যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধের সমঝোতার পরও ইউক্রেনে অন্তত ছয়টি জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। সোমবার দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এ তথ্য জানিয়ে বলেছেন, এতে স্পষ্ট হয়েছে যে মস্কো জ্বালানি খাতে যুদ্ধবিরতিতে আগ্রহী নয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জেলেনস্কি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত জ্বালানি যুদ্ধবিরতি মেনে নিতে রাশিয়া অনিচ্ছুক। দেশটি ইউক্রেনের জনগণ ও জনবসতিতে বিমান হামলা চালিয়ে যেতে চায়। তাঁর অভিযোগ, যুদ্ধ পরিচালনায় বাড়তি আয় করার সুযোগ দেখলেই রাশিয়া হামলা অব্যাহত রাখে।
এর আগে পোল্যান্ডে একটি সম্মেলনে ভিডিও সংযোগে বক্তব্য দেওয়ার সময় জেলেনস্কি রাশিয়ার হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত দুটি স্থাপনার কথা উল্লেখ করেন। এর মধ্যে একটি গ্যাস স্থাপনা এবং অন্যটি একটি পেট্রল স্টেশন। দুটিতেই রুশ ড্রোন দিয়ে হামলা চালানো হয় বলে জানান তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির উচ্চমূল্য নিয়ে চাপে থাকা ট্রাম্প সপ্তাহান্তে ঘোষণা দেন, ইউক্রেন ও রাশিয়া পরস্পরের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা না চালাতে সম্মত হয়েছে। তবে দুই যুদ্ধরত পক্ষের কেউই সমঝোতার বিষয়টি নিশ্চিত করেনি। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো ট্রাম্প এমন যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিলেন, যার বিষয়ে দুই পক্ষের আনুষ্ঠানিক সম্মতি পাওয়া যায়নি।
এর কয়েক দিন আগে রাশিয়া থেকে ডিজেল কেনার একটি চুক্তির কথা জানান ট্রাম্প। জেলেনস্কি এ পদক্ষেপের সমালোচনা করে বলেন, এটি রাশিয়ার অর্থনীতি বিচ্ছিন্ন রাখতে পশ্চিমা দেশগুলোর দীর্ঘদিনের নীতির বিপরীত। ট্রাম্প এর আগে ইউক্রেনে নির্বাচন আয়োজন করে জেলেনস্কিকে ক্ষমতাচ্যুত করার আহ্বানও জানিয়েছেন। ২০২৫ সালে ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার পর থেকেই দুই নেতার সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে।
সোমবার ইউক্রেনের ইউরোপীয় মিত্ররা সম্ভাব্য জ্বালানি যুদ্ধবিরতি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে কিয়েভের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। একই দিনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা রাশিয়ার বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা অনুমোদন করেন। এতে নিষেধাজ্ঞার তালিকায় আরও ১ হাজার ৫৬৯ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম যুক্ত হয়েছে। ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর এটিকে একক বৃহত্তম নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
যুদ্ধবিরতি নয়, দীর্ঘমেয়াদি শান্তি চায় মস্কো
ইউক্রেন সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দূরপাল্লার হামলার মাধ্যমে রাশিয়ার তেল শোধনাগার ও জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থাকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। দেশটির দাবি, ইউক্রেনের শহরগুলোতে রাশিয়ার ধারাবাহিক হামলার জবাবেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে শীতকালে বিদ্যুৎ ও তাপ সরবরাহব্যবস্থা অচল করে দেওয়ার চেষ্টা করছে মস্কো বলে অভিযোগ কিয়েভের।
জেলেনস্কি বলেছেন, সোমবার ভোররাতে ইউক্রেন রাশিয়ার কোনো তেল শোধনাগারে হামলা চালায়নি। রাশিয়াও একই শর্ত মেনে চললে কিয়েভ জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধ রাখতে প্রস্তুত। এ ছাড়া মস্কো ৬০ দিনের পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলে ইউক্রেনে নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব বলেও মন্তব্য করেন তিনি। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে দেশটিতে নির্বাচন স্থগিত রয়েছে।
রাশিয়ার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। এ বিষয়ে পরে বিস্তারিত জানানো হবে বলে জানিয়েছেন ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ। তবে জেলেনস্কির প্রস্তাবিত ৬০ দিনের পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন তিনি।
পেসকভ বলেন, প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনসহ ক্রেমলিনের কর্মকর্তারা বারবার জানিয়েছেন, তাঁরা যুদ্ধবিরতি চান না; বরং দীর্ঘমেয়াদি শান্তি চান এবং তা অর্জনে সম্ভাব্য সবকিছু করতে প্রস্তুত।
খারকিভে ধ্বংসস্তূপের নিচে মরদেহ
ইউক্রেনের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর খারকিভে রুশ হামলার পর ধ্বংসস্তূপের মধ্যে উদ্ধার অভিযান চালান কর্মীরা। রাতের হামলায় সেখানে অন্তত তিনজন নিহত হন। পরে সোমবার সকালে আবাসিক ভবনে আবারও হামলা হয়। এতে অন্তত ২২ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে নগর কর্তৃপক্ষ। এর আগে রোববার পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর ইভানো-ফ্রাঙ্কিভস্কে আরও অন্তত তিনজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়।
খারকিভের বাসিন্দা নাতালিয়া মিনকা জানান, ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার ঠিক আগে তিনি সন্তানকে নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছেছিলেন। তাঁর ও তাঁর সন্তানের ধারণা, কাছের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। জ্বালানি স্থাপনায় হামলা না চালানোর প্রতিশ্রুতির মাত্র ১০ মিনিট পরই হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করেন তিনি।
গত দুই সপ্তাহ ধরে ইউক্রেনের বিদ্যুৎ অবকাঠামোয় নতুন করে হামলা চালাচ্ছে রাশিয়া। এতে রাজধানী কিয়েভে প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা করে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকছে। পানি ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ ছাড়া দুই দফায় শহরের পাতালরেল চলাচল হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়।
জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জ বলেছেন, মস্কো কেবল চাপের মুখেই গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করবে। তাই রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা হচ্ছে। ইউক্রেনের বেসামরিক জ্বালানি অবকাঠামোয় রাশিয়ার নির্মম হামলার পর নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে ট্রাম্প বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির জন্য রাশিয়ার তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলাকে ক্রমেই দায়ী করছেন। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান শুরুর পর দেশটিতে ডিজেলের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। শনিবার ট্রাম্প জেলেনস্কিকে রাশিয়ার তেল শোধনাগারে হামলা বন্ধ করার কড়া বার্তা দেন।
পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ বন্ধ এবং অস্ত্রের জোগান বন্ধ করার হুমকি দিয়েছে। ওয়াশিংটন বর্তমানে সরাসরি কিয়েভকে অস্ত্র না দিলেও ইউরোপীয় দেশগুলোকে ইউক্রেনের জন্য অস্ত্র কেনার সুযোগ দিচ্ছে।
সূত্র: রয়টার্স
এমএস/
