জয়ের জন্য দরকার ছিল আর মাত্র কয়েকটি আঘাত। হাতে পর্যাপ্ত সময়, প্রতিপক্ষের ইনিংসে তখনো বাকি সাত উইকেট। আবুধাবির শেষ দিনের হিসাব-নিকাশে কাগজে-কলমে এগিয়ে ছিল বাংলাদেশই। কিন্তু ক্রিকেট তো আর কাগজের হিসাব মেনে চলে না! শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের বোলারদের পাঁচটি সাফল্যও যথেষ্ট হলো না। আজ দৃঢ়তায় দেয়াল তুলে দাঁড়াল আফগানিস্তান। শেষ বিকেলে জয় নয়, সিরিজের একমাত্র টেস্টে ড্র নিয়েই মাঠ ছাড়তে হলো দুই দলকে।
একদিকে বাংলাদেশের অপূর্ণতার গল্প, অন্যদিকে আফগানদের বুক চিতিয়ে লড়াই! ৪৭৯ রানের বিশাল লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে জয়ের স্বপ্ন দেখার চেয়ে উইকেট বাঁচানোই ছিল আফগানদের প্রধান কাজ। সেই পরিকল্পনায় শেষ পর্যন্ত সফল তারা। পঞ্চম দিনের খেলা শেষ হয়েছে তাদের দ্বিতীয় ইনিংসের স্কোর ৮ উইকেটে ৩৪৬ রান। জয়ের জন্য প্রয়োজনীয় ১৩৩ রান থেকে অনেক দূরে থাকলেও হার এড়ানোর লড়াইয়ে সফল আফগানরা।
দিনের শুরুতে তিন উইকেট হারিয়ে ১৩২ রান নিয়ে ব্যাটিংয়ে নেমেছিল আফগানিস্তান। বাংলাদেশের সামনে তখন একটাই লক্ষ্য-দ্রুত উইকেট তুলে নিয়ে জয় নিশ্চিত করা। কিন্তু সকালের সেশনে আফগান ব্যাটারদের পরিকল্পনা ছিল পরিষ্কার। উইকেট বিলিয়ে দেওয়ার কোনো তাড়াহুড়ো নেই, বড় শট খেলার ঝুঁকিও নেই। সময়কে প্রতিপক্ষ বানিয়ে নয়, সময়ের সঙ্গেই বন্ধুত্ব করে এগোতে থাকেন সেদিকুল্লাহ আতাল ও হাশমতউল্লাহ শহীদি!
বাংলাদেশ অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত একের পর এক বোলার পরিবর্তন করেছেন। পেসারদের পাশাপাশি স্পিনারদের দিয়েও চেষ্টা করেছেন প্রতিপক্ষের প্রতিরোধ ভাঙতে। কিন্তু আবুধাবির উইকেট যেন বোলারদের খুব বেশি সহায়তা করতে রাজি ছিল না। শেষ দিনের উইকেটে ফাটল থাকলেও সেখান থেকে প্রত্যাশিত টার্ন আদায় করতে পারেননি বাংলাদেশের স্পিনাররা। তাইজুল ইসলাম, মেহেদী হাসান মিরাজ ও নাঈম হাসানের ঘূর্ণি আফগান ব্যাটারদের খুব একটা বিচলিত করতে পারেনি।
এর মধ্যে প্রচণ্ড গরমের ধাক্কা লাগে আফগান অধিনায়ক শহীদির শরীরে। ক্র্যাম্পের কারণে প্রথম সেশনেই মাঠ ছাড়তে হয় তাকে। ফেরার আগে ৩৩ বলে ২০ রান করেছিলেন তিনি। তবে তার এই সাময়িক বিদায়ও বাংলাদেশের জন্য বড় কোনো সুযোগ তৈরি করতে পারেনি।
লাঞ্চের ঠিক আগে অবশেষে আসে কাঙ্ক্ষিত উইকেট। ইবাদত হোসেনের করা ৭৮তম ওভারের প্রথম বলটি ছিল লেগ স্টাম্পের বাইরে খাটো লেংথের। পুল করতে গিয়ে বলের নিয়ন্ত্রণ হারান ইকরাম আলীখিল। ব্যাটের বাইরের কানায় লেগে বল চলে যায় উইকেটের পেছনে। সেখান থেকে ডান দিকে শরীর ছুড়ে দুর্দান্ত ক্যাচ নেন লিটন দাস। ৬৯ বলে ৩৩ রান করে ফেরেন ইকরাম। বাংলাদেশের শিবিরে তখন স্বস্তির নিঃশ্বাস। লিটনের সেই ক্যাচে যোগ হয় তার নবম ডিসমিসাল, আরেকটি বিশ্বরেকর্ডের গল্পও!
তবে উইকেট হারিয়েও পথ হারায়নি আফগানিস্তান। সেদিকুল্লাহ আতালের সঙ্গে নতুন জুটি গড়েন ইসমত আলম। দুজনের ব্যাটে আসে ৪০ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি। শেষ পর্যন্ত মিরাজের বলে নাজমুল হোসেন শান্তর হাতে ক্যাচ দিয়ে বিদায় নেন ইসমত। ৬০ বল খেলে তার সংগ্রহ মাত্র চার রান। সংখ্যাটা ছোট হলেও দলের প্রয়োজনের মুহূর্তে তার উইকেটে টিকে থাকার লড়াই ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
এরপর আবার ব্যাট হাতে ফেরেন প্রথম সেশনে রিটায়ার্ড হার্ট হওয়া শহীদি। কিন্তু এবারও আফগানদের জুটি ভাঙেন মিরাজ। তার বলে হাসান মাহমুদের হাতে ক্যাচ তুলে দিয়ে ফেরেন শহীদি। ৬৯ বলে ৩৬ রান করেন তিনি।
একদিকে যখন নিয়মিত বিরতিতে উইকেট পড়ছিল, অন্যদিকে নিজের জায়গায় অটল ছিলেন আতাল। বাংলাদেশের বোলারদের পরীক্ষা নিয়ে এক প্রান্ত আগলে রাখেন এই ওপেনার। ৩৩২ বলের দীর্ঘ ইনিংসে তুলে নেন ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি। তার ১১১ রানের ইনিংসটি সাজানো ছিল নয়টি চার ও তিনটি ছক্কায়। বাংলাদেশের জয়ের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে ওঠেন তিনিই!
তাইজুলের ঘূর্ণিতে আতালের বিদায়ের পরও অবশ্য শেষ হয়নি আফগানদের প্রতিরোধ। শেষদিকে ইয়ামিন আহমাদজাই ও কায়েস আহমেদের ব্যাটে জমে ওঠে নতুন প্রতিরোধ। বাংলাদেশের বোলাররা উইকেটের জন্য মরিয়া হয়ে উঠলেও এই জুটি শেষ পর্যন্ত হার মানেনি। সময় গড়িয়েছে, বাংলাদেশের জয়ের সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়েছে, আর আফগানিস্তানের ড্রয়ের স্বপ্ন হয়েছে বাস্তব।
বাংলাদেশের হয়ে এবাদত হোসেন ও মেহেদী হাসান মিরাজ নিয়েছেন সর্বোচ্চ তিনটি করে উইকেট। হাসান মাহমুদ ও নাঈম হাসানের শিকার একটি করে। উইকেটের হিসাবে বোলাররা একেবারে ব্যর্থ ছিলেন না। কিন্তু শেষ দিনের ক্রিকেটে শুধু উইকেট নেওয়াই যথেষ্ট নয়, প্রতিপক্ষের শেষ প্রতিরোধটুকুও ভাঙতে হয়। সেই জায়গাতেই পিছিয়ে পড়েছে বাংলাদেশ।
ম্যাচটির পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসের ৩৪৬ রানের জবাবে আফগানিস্তান করেছিল ২৪০ রান। দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশ ৭ উইকেটে ৩৭২ রান তুলে ইনিংস ঘোষণা করে। তাতে আফগানিস্তানের সামনে দাঁড়ায় ৪৭৯ রানের বিশাল লক্ষ্য। কিন্তু শেষ দিনে পাঁচ উইকেট হারিয়েও বাকি পথটুকু পাড়ি দিতে পারেনি বাংলাদেশ।
আবুধাবি টেস্টে তাই একসঙ্গে লেখা হলো দুই রকমের গল্প। ব্যক্তিগত অর্জনে লিটনের বিশ্বরেকর্ড, আতালের ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি। আর দলীয় প্রাপ্তিতে আফগানিস্তানের অবিশ্বাস্য প্রতিরোধ। বাংলাদেশের জন্য রয়ে গেল একরাশ আক্ষেপ। যে ম্যাচের শেষ দিনটি হওয়ার কথা ছিল জয়ের উদ্যাপনে রাঙানো, সেটিই শেষ হলো অপূর্ণতার স্বাদ নিয়ে।
ক্রিকেটে কখনো কখনো জয় না পাওয়াটাও হারের মতোই তেতো হয়ে থাকে। আবুধাবিতে বাংলাদেশের জন্য দিনটি ছিল ঠিক তেমনই-জয়ের এত কাছে গিয়েও শেষ পর্যন্ত জয় ছুঁতে না পারার এক দীর্ঘশ্বাস!
