আমার ছেলে ও মেয়ে জেন–জি প্রজন্মের। ওদের সঙ্গে কথা বললে বুঝতে পারি, আমার বয়সীদের সঙ্গে ভাবনার পার্থক্য কতটা। জীবনের লক্ষ্য, কাজের ধরন, সৃজনশীলতা, এমনকি সফলতার সংজ্ঞাও ওদের কাছে অন্য রকম।
আমাদের প্রজন্মের অনেকের কাছে নিজের একটি বাসা মানেই জীবনের বড় অর্জন এবং নিরাপত্তা, স্থায়িত্ব আর আবেগের একটি ঠিকানা। কিন্তু ওদের দেখি, এই বিষয়টিও একটু অন্যভাবে ভাবে। কোথায় পড়বে, কোথায় কাজ করবে, কেমন জীবন চায়—সেই হিসাবের মধ্যে নিজের বাসার জায়গা কোথায়, সেটিও বুঝতে চায়।
আমার মনে প্রশ্ন জাগে, আজকের জেন–জি আর আগামী দিনের জেন–আলফা যখন আবাসনের মূল সিদ্ধান্তগুলো নেবে, তখন তারা কেমন বাসা চাইবে? আমরা আজ যে ধরনের অ্যাপার্টমেন্ট বানাচ্ছি, সেগুলো কি তাদের চাহিদা পূরণ করতে পারবে? যদি আরও সহজ করে বলি, আজ থেকে ১০, ২০ কিংবা ৩০ বছর পর বাংলাদেশের মানুষের কেমন আবাসন লাগবে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে মনে হয়, জমির আগে মানুষকে নিয়ে ভাবতে হবে। এফএআর, ফ্ল্যাটের আকার কিংবা নির্মাণের ব্যয়ের আগে বুঝতে হবে, সেখানে কারা থাকবে। তাদের জীবন কেমন, সামর্থ্য কতটুকু আর সময়ের সঙ্গে তাদের চাহিদা কীভাবে বদলাবে।
তরুণ জনগোষ্ঠী, বদলে যাওয়া চাহিদা
বাংলাদেশের জনসংখ্যার ‘মধ্যমা বয়স’ প্রায় ২৬ বছর। অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক মানুষের বয়স এর নিচে। আবাসন খাতের জন্য এই তথ্যের তাৎপর্য অনেক বেশি। কারণ, এই জনসংখ্যার একটি বড় অংশের পড়াশোনা, কর্মজীবন, সংসার আর নিজের ঠিকানা গড়ার অধ্যায়গুলো এখনো সামনে।
আজ যে তরুণ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন, কয়েক বছর পর তিনি চাকরি বা ব্যবসা শুরু করবেন। হয়তো বিয়ে করবেন, সন্তান হবে। কাজের প্রয়োজনে শহর বদলাবেন, অনেকেই উচ্চশিক্ষা শেষে দেশেও ফিরবেন। একসময় তাঁর সন্তানেরা বড় হয়ে আলাদা থাকবে। তারপর সেই মানুষটিই প্রবীণ হবে।
এই পুরো যাত্রায় তাঁর বাসস্থানের চাহিদা কি একই থাকবে? ২০ বছর বয়সের একজন শিক্ষার্থীর জন্য ক্যাম্পাসের কাছে নিরাপদ ও সাশ্রয়ী একটি আবাসনই যথেষ্ট হতে পারে। সেটি ছোট স্টুডিও কিংবা অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে থাকার ব্যবস্থা হতে পারে। ২৫ বছর বয়সে কর্মজীবন শুরু করলে তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে অফিসের দূরত্ব, যাতায়াতের সময় আর মাস শেষে কত টাকা হাতে থাকে। বড় ফ্ল্যাটের চেয়ে সুবিধাজনক জায়গায় ছোট একটি বাসাই তখন বেশি কার্যকর।
৩০ বা ৩৫–এ সংসার আর সন্তান এলে হিসাব বদলাবে। তখন স্কুল, খেলার জায়গা, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা আর প্রতিবেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। আবার ৬০ বা ৭০–এ এসে সেই মানুষটিই হয়তো চাইবেন ছোট একটি বাসা। যেখানে সিঁড়ি নিয়ে ভাবতে হবে না, বাথরুমে চলাফেরা নিরাপদ হবে, কাছেই চিকিৎসা পাওয়া যাবে। আর প্রয়োজনে পাশে কাউকে পাওয়া যাবে।
মানুষটি একই। কিন্তু জীবনের একেক পর্যায়ে তাঁর প্রয়োজন একেক রকম। জীবন পর্যায়ভিত্তিক আবাসনের ভাবনাটি এখানেই।
জমি দেখে ফ্ল্যাট, নাকি মানুষ বুঝে আবাসন
আমাদের আবাসন ব্যবসার প্রচলিত প্রক্রিয়ায় জমিই সাধারণত প্রথম বিবেচনা। জমি পাওয়া গেল, কতটুকু নির্মাণ করা যাবে তা হিসাব হলো, ফ্ল্যাটের আকার ঠিক হলো। এরপর আমরা সেই ফ্ল্যাটের উপযোগী ক্রেতা খুঁজতে শুরু করি। এই প্রক্রিয়ায় মানুষের চাহিদা বিবেচিত হয় নিশ্চয়ই। কিন্তু ভবিষ্যতের জন্য সেটিকে আরও সামনে আনা দরকার।
একটি এলাকায় প্রকল্প নেওয়ার আগে আমাদের জানতে হবে, সেখানে কারা থাকতে চান। তাঁরা শিক্ষার্থী, তরুণ পেশাজীবী, ছোট পরিবার, নাকি অবসরে যাওয়া দম্পতি? তাঁদের আয় কত? কেনার সামর্থ্য আছে, নাকি আপাতত ভাড়াই তাঁদের জন্য বাস্তবসম্মত? কর্মস্থলে যেতে প্রতিদিন কত সময় ব্যয় করতে হচ্ছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পেলে আবাসনের ধরনও বদলাবে।
কোথাও শিক্ষার্থীদের আবাসনের প্রয়োজন বেশি হতে পারে। কোথাও তরুণ পেশাজীবীদের জন্য ছোট ও কার্যকর অ্যাপার্টমেন্ট। কোথাও পরিবারের জন্য বড় বাসা। আবার কোথাও পেশাদারভাবে পরিচালিত ভাড়া—আবাসন কিংবা প্রবীণদের উপযোগী বসবাসের ব্যবস্থা।
সব জমিতে একই ধরনের ফ্ল্যাট বানিয়ে সব মানুষের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব নয়।
আবার ছোট ফ্ল্যাট বানালেই সেটি সাশ্রয়ী হয়ে যায় না। বাসাভাড়ার সঙ্গে যাতায়াত, বিদ্যুৎ, রক্ষণাবেক্ষণ আর দৈনন্দিন সেবার খরচও যোগ হয়। কম ভাড়ার বাসায় থেকে যদি প্রতিদিন দীর্ঘ সময় রাস্তায় কাটাতে হয়, সেই বাসা কতটা সুবিধাজনক, সেটিও ভাবতে হবে। আবাসনের সামর্থ্য বিচার করতে তাই মানুষের পুরো জীবনযাপনের খরচটি বোঝা জরুরি।
আজকের তরুণের বার্ধক্যও ভাবতে হবে
বাংলাদেশ এখন তরুণ জনগোষ্ঠীর দেশ। এই চিত্র চিরকাল একই থাকবে না। ইউএনএফপিএর তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৬০ বছর ও তার বেশি বয়সীদের অংশ ইতিমধ্যে ৯ দশমিক ৩ শতাংশে পৌঁছেছে।
আজ আমরা যাঁদের জন্য আবাসন তৈরি করছি, তাঁরা অনেকেই সেই বাসায় কয়েক দশক কাটাবেন। অথচ ৪০ বছর বয়সে যে বাসা সুবিধাজনক, ৭০–এ এসে সেটিই সামলানো কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
সন্তানেরা আলাদা হয়ে গেলে বড় ফ্ল্যাটের অনেক ঘর অব্যবহৃত থাকে। পরিষ্কার রাখা, রক্ষণাবেক্ষণ, সেবার বিল—সবই তখন বাড়তি চাপ। এর সঙ্গে একাকিত্ব যোগ হলে সমস্যাটি আরও গভীর হয়।
আমাদের সমাজে প্রবীণদের আবাসন নিয়ে কথা উঠলেই অনেক সময় বৃদ্ধাশ্রমের প্রসঙ্গ আসে। কিন্তু নিজের পছন্দে স্বাধীনভাবে থাকা, প্রয়োজনমতো সহায়তা পাওয়া এবং পরিচিত মানুষের সান্নিধ্যে থাকার আরও অনেক ব্যবস্থা নিয়ে ভাবা যায়।
ধরুন, একটি পরিকল্পিত কমিউনিটিতে ছোট অ্যাপার্টমেন্ট আছে, পরিবারের জন্য বড় বাসাও আছে এবং আছে হাঁটার জায়গা, দৈনন্দিন কেনাকাটা, স্বাস্থ্যসেবা আর একসঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ। একজন তরুণ সেখানে ছোট বাসায় জীবন শুরু করলেন। পরিবার বড় হলে বড় বাসায় গেলেন। অবসরের পর আবার ছোট, সহজে সামলানো যায়—এমন বাসায় ফিরলেন। তাঁর বাসা বদলালেন। কিন্তু পরিচিত পাড়া, প্রতিবেশী আর সামাজিক সম্পর্ক ছেড়ে যেতে হলো না।
আমার কাছে এটি আবাসনকে দেখার অনেক বেশি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। কারণ, মানুষের কাছে একটি ঠিকানার মূল্য শুধু তাঁর দলিলে থাকে না। থাকে চেনা মুখে, অভ্যাসে আর প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ানো মানুষগুলোর মধ্যে।
নিজের বাসা থাকার বাইরেও বিকল্প চাই
নতুন প্রজন্মের সবাই একইভাবে জীবন সাজাবে না। কেউ দ্রুত বাসা কিনতে চাইবে। কেউ আগে কর্মজীবনে স্থির হতে চাইবে। কেউ দেশে–বিদেশে কাজ করবে। কেউ একটি শহরে কয়েক মাস বা কয়েক বছর থাকবে। তাঁদের জন্য আবাসনের বিকল্পও বাড়াতে হবে।
পড়াশোনার সময় ভাগ করে থাকা, কর্মজীবনের শুরুতে ভাড়া, বদলির চাকরিতে সেবাসহ আবাসন, পরিবার হলে নিজের বাসা—একই মানুষের জীবনে এসব ব্যবস্থারই প্রয়োজন হতে পারে। তাই ভাড়ায় থাকাকে কেবল নিজের ফ্ল্যাট কেনার আগের অপেক্ষা হিসেবে দেখলে চলবে না। অনেকের জন্য সেটি সচেতন ও কার্যকর সিদ্ধান্ত হতে পারে।
এই সিদ্ধান্তকে সহজ করতে প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য সেবা। পরিষ্কার চুক্তি, বাসার অবস্থা সম্পর্কে সঠিক তথ্য, মেরামতের দায়িত্ব নির্ধারণ, নিরাপত্তা এবং সমস্যা হলে সমাধানের ব্যবস্থা থাকতে হবে। বাড়ির মালিকও যেন নিশ্চিন্ত থাকেন। তাঁর সম্পত্তির যত্ন হচ্ছে কি না, ভাড়া সময়মতো পাচ্ছেন কি না, দূরে থেকেও প্রয়োজনীয় তথ্য জানতে পারছেন কি না, সেগুলো গুরুত্বপূর্ণ। ভাড়া, সার্ভিসড অ্যাপার্টমেন্ট, করপোরেট আবাসন, কেনাবেচা আর সম্পত্তি ব্যবস্থাপনাকে মানুষের জীবনের বিভিন্ন প্রয়োজনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে।
টেকসই আবাসনের কেন্দ্রে মানুষ
আমি বরাবরই টেকসই নির্মাণের পক্ষে কথা বলি। পরিবেশবান্ধব উপকরণ, জ্বালানির সাশ্রয়, প্রাকৃতিক আলো–বাতাস, পানি ব্যবস্থাপনা—এসব অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি একটি বাসা দীর্ঘদিন মানুষের কাজে লাগছে কি না, সেটিও আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
একটি ঘর কি প্রয়োজনে বদলালে অন্য কাজে ব্যবহার করা যাবে? চলাফেরায় অসুবিধা হলে বাসাটিতে থাকা সম্ভব হবে? দৈনন্দিন সেবা পেতে কত দূর যেতে হবে? শিশুর খেলার আর প্রবীণের হাঁটার সুযোগ থাকবে? নকশার শুরুতেই এসব প্রশ্ন করলে ভবিষ্যতে অনেক অসুবিধা কমানো সম্ভব হতে পারে।
একটি ভবন বহু বছর দাঁড়িয়ে থাকে। সেই সময়ে তার বাসিন্দাদের জীবন বহুবার বদলায়। এই পরিবর্তনের কিছুটা জায়গা আমাদের পরিকল্পনায়ও রাখা দরকার।
আবাসনের হিসাব শুরু হোক জীবন থেকে
আবাসন খাতে আমাদের বর্গফুটের হিসাব করতে হয়। নির্মাণে ব্যয়, বিক্রয়মূল্য, বিনিয়োগের ফল—সবই জরুরি। কিন্তু সেই হিসাবের পাশে বাসিন্দার জীবনের হিসাবটিও থাকতে হবে।
একজন শিক্ষার্থীর দরকার সাধ্যের মধ্যে নিরাপদ স্বাধীনতা। একজন তরুণ পেশাজীবীর দরকার সময় বাঁচানো আর চলাচলের সুবিধা। একটি পরিবারের দরকার পরিসর, স্কুল আর সুস্থ পরিবেশ। একজন প্রবীণের দরকার নিরাপত্তা, সেবা আর সঙ্গ।
এ জন্য ডেভেলপার, স্থপতি, নগর–পরিকল্পনাবিদ, বিনিয়োগকারী ও নীতিনির্ধারকদের একসঙ্গে ভাবতে হবে। কোথায় কোন ধরনের আবাসন দরকার, তার তথ্য চাই। ভাড়া–আবাসনের নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা চাই। বিভিন্ন সামর্থ্য ও বয়সের মানুষের জন্য উপযোগী নকশা চাই।
আমার ছেলেমেয়ের দিকে তাকিয়ে যে প্রশ্নটি মনে আসে, সেটি তাই শুধু একজন বাবার প্রশ্ন হয়ে থাকে না। আবাসন খাতের একজন মানুষ হিসেবেও আমাকে ভাবায়। ওরা যখন নিজেদের জীবন গড়বে, আমরা কি তাদের জন্য যথেষ্ট বিকল্প রেখে যেতে পারব? আর ওদের জীবন যখন বদলাবে, আমাদের গড়া আবাসন কি সেই পরিবর্তনকে ধারণ করতে পারবে? আগামী দিনের আবাসন নিয়ে ভাবনা শুরু হতে পারে এই প্রশ্ন থেকেই।
লেখক: তানভীর শাহরিয়ার রিমন, পরিচালক, এসিআই প্রপার্টিজ লিমিটেড
