অটোরিকশা থেকেই কেড়ে নেওয়া হচ্ছে নারীদের হাতব্যাগ। ফলে মহাসড়কের এ অংশে যাতায়াতকারী সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রতিনিয়ত উদ্বেগ বাড়ছে।
গত ৭ সেপ্টেম্বর বিকেলে ফেনীর মোহাম্মদ আলী বাজার থেকে চৌদ্দগ্রামের আলকরা ইউনিয়নের পদুয়া রাস্তার মাথায় যাওয়ার জন্য অটোরিকশায় ওঠেন হাছিনা বেগম (৩৮)। অভিযোগ অনুযায়ী, অটোরিকশার চালক ও যাত্রীবেশে থাকা এক দুর্বৃত্ত তাকে নির্জন স্থানে নিয়ে মারধর করে। এ সময় তার কানের দুল, মুঠোফোন ও নগদ টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। পরে চিৎকার শুনে স্থানীয় বাসিন্দারা তাকে উদ্ধার করে চৌদ্দগ্রাম সরকারি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। হাছিনা বেগমের নিকটাত্মীয় সাজেদা আক্তার জানান, খবর পেয়ে তিনি হাসপাতালে গিয়ে তাকে চিকিৎসা করিয়ে বাড়িতে নিয়ে যান।
পরবর্তী ঘটনাটি ঘটে গত ১০ অক্টোবর। আঞ্জুমানারা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ফাহিমা আক্তার জগন্নাথদিঘী এলাকার কর্মস্থলে যাওয়ার জন্য পদুয়া রাস্তার মাথা থেকে অটোরিকশায় ওঠেন। কিন্তু তাকে বিদ্যালয়ের সামনে না নামিয়ে মারধর করে মুঠোফোন ও স্বর্ণালংকার ছিনিয়ে নেওয়া হয়। পরে তাকে চিওড়া এলাকায় ফেলে রেখে চলে যায় দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় স্থানীয়ভাবে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
এর কয়েক দিন পরই, গত ১৮ অক্টোবর দুপুরে মহাসড়কের নবগ্রাম এলাকায় কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফেরার পথে ছিনতাইয়ের শিকার হন নারী চিকিৎসক জিনিয়া জামান। অটোরিকশায় থাকা দুর্বৃত্তরা তার মুঠোফোন ও ভ্যানিটি ব্যাগ ছিনিয়ে নেয়। এ সময় হামলাকারীদের ধাক্কা ও টানাটানিতে তিনি গুরুতর আহত হন।
শুধু নারী নন, ছিনতাইকারী চক্রের হিংস্র থাবা থেকে বাদ পড়ছেন না পুরুষ যাত্রীরাও। গত ৮ সেপ্টেম্বর রাতে চৌদ্দগ্রামের চিওড়া রাস্তার মাথা থেকে অটোরিকশায় বাড়ি ফিরছিলেন ব্যবসায়ী আবদুল আলিম ফরায়েজী। চালকসহ অটোরিকশায় থাকা দুর্বৃত্তরা তাঁকে কুপিয়ে আহত করে নগদ টাকা ছিনিয়ে নেয় এবং চলন্ত গাড়ি থেকে ফেলে পালিয়ে যায়।
গত ১৯ সেপ্টেম্বর বিকেলে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড থেকে একটি মাইক্রোবাসে ওঠেন মুরাদনগর থানার সুমন্ডা গ্রামের মো. আলাউদ্দিন। তাঁর অভিযোগ, মাইক্রোবাসে থাকা চক্রটি তাকে মারধর করে সর্বস্ব লুটে নেয়। পরে রাত আনুমানিক ১০টার দিকে চৌদ্দগ্রামের জগন্নাথদিঘী ইউনিয়নের কাঠাল গাছতলা এলাকায় তাঁকে ফেলে রেখে যায়।
এর আগে গত ২৭ সেপ্টেম্বর রাত ১১টার দিকে চৌদ্দগ্রাম বাজারসংলগ্ন আজমির হোটেলের মালিক নজির আহম্মদের পরিবারের সদস্যরা আত্মীয়ের বাড়ি থেকে দাওয়াত খেয়ে ফেরার পথে ছিনতাইয়ের শিকার হন। মহাসড়কের পাশ দিয়ে হাঁটার সময় একটি অটোরিকশায় থাকা চক্র নজির আহম্মদের ছেলের বউয়ের হাতব্যাগ টান মেরে নিয়ে যায়। ব্যাগটিতে তিনটি স্বর্ণের আংটি ও নগদ টাকা ছিল বলে জানান তিনি।
এ ছাড়া গত ১০ এপ্রিল রাত ২টার দিকে ঢাকা থেকে চৌদ্দগ্রাম বাজারে নেমে বাড়ি যাওয়ার পথে বিসিক এলাকার সামনে ছিনতাইয়ের শিকার হন মিজানুর রহমান নামে এক ব্যক্তি। চারজন দুর্বৃত্ত তাকে মারধর করে মুঠোফোন ও টাকা ছিনিয়ে নেয়। এ ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ করেও এখন পর্যন্ত ছিনতাইকারীদের শনাক্ত বা মালামাল উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি বলে দাবি তাঁর।
ছিনতাইয়ের শিকার একাধিক ব্যক্তি ও স্থানীয়দের অভিযোগ, মহাসড়কে নিয়মিত চলাচলকারী কিছু সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক সরাসরি এ চক্রের সঙ্গে জড়িত। পাশাপাশি চৌদ্দগ্রাম বাজারের স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্রও তাদের পেছনে মদদ দিচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক সিএনজি চালক জানান, চৌদ্দগ্রাম বাজারের পুরোনো ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের সামনের সিএনজি স্ট্যান্ডে প্রায়ই এই ছিনতাইকারী চক্রের সদস্যদের আড্ডা দিতে দেখা যায়।
তবে এসব সুনির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অভিযুক্তদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সার্বিক বিষয়ে চৌদ্দগ্রাম থানার ওসি মোহাম্মদ আরিফ হোসাইন দৈনিক রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, মহাসড়কে ছিনতাই ও ডাকাতি প্রতিরোধে থানা-পুলিশের নিয়মিত টহল জোরদার রয়েছে। ছিনতাইয়ের ঘটনায় কেউ সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দিলে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছি।
তবে পুলিশের টহল সত্ত্বেও একের পর এক ছিনতাইয়ের ঘটনায় মহাসড়কের এই অংশে যাত্রীদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে নারী যাত্রীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে সন্দেহজনক যানবাহন শনাক্তকরণ, অটোরিকশা স্ট্যান্ডগুলোতে নজরদারি বাড়ানো এবং দ্রুত জড়িতদের গ্রেপ্তারের জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
