রাষ্ট্রের শক্তি কেবল তার প্রশাসনিক কর্তৃত্বে নয়, প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সমান অধিকার নিশ্চিত করার সক্ষমতায়। ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কোনো মানুষ যেন নিজেকে সংখ্যালঘু, অনিরাপদ কিংবা রাষ্ট্রের কাছে কম গুরুত্বপূর্ণ মনে না করেন- একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সাফল্যের অন্যতম প্রধান মাপকাঠি এটি। শারদীয় দুর্গোৎসবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঢাকার বাইরে রংপুর, রাজশাহী ও চট্টগ্রামের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় এ বিবেচনায় তাৎপর্যপূর্ণ। তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো সরকারপ্রধান দুর্গাপূজা চলাকালে ঢাকার বাইরে গিয়ে পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেছেন। এই ব্যতিক্রমী পদক্ষেপের গুরুত্ব তাই আনুষ্ঠানিক সৌজন্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে রাষ্ট্রীয় অন্তর্ভুক্তি ও নাগরিক সমতার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে।
রংপুরের ঐতিহ্যবাহী রাধাগোবিন্দ ধর্মসভা মন্দিরে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী পুণ্যার্থীদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেছেন এবং মন্দির কর্তৃপক্ষের হাতে ১০ লাখ টাকার অনুদানের চেক তুলে দিয়েছেন। তারাগঞ্জের চৌপথি ও পাগলাপীরে পথসভায় তিনি ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিকের সমান অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করার কথা বলেছেন। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর- ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার। রাজশাহী ও চট্টগ্রামেও পূজামণ্ডপ পরিদর্শন এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে মতবিনিময়ের কর্মসূচি ছিল। চট্টগ্রামে তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, রাষ্ট্র একজন মুসলমানকে যে অধিকার দেবে, একজন হিন্দুকেও সেই অধিকার দিতে হবে। এই বক্তব্যের তাৎপর্য রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে নাগরিক পরিচয়কে প্রতিষ্ঠা করার মধ্যেই নিহিত।
বাংলাদেশের ইতিহাসও এই সমতার শিক্ষা দেয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে মানুষ স্বাধীনতার জন্য লড়েছেন। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানেও বিভিন্ন ধর্ম, শ্রেণি ও পেশার মানুষের অংশগ্রহণ ছিল। সংকট ও সংগ্রামের সময় মানুষকে একত্র করেছে অভিন্ন অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদার আকাঙ্ক্ষা। স্বাধীনতার এত বছর পরও সেই আকাঙ্ক্ষাকে দৈনন্দিন রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। ধর্মীয় সম্প্রীতি কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের প্রতি অনুগ্রহ নয়; এটি সংবিধানসম্মত নাগরিক অধিকারের স্বাভাবিক প্রকাশ।
তবে নেতৃত্বের প্রতীকী পদক্ষেপকে স্থায়ী আস্থায় রূপ দিতে হলে ঘোষণার সঙ্গে বাস্তবতার মিল থাকতে হবে। পূজামণ্ডপে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে স্বীকৃতি ও নিরাপত্তার অনুভূতি জাগাতে পারে। কিন্তু সেই আশ্বাসের স্থায়িত্ব নির্ভর করবে উপাসনালয়ের নিরাপত্তা, ধর্মীয় বিদ্বেষ ও গুজব প্রতিরোধ, হামলার অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, অপরাধীদের বিচার এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সুরক্ষার ওপর। উৎসবের সময় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করাই যথেষ্ট নয়; সারা বছরই প্রত্যেক নাগরিকের জীবন, সম্পত্তি ও ধর্ম পালনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।
এ জন্য সরকারের কয়েকটি বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, ধর্মীয় উপাসনালয় ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ঝুঁকি নিরূপণ করে কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। দ্বিতীয়ত, সাম্প্রদায়িক সহিংসতার অভিযোগ তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান অগ্রগতি নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, প্রশাসনিক সেবা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সম্পত্তির অধিকার রক্ষায় বৈষম্যহীনতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। চতুর্থত, ধর্মীয় উত্তেজনা ছড়ানো গুজব মোকাবিলায় দ্রুত তথ্য যাচাই, দায়িত্বশীল প্রচার এবং সব সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে সংলাপ জোরদার করতে হবে। এসব উদ্যোগের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা ও জনসমক্ষে প্রকাশ করা হলে জবাবদিহিও বাড়বে।
প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনে কে তাঁকে ভোট দিয়েছেন আর কে দেননি, তা বিবেচনা না করে সবার জন্য কাজ করার অঙ্গীকারও করেছেন। এই অঙ্গীকারের বাস্তব প্রতিফলনই হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনের প্রকৃত পরীক্ষা। রংপুর, রাজশাহী ও চট্টগ্রামের পূজামণ্ডপে তাঁর পদচারণা ইতিহাসে স্মরণীয় হতে পারে; কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হবে এই সফরের বার্তা রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে পৌঁছানো। রাষ্ট্রের পরিচয় সংখ্যাগরিষ্ঠের আধিপত্যে নয়, সব নাগরিকের সমান মর্যাদায়। ধর্মীয় সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়তে হলে শুভেচ্ছার ভাষাকে নীতিতে, নীতিকে কার্যক্রমে এবং কার্যক্রমকে নাগরিকের নিরাপদ জীবনে রূপ দিতে হবে।
সানা/আপ্র/২২/১০/২০২৬
