Published on
:
4 min read
সুমন প্রতিহার
যজুর্বেদে একটা গল্প আছে। দেবতাদের ভাগের পুজো পৌঁছে দিয়ে ক্লান্ত অগ্নিদেব এক বার জলের তলায় লুকোলেন। অগ্নিদেবের উপস্থিতিতে মাছেদের সমস্যা বাড়তে, তারা জটলা পাকিয়ে দিলো খবর ফাঁস করে। বেজায় বিরক্ত অগ্নি, রেগে মাছেদের অভিশাপ দিলেন, এর পর খুশিমাফিক মানুষ মাছেদের খাবে। মাছেদের সর্বনাশ লগ্নে বাঙালিদের পৌষের সেই যে শুরু, শেষ আর হয় না।
একাদশ শতকে, মাছে কিছু বিধিনিষেধ এলেও বাঙালিরা বিশেষ পাত্তা দেয়নি। চর্যাপদ কর্তারা বৌদ্ধ সহজিয়া সাধক, বাংলার মাছের আকর্ষণে বাঁধা তাঁরাও। বোয়াল-প্রিয় বাঙালি কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়, মাছের বুক থেকে পাথর ঝরতে দেখেছেন। মাছ-প্রিয় বাঙালি ব্রাহ্মণ বঙ্কিমবাবু, লোভের রূপক হিসেবে এনেছেন মাছ। বাঙালির মাছ শুধু আহারে নয়, জীবনের বাহারেও। শুধু কি মাছ, চাঁদ সদাগর-পুত্র লখিন্দরের বিয়ের মেনুতে চমক, তেজপাতা ধনে দারচিনি দিয়ে বুড়ো খাসির চর্বি ভাজা। ভারতীয়দের আমিষ খাবারের প্রাচীনতম রেফারেন্স বেদ। কালিদাস ‘অভিজ্ঞানশকুন্তলম’-এ লিখেছেন, রাজা দুষ্মন্ত ও তাঁর ব্রাহ্মণ সহচর মাধব্যের শিকারের কাহিনি। মাধব্য রাজাকে অভিযোগ করছেন, হরিণের পোড়া মাংস খেয়ে তার দাঁত ও চোয়ালে ব্যথা। বৈদিক সাহিত্যেই রয়েছে মধু ঢালা যবের পিঠের কথা। জিভের প্রতিটি স্বাদ কোরকের নিখুঁত ব্যবহারের নীরব প্রয়োগে ভারতীয়রাই চ্যাম্পিয়ন।
আসা যাক বাঙালির কথায়। বুদ্ধদেব বসু লিখছেন, কলকাতার বিবর্ণ সকালে ইলিশ ভাজার সুবাস, সরস সর্ষের ঝাঁঝ। বাংলায় বিশুদ্ধ নিরামিষাশী প্রতি একশোয় মাত্র দু’জন। ঋকবেদে ঘোড়ার মাংস খাওয়ার জমকালো উল্লেখ আছে। যজ্ঞের ঘোড়া কেটে হালকা আঁচে চর্বি আলাদা করে, ছোট পিস খাওয়া হতো। ঘোড়ার নীচের চোয়াল, জিভ আর সামনের পা পুরোহিতদের। ঘোড়া ছাড়া ষাঁড়ের মাংসের কদর ছিল। খাদকের তালিকায় অগ্নি, ইন্দ্র, সব্বাই। শুক্ল যজুর্বেদে আচার রীতি ব্যাখ্যার গদ্যগ্রন্থ ‘শতপথ ব্রাহ্মণ’। ওই গ্রন্থে পৃথিবীর ধারক গরু এবং ষাঁড়ের মাংসে খানিক নিষেধ থাকলেও, ঋষি যাজ্ঞবল্ক্য বলছেন, নরম ও পুষ্টিকর হলে তিনি ওই মাংস খাবেন। অতিথিকে রসেবশে রাখতে বৃষ ও গোয়ালের সেরা গরুটির মাংস খাওয়ার রেওয়াজ ছিল। বৈদিক যজ্ঞে ছাগ-মাংসের ব্যবহার স্পষ্ট।
পশ্চিমি কেতায় অভ্যস্ত বাঙালি কবি মধুসূদন দত্তের মটন স্টু প্রীতি সর্বজনবিদিত। ইলিশ মাছ, ঝাল ঝাল পাঁঠার মাংস স্বামীজি যে শুধু খেতেন তেমনটা নয়, রাঁধতেনও। তবে বৈদিক যুগে মাংস খাওয়া হতো নির্দিষ্ট যজ্ঞে, ভূরিভোজ তো নয়ই, পুরোহিত ছাড়া সবাই পেত দু’এক টুকরোই। মনুসংহিতায় এসে কানুন বেশ কঠিন। মনু লিখছেন, ইহলোকে মানুষ যে প্রাণীর মাংস খায়, পরলোকে তারাই মানুষের মাংস খাবে। মাছ খাওয়ার অর্থই মাংস খাওয়া। যজ্ঞ ছাড়া মাংস খাওয়া দণ্ডনীয় অপরাধ। সুরটা হুমকির। ‘সুশ্রুত সংহিতা’য়, টোকো মাংস থেকে মাংস সুসিদ্ধ করে মিহি করে মেখে ঘি গুড় আদা দিয়ে রান্নার অভিনব উল্লেখ। ‘চরক সংহিতা’য়, বাতের চিকিৎসায় কুমির, অর্শে শেয়াল, শ্বাসকষ্টে সজারুর মাংসের নিদান। ছয় মাসের গর্ভবতীদের মাংসের ঝোলের বন্দোবস্ত। সে সব জেনেশুনেই হয়তো সুকুমার রায় মজিয়ে লিখলেন, সর্দিতে কুমির মাংসের ক্কাথ, আর হাঁপানিতে সজারু কাঁটার ঝোল খাওয়ার কথা।
মহাবীর ও গৌতম বুদ্ধ আমিষ আহারে হানলেন জোরালো ধাক্কা। জৈনরা বীজযুক্ত ফল খেতেও বারণ করলেন। মহাযানী বৌদ্ধ ধর্মে বিশ্বাসীদের, মাংসে জোরালো নিষেধ। শঙ্করাচার্য, মাধবাচার্য আর রামানুজ, তিনজনের প্রবল আমিষ-বিরোধিতায় মাংস খাওয়া কমলো। তবে সেন যুগের শেষ থেকেই বাংলার নিম্নবর্গের প্রান্তীয় মানুষজন ত্রিমূর্তির ফরমান উড়িয়ে দিয়েছিল।
এল মুঘলেরা, কাঠকয়লার আগুনে ঢিমে আঁচে বাবর ঝলসে খাচ্ছেন মাংস। আকবর খেতেন কম, অওরঙ্গজ়েব জীবনের অনেকটা সময় জুড়ে নিরামিষাশী। বাংলায় ষোলো শতাব্দী থেকে চৈতন্য মহাপ্রভুর ‘সাত্ত্বিক আহার’-এর বৈষ্ণব ধারা শুরু হয়। ও দিকে মীরার এক ভজনে গাওয়া হলো, শুধু ফলমূল খেয়ে হরি পেলে বাঁদর ও বাদুড়ও তাঁকে পেত, ঘাস খেয়ে হরি লাভ হলে, ছাগল আর হরিণও হরিকে পেত।
অথচ মীরা কঠোর নিরামিষাশী। চৈতন্যদেব হলুদ ও ঘিয়ে ভাজা লাল শালি ধানের ভাত, মুগ ডাল, কলার মোচা, পটল, কুমড়ো বড়ি দিয়ে শুক্তো, নিম মাখানো পটল ভাজা, বেগুন ভাজা খেতেন তারিয়ে। বৈদিক সাহিত্যে ব্রীহি, শ্যামা, নীবার ধানের উল্লেখ আছে। নীবার ধান তো আবার চাষ করতে হয় না, প্রাকৃতিক। ইন্দ্র, মিত্র, বরুণের মতো বৈদিক দেবতারা তিন ধানের চাল খেতেন। ভগবান রুদ্রর ধান, যব, ডাল মিশিয়ে খিচুড়ি পছন্দ। যবের ছাতু দই মিশিয়ে খাওয়ার রেওয়াজ ছিল, উল্লেখ আছে ছাতুর ইডলি ‘পুরোডাশ’-এর।
মোহিতলাল মজুমদারের কাব্যে আবেগ জোরালো, তবে কবি নিষ্ঠাবান নিরামিষাশী। ও দিকে শান্তিনিকেতনে সাহিত্যিক লীলা মজুমদার মোচার ঘন্ট, শুক্তো, পাঁচফোড়ন সহযোগে চমৎকার সব সব্জি রাঁধতেন। বিদেশি সব ডাল ছিল মূলত গরিবদের খাবার। আমিষের বিকল্প হিসেবে নিরামিষ ডালের একটি পৌরাণিক গল্প রয়েছে। দয়ালু রাজা রন্তিদেবের যজ্ঞে মাংস শেষ হয়ে যাওয়ায়, উনি অড়হড়ের ঘন ডাল মশলা দিয়ে রেঁধে অতিথিদের পরিবেশন করেন।
‘আমিষ’ শব্দের সাদামাটা অর্থ মাংস হলেও সময়ের সঙ্গে শব্দের ব্যাপ্তি ঘটেছে। বাঙালি পেঁয়াজ রসুন ছাড়া নিরামিষ মাংস রেঁধেছে। আমিষ ও নিরামিষের একটা শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যাও আছে। বনবাসে রামের হরিণ শিকারের ব্যাখ্যায় রামায়ণ বলছে, খাদ্যর ভোগ্য ভাব ত্যাগই আমিষ ত্যাগ। খাদকের ভাবই নাকি অন্তরালে খাদ্যের প্রভাব বিচার করে। সংযমহীন, অনিয়ন্ত্রিত সব ভোজনই আমিষ। শাস্ত্রীয় ভাব ব্যাখ্যায়, অভুক্তকে পাশে রেখে তরকারি সহযোগে এক দিস্তা লুচিও আমিষ আহার। ‘শাকাহারী’ ও ‘মাসাহারী’ শব্দ দু’টির যথার্থ বাংলা ‘নিরামিষ’ ও ‘আমিষ’ নয়।
সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ‘ভারতবাসীর আহার’ প্রবন্ধে লিখছেন, বৈদিক যুগে আর্যদের ব্যাপক আমিষ খাওয়ার কথা। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রেও মাংসে নানা মশলার উল্লেখ ছিল। পরশুরাম ওরফে রাজশেখর বসু, ‘আমিষ নিরামিষ’ প্রবন্ধে, অঘোর দত্তের মুখে আমিষ নিরামিষের তুল্যমূল্য বিচার করেছেন। বিবেকানন্দ একবার সে কালের নিষিদ্ধ মাংস খেয়ে রামকৃষ্ণের কাছে পৌঁছলে, উনি বলেন, তোর প্রাণে যা চায় তাই খাবি। ঈশ্বরের কিছু আসে যায় না। অন্য দিকে মা সারদার আশকারা, আমিষ খাবে, খুব খাবে, সব কিছু খাবে ফুর্তি করে, আমি বলছি খাবে, বাকিটা আমি দেখব। যে জাতির এমন মা, তার আমিষ ভোজন আটকায় কে!
লেখক কেশপুর কলেজে শিক্ষক
