জয়পুরহাটের কালাই পৌরসভার একমাত্র পৌর অডিটোরিয়াম নির্মাণের নির্ধারিত সময় ছিল তিন বছর। কিন্তু এরই মধ্যে পেরিয়ে গেছে সাত বছরের বেশি সময়। এরপরও অডিটোরিয়ামটির নির্মাণকাজ শেষ হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণকাজ চলমান থাকায় এর সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন পৌরবাসী।
এদিকে, নির্মাণকাজের বিপরীতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। অর্থসংকট, প্রকল্পের অর্থ ছাড় এবং ঠিকাদারি কাজের বাস্তবায়ন নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
কালাই পৌরসভার আওড়া মোড়ের সামনে সিনেমা হল-টু-গঙ্গাদাসপুর সড়কের পাশে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পৌর অডিটোরিয়াম নির্মাণ প্রকল্পের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ওই অর্থবছরের ৭ মার্চ প্রকল্পটি অনুমোদন হওয়ার পর ২০১৯ সালের ১ এপ্রিল নির্মাণকাজ শুরু হয় বলে জানান পৌরসভার লাইসেন্স পরিদর্শক মোস্তা হাসান। পৌর প্রকৌশলী এ কে এম সাইফুল ইসলামের কাছে অডিটোরিয়াম-সংক্রান্ত তথ্য জানতে চাইলে তিনি মোস্তা হাসানের কাছ থেকে তথ্য নেওয়ার পরামর্শ দেন। পরে মোস্তা হাসান প্রকল্প-সংক্রান্ত তথ্য সরবরাহ করেন।
প্রকল্পটির প্রাথমিক নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল ৭ কোটি ৫৬ লাখ ২০ হাজার ৬০৬ টাকা। পরে ১০ শতাংশ ছাড় দিয়ে টেন্ডার মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৬ কোটি ৭৯ লাখ ৫০ হাজার ৩৮৬ টাকা। এর মধ্যে স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে ৫ কোটি ৯৮ লাখ ৯ হাজার ৬২০ টাকা এবং পৌরসভার নিজস্ব রাজস্ব তহবিল থেকে ৮১ লাখ ৪০ হাজার ৮৬৬ টাকা দেওয়ার কথা ছিল।
পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, তৎকালীন পৌর মেয়র খন্দকার হানিমুল আলম জনের মেয়াদকালে প্রায় ৬ কোটি ৭৯ লাখ ৫০ হাজার ৩৮৬ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটির টেন্ডার সম্পন্ন হয়।
প্রকল্পটির মূল ঠিকাদারি কাজ দেওয়া হয় মেসার্স কবির ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী একরামুল কবির আহম্মেদের নামে। তবে অভিযোগ রয়েছে, বাস্তবে নির্মাণকাজ করছেন মেসার্স নজরুল ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী নজরুল ইসলাম। কী ধরনের চুক্তি, অনুমোদন বা বৈধ প্রক্রিয়ায় এক প্রতিষ্ঠানের কাজ অন্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে অডিটোরিয়াম নির্মাণের মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কবির ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী একরামুল কবির আহম্মেদের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, অডিটোরিয়ামটির নির্মাণকাজ কালাইয়ের নজরুল ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী নজরুল ইসলাম করছেন। এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের প্রয়োজন নেই বলে উল্লেখ করে তিনি নজরুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। একই সঙ্গে নজরুল ইসলামকেও দেখা করতে বলবেন বলে জানান তিনি। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ঠিকাদারি কাজ হস্তান্তর বা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া সম্পর্কে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অডিটোরিয়ামটির নির্মাণকাজ নির্ধারিত তিন বছরের মধ্যে শেষ করার কথা থাকলেও বছরের পর বছর ধরে কাজ চলছে। সাত বছরেও নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় এর সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন কালাই পৌরবাসী।
পৌরসভার থুপসারা গ্রামের বাসিন্দা রায়হান বলেন, এই কমিউনিটি সেন্টারের কাজ শুরু হয়েছে পাঁচ-সাত বছর হলো। কাজও প্রায় শেষের দিকে, কিন্তু এখনো নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়নি। তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘এই কাজটা সম্পন্ন হবে কবে? আমাদের সুবিধা হবে কবে? এটা হচ্ছে না কেন? বিষয় কী? সমস্যা কী? হয় না কেন? কাজ নিয়ে এত ভংচং কেন?’ এভাবে পৌরসভা ও ঠিকাদারি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে নানা প্রশ্ন তোলেন তিনি।
পৌরসভার আওড়া গ্রামের বাসিন্দা শহিদুল ইসলাম বলেন, পৌর কমিউনিটি সেন্টারের নির্মাণকাজ গত পাঁচ-সাত বছর ধরে চলছে, কিন্তু এর উদ্বোধন হচ্ছে না। পৌরবাসীর দীর্ঘদিনের আশা-আকাঙ্ক্ষা, এটি চালু হলে যা পূরণ হতো, তা এখনো পূরণ হচ্ছে না। এটি চালু হলে পৌরসভার বিভিন্ন অনুষ্ঠান এবং ছেলে-মেয়েদের বিয়েশাদির জন্য যে সেবা পাওয়া যেত, তা থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছেন। তিনি বলেন, তারা চান, কমিউনিটি সেন্টারটি অতি দ্রুত চালু হোক।
পৌরসভার আওড়া গ্রামের আরেক বাসিন্দা শাহজাহান আলী বলেন, কমিউনিটি সেন্টারের নির্মাণকাজ দীর্ঘদিন ধরে চলছে। কিন্তু কাজ শেষ না হওয়ায় পৌরবাসী এর কোনো সুফল পাচ্ছেন না। তারা চান, অতি দ্রুত নির্মাণকাজ শেষ হোক। কেন কাজ শেষ হচ্ছে না বা কী কারণে হচ্ছে না, তা তারা বলতে পারছেন না। তারা চান, দ্রুত নির্মাণকাজ শেষ করে এটি চালু করা হোক।
কালাই উপজেলা শিল্পী সংঘের সাধারণ সম্পাদক গোলাম আযম ফিতা বলেন, কালাই পৌর অডিটোরিয়ামের নির্মাণকাজ দীর্ঘ ছয়-সাত বছর ধরে ধীরগতিতে চলছে। দ্রুতগতিতে এ কাজ সম্পন্ন করা উচিত। সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিভিন্ন অনুষ্ঠান অনেক সময় ঝড়-বৃষ্টির কারণে খোলা মাঠে আয়োজন করা সম্ভব হয় না। পৌর অডিটোরিয়াম চালু হলে সেখানে এসব সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা যেত। কালাইয়ের সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে এগিয়ে নিতে পৌর অডিটোরিয়ামের নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করা উচিত। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের সুনজর দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
নির্মাণাধীন অডিটোরিয়ামটির দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা নজরুল ট্রেডার্সের কর্মচারী আবুল কালাম বলেন, ‘আমি অডিটোরিয়ামটির দেখাশোনা করি। কাজটি শেষও করতে পারছি না, আবার ছেড়েও দিতে পারছি না। পৌরসভা কর্তৃপক্ষ কেন কাজটি বুঝে নিচ্ছে না, তা জানি না। আমার ঠিকাদার বলেছেন, টাকা না পাওয়ায় কাজ করতে পারছেন না। তাঁরা অল্প অল্প টাকা দেন, আমরাও অল্প অল্প করে কাজ করি।’
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দাবি, অর্থসংকটের কারণে কাজ বন্ধ ছিল। সরকারি বরাদ্দের প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ টাকা এখনো পাওনা রয়েছে। এর মধ্যে পৌরসভার নিজস্ব রাজস্ব তহবিল থেকে ৮১ লাখ ৪০ হাজার ৮৬৬ টাকা দেওয়ার কথা থাকলেও তা পরিশোধ করেনি পৌর কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে বরাদ্দ করা টাকার মধ্যে ৪০ লাখ টাকা ব্যাংকে জমা ছিল। দীর্ঘদিন অর্থ না পাওয়ায় নির্মাণকাজ বন্ধ ছিল। এর আগে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণেও কয়েক মাস নির্মাণকাজ বন্ধ ছিল। এসব কারণে নির্ধারিত সময়ে নির্মাণকাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
পৌরসভার প্রকৌশলী এ কে এম সাইফুল ইসলাম জানান, নির্মাণকাজ শেষ করার মেয়াদ দ্বিতীয় দফায় আরও তিন বছর বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে প্রকল্পটির নির্মাণকাজের মেয়াদ ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত রয়েছে।
নির্মাণকাজ বাস্তবায়নকারী হিসেবে পরিচিত নজরুল ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা এ পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ পেয়েছি এবং সেই অনুযায়ী কাজও করেছি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বাকি টাকা না পাওয়ায় কাজ বন্ধ ছিল। মাননীয় জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী এমপির সহযোগিতায় স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে বরাদ্দ করা টাকার মধ্যে ব্যাংকে জমা থাকা অর্থ থেকে আরও ১০ লাখ টাকা পেয়েছি। টাকা পাওয়ার পর অডিটোরিয়ামের বাউন্ডারি ওয়ালের কাজ করছি। বরাদ্দ করা টাকার মধ্যে এখনো ১ কোটি ১০ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে।’
পৌর প্রকৌশলী এ কে এম সাইফুল ইসলামও ঠিকাদারকে আরও ১০ লাখ টাকা বিল দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণকাজ চললেও অডিটোরিয়ামটি এখনো পুরোপুরি চালু না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তারা বলেন, ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠিত কালাই পৌরসভা বিগত সময়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চললেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে উন্নয়নের নামে কালাই পৌরসভায় ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। ফলে জনসেবা ব্যাহত হয়েছে। পৌরসভায় কর্মরত থেকেও ঠিকাদার হওয়ার এবং দিনের কাজ রাতে করার ঘটনাও রয়েছে এই পৌরসভার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। ফলে সরকারি অর্থ চলে যাচ্ছে অসৎ কর্মকর্তাদের পকেটে। অন্যদিকে, পৌরবাসী সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
কালাই পৌরসভার প্রকৌশলী এ কে এম সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘যে কাজ হয়েছে, তার বিল ঠিকাদারকে দেওয়া হয়েছে। ঠিকাদার চাইলেই তো আমি টাকা দিতে পারি না। তারা পৌরসভার রাজস্ব তহবিল থেকে টাকা দাবি করছেন। কিন্তু আমাদের স্টাফদের বেতন দিতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। টাকা কোথা থেকে দেব?’
তিনি আরও বলেন, ‘এ বিষয়ে মাননীয় প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী এমপি আমাকে ঠিকাদারকে কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য ব্যাংকে অবশিষ্ট থাকা টাকা থেকে কিছু অর্থ দিতে বলেন। এরপর ব্যাংকে থাকা অর্থ থেকে তাকে আরও ১০ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। আমাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ভিত্তিহীন। পৌরসভা থেকে যে ৮১ লাখ ৪০ হাজার ৮৬৬ টাকা দেওয়ার কথা ছিল, তা দিতে না পারায় গত ১৬ জুলাই ২০২৬ তারিখে বিশেষ বরাদ্দের জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়। পরবর্তী সময়ে ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সালে মাননীয় প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী এমপির ডিও লেটার সংযুক্ত করে মন্ত্রণালয়ে আবেদন পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে অর্থের জন্য কাজ আটকে থাকবে না। আর বিশেষ বরাদ্দ না পেলেও আগামী দুই-তিন মাসের মধ্যে অডিটোরিয়ামটি চালু করে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা আশা করছি, আগামী শীতের আগেই এটি উদ্বোধন করে কালাইবাসীকে এর সুফল ভোগ করার সুযোগ করে দিতে পারব।’
কালাই পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফয়সাল আহমেদ বলেন, ‘পৌরসভার অডিটোরিয়ামটির কাজ দীর্ঘদিন ধরে অর্থায়ন-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে স্থবির হয়ে আছে। এ বিষয়ে আমরা ইতোমধ্যে উদ্যোগ নিয়েছি। মাননীয় প্রতিমন্ত্রী মহোদয় ডিও লেটার দিয়েছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে অর্থায়ন-সংক্রান্ত জটিলতা খুব দ্রুত নিরসন হবে বলে আমরা আশা করছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘কালাই উপজেলার মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি এই পৌর অডিটোরিয়াম। আমরা এটি পুরোপুরি চালু করতে চাই। আশা করছি, আগামী তিন মাসের মধ্যে এটি চালু করতে পারব। যদি এর মধ্যে পুরোপুরি কাজ শেষ নাও হয়, তারপরও যেহেতু একটি বড় স্থাপনা ইতোমধ্যে নির্মিত হয়েছে, সেটিকে পৌরসভার আয়বর্ধক হিসেবে কাজে লাগানোর লক্ষ্য রয়েছে। আশা করছি, খুব দ্রুতই কালাই পৌর অডিটোরিয়ামটি চালু করা সম্ভব হবে।’
পৌরবাসীর প্রত্যাশা, দ্রুত অর্থসংকট, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক জটিলতা নিরসন করে নির্মাণকাজ শেষ করা হবে এবং অডিটোরিয়ামটি জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে।
