মানুষ নামাজ পড়ে, রোজা রাখে, নিয়মিত ইবাদতও করে। কিন্তু নিজের অজান্তে কিংবা জেনেশুনে অন্যের অধিকার নষ্ট করার মতো গুনাহেও কারও পাওনা আটকে রাখা, অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করা কিংবা কাউকে অপমান করা, এসবই মানুষের হক নষ্ট করার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। ইসলামে আল্লাহর হকের পাশাপাশি মানুষের হক আদায়ের ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কারও অধিকার নষ্ট করে ফেললে শুধু তওবা করলেই কি মুক্তি মিলবে?
ইসলামে মানুষের অধিকার রক্ষাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা অন্যায়ভাবে একে অপরের সম্পদ ভোগ করতে নিষেধ করেছেন। সূরা আল-বাকারার ১৮৮ নম্বর আয়াতে অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ ভোগ করা এবং বিচারকদের কাছে তা নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা এসেছে।
মানুষের হক নষ্ট করার বিষয়টি শুধু অর্থসম্পদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কারও জমি দখল করা, উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা, কর্মীর প্রাপ্য পারিশ্রমিক আটকে রাখা, ব্যবসায় ওজনে কম দেওয়া কিংবা কারও সম্মানহানি করাও অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন করার কারণ হতে পারে।
এমনকি কথার মাধ্যমেও মানুষের হক নষ্ট হতে পারে। কারও অনুপস্থিতিতে তার দোষ প্রচার করা, মিথ্যা অপবাদ দেওয়া কিংবা অন্যের সম্মান নষ্ট করে এমন কথা বলা, এসব বিষয় থেকেও একজন মুসলিমের সতর্ক থাকা জরুরি।
মানুষের হক নষ্টের পরিণতি সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন। সহিহ মুসলিমে বর্ণিত এক হাদিসে তিনি প্রকৃত নিঃস্ব ব্যক্তির কথা বলেছেন। তাঁর উম্মতের মধ্যে এমন ব্যক্তি থাকবে, যে কিয়ামতের দিন নামাজ, রোজা ও জাকাত নিয়ে উপস্থিত হবে। কিন্তু সে কাউকে গালি দিয়েছে, কারও বিরুদ্ধে অপবাদ দিয়েছে, কারও সম্পদ আত্মসাৎ করেছে, কারও রক্তপাত ঘটিয়েছে কিংবা কাউকে প্রহার করেছে। এতে তার নেকি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের দিয়ে দেওয়া হবে। নেকি শেষ হয়ে গেলে তাদের পাপ তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে। এরপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
হাদিসটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ইবাদতের পাশাপাশি মানুষের অধিকার রক্ষা করাও একজন মুসলিমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তাহলে কেউ যদি অন্যের হক নষ্ট করে ফেলেন, তার করণীয় কী?
ইসলামে আন্তরিক তওবার বলতে- অন্যায় ছেড়ে দেওয়া, নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হওয়া এবং ভবিষ্যতে সেই অন্যায় না করার দৃঢ় সংকল্প করার কথা বলা । আর অন্যের অধিকার নষ্ট হয়ে থাকলে সেই অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। অর্থ বা সম্পদ আত্মসাৎ করলে তা ফেরত দিতে হবে, পাওনা আটকে রাখলে পরিশোধ করতে হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।
অর্থাৎ, মানুষের হক নষ্ট করার ক্ষেত্রে শুধু মুখে তওবা করাই যথেষ্ট নয়; যার অধিকার নষ্ট হয়েছে, তার অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
তাই আমাদের উচিত, প্রতিদিনের কাজকর্ম ও আচরণ পর্যালোচনা করা। কারও পাওনা বাকি আছে কি না, কাউকে অন্যায়ভাবে কষ্ট দিয়েছি কি না কিংবা কারও অধিকার থেকে তাকে বঞ্চিত করেছি কি না, এসব বিষয়ে সচেতন থাকা।
কারণ, প্রকৃত ধর্ম পালন শুধু ইবাদতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের সঙ্গে ন্যায়সংগত আচরণ করা এবং অন্যের অধিকার রক্ষা করাও ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
