দেয়ালে পোস্টার লাগানো নগরজীবনের অতিপরিচিত প্রচার সংস্কৃতি। তবে প্রচারের প্রয়োজন থাকলেই যেখানে-সেখানে পোস্টার লাগানোর অধিকার তৈরি হয় না। অন্যের দেয়াল, দোকান, বাড়ি, মসজিদ, প্রতিষ্ঠান বা জনসাধারণের স্থানে অনুমতি ছাড়া পোস্টার লাগালে মালিকানা, নাগরিক শৃঙ্খলা ও পরিবেশের বিষয় জড়িয়ে পড়ে।
ইসলাম ব্যক্তিগত অধিকার ও সামষ্টিক কল্যাণ- উভয়কেই গুরুত্ব দিয়েছে। তাই ইসলামের দৃষ্টিতে পোস্টার লাগানোর ক্ষেত্রেও বৈধতা ও অন্যায়ের সীমা জানা জরুরি।
কোনো বৈধ পণ্য, সেবা, শিক্ষা কার্যক্রম, সামাজিক উদ্যোগ বা অনুষ্ঠানের প্রচারণার জন্য পোস্টার ব্যবহার করা জায়েজ। তবে প্রচারণার মাধ্যম বৈধ হতে হবে। পোস্টারে মিথ্যা তথ্য, প্রতারণা, অশ্লীলতা বা শরিয়তবিরোধী কোনো বিষয় থাকা যাবে না। পাশাপাশি পোস্টার লাগানোর স্থান ব্যবহারের বৈধ অধিকার থাকতে হবে। নিজের মালিকানাধীন দেয়ালে নিজে পোস্টার লাগানো বা মালিকের অনুমতি নিয়ে অন্যের দেয়ালে পোস্টার লাগানো বৈধতার আওতায় পড়বে।
একইভাবে কোনো প্রতিষ্ঠান বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট স্থানে প্রচারণার অনুমতি দিলে সেখানে নিয়ম মেনে পোস্টার লাগানো যেতে পারে; কিন্তু মালিকের অনুমতি ছাড়া তার দেয়ালকে নিজের বিজ্ঞাপনের স্থান হিসেবে ব্যবহার করা বৈধ নয়। কারণ প্রচারণার উদ্দেশ্য বৈধ হলেও অন্যের সম্পদ ব্যবহারের পদ্ধতি অবৈধ হয়ে যায়। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না; তবে পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসা হলে তা ভিন্ন।’ -সূরা আন নিসা: ২৯
এ আয়াতের মূল শিক্ষা হলো অন্যের সম্পদ বা অধিকার তার সম্মতি ছাড়া ভোগ করা যাবে না। সুতরাং কোনো ব্যক্তির দেয়াল তার অনুমতি ছাড়া প্রচারণার কাজে ব্যবহার করা এ নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ইসলামের শিক্ষা হলো, কোনো অবস্থাতেই মানুষের অধিকার নষ্ট করা যাবে না। একটি পোস্টার লাগিয়ে চলে যাওয়া সহজ হলেও সেটি যার দেয়ালে লাগানো হয়েছে, তার জন্য বিষয়টি অনেক সময় সহজ থাকে না। আঠা বা পেস্টের কারণে দেয়ালের বা গাড়ির রং নষ্ট হতে পারে। পোস্টার খুলে ফেলতে অতিরিক্ত শ্রম লাগতে পারে। কখনো নতুন করে দেয়াল রং করার প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ একজনের প্রচারণার সুবিধার জন্য অন্য ব্যক্তিকে সময়, শ্রম বা অর্থ ব্যয় করতে হয়। ইসলাম এ ধরনের ক্ষতি থেকে সতর্ক করেছে। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ক্ষতি করা যাবে না এবং ক্ষতির জবাবে ক্ষতিও করা যাবে না।’ -ইবনে মাজাহ: ২৩৪০
এ কারণে অনুমতি ছাড়া কোনো ব্যক্তির দেয়ালে বা গাড়িতে পোস্টার লাগিয়ে তার সম্পদের ক্ষতি করা শুধু শিষ্টাচারবহির্ভূত আচরণ নয়; বরং মানুষের অধিকারের বিষয়ও। মালিক যদি নিজের স্থাপনা পরিচ্ছন্ন রাখতে চান, সেখানে অন্যের প্রচারণা চাপিয়ে দেওয়ার অধিকার কারো নেই।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার, দেয়ালটি ব্যক্তিমালিকানাধীন না হয়ে কোনো প্রতিষ্ঠান বা সরকারি সংস্থার হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া সেটি ব্যবহার করা উচিত নয়। কারণ জনসাধারণের সম্পদ মানে কারো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, এমন নয় যে সেখানে যে কেউ নিজের ইচ্ছামতো কিছু করতে পারবে।
এছাড়া যত্রতত্র পোস্টার লাগানোর প্রভাব ব্যক্তিগত সম্পত্তির গণ্ডি ছাড়িয়ে শহরের সামগ্রিক পরিবেশেও পড়ে। একটি দেয়ালে একটি পোস্টার, তারপর তার ওপর আরেকটি, এভাবে স্তরে স্তরে কাগজ জমতে জমতে নগরের বিভিন্ন স্থাপনা অপরিচ্ছন্ন ও দৃষ্টিকটু হয়ে ওঠে। রাস্তার পাশে, বৈদ্যুতিক খুঁটি, সড়ক বিভাজক কিংবা অন্যান্য স্থাপনায় পোস্টার লাগালে শহরের স্বাভাবিক সৌন্দর্যও নষ্ট হয়।
বাংলাদেশে এ বিষয়ে আইনও রয়েছে। দেয়াল লিখন ও পোস্টার লাগানো (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১২-এ নির্ধারিত স্থান ছাড়া দেয়াল, স্থাপনা ও বিভিন্ন জনপরিসরে পোস্টার লাগানোর ওপর বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়েছে। অর্থাৎ নাগরিক জীবনে পরিচ্ছন্নতা ও শৃঙ্খলা রক্ষার বিষয়টি রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও স্বীকৃত। ইসলামের দৃষ্টিতেও জনসাধারণের চলাচল ও বসবাসের পরিবেশকে অযথা নষ্ট করা গ্রহণযোগ্য নয়। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ঈমানের সত্তরেরও বেশি শাখা রয়েছে... আর রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়া ঈমানের একটি শাখা।’ -সহিহ মুসলিম: ৩৫
রাস্তা থেকে ক্ষতিকর বস্তু সরানো যেখানে সওয়াবের কাজ, সেখানে নিজের প্রচারণার জন্য জনপরিসরকে অগোছালো করে তোলা অন্তত একজন মুসলমানের কাম্য আচরণ হতে পারে না। তাই পরিবেশের পরিচ্ছন্নতা ও জনস্বস্তির বিষয়টিও প্রচারণার সময় বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
ইসলাম মনে করে, প্রচার হোক শরিয়তসম্মত পদ্ধতিতে। হ্যাঁ, আপনার প্রচার প্রয়োজন, কিন্তু তার জন্য অনুমতি ছাড়া দেয়াল দখল করার প্রয়োজন নেই। প্রথমত, পোস্টার লাগানোর আগে দেয়ালের মালিক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, স্থানীয় প্রশাসন বা সিটি করপোরেশন নির্ধারিত প্রচারণার স্থান থাকলে তা ব্যবহার করা উচিত। তৃতীয়ত, প্রচারের জন্য ডিজিটাল মাধ্যম, লিফলেট বিতরণ, অনুমোদিত বিলবোর্ড বা বৈধ বিজ্ঞাপনব্যবস্থার মতো বিকল্প পদ্ধতি গ্রহণ করা যেতে পারে।
যারা পোস্টার লাগানোর কাজের সঙ্গে যুক্ত, তাদেরও দায়িত্ব রয়েছে। পোস্টার লাগানোর কর্মীকে অনুমোদিত স্থানেই লাগানোর নির্দেশ দিতে হবে। আর কেউ যদি ভুলবশত বা অনুমতি ছাড়া পোস্টার লাগিয়ে ফেলে, তাহলে সম্ভব হলে তা অপসারণ করা এবং কোনো ক্ষতি হয়ে থাকলে যথাসাধ্য পূরণ করা উচিত।
