গাজায় পণ্য প্রবেশে বিধিনিষেধ, খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও মানবিক সহায়তা কমে যাওয়ায় চরম খাদ্যসংকটে পড়েছে হাজারো পরিবার। বিশেষ করে শিশুদের পুষ্টিকর খাবার জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছেন অভিভাবকেরা। পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় শিশুদের অপুষ্টি বাড়ার আশঙ্কা করছেন চিকিৎসক ও মানবিক সহায়তা সংস্থার কর্মীরা।
গাজা সিটির পশ্চিমাঞ্চলে তাঁবুতে পাঁচ মেয়েকে নিয়ে বসবাস করেন ৩০ বছর বয়সী হুদা আবু লেইলা। যুদ্ধের কারণে আহত হওয়ায় তাঁর স্বামী এখন আর কাজ করতে পারেন না। অন্যের জন্য রুটি তৈরি করে সামান্য আয় করেন হুদা। সেই আয়ে পাঁচ মেয়ের খাবারের ব্যবস্থা করাই কঠিন হয়ে পড়েছে তাঁর জন্য।
ইসরায়েল চলতি মাসের শুরুতে গাজায় পণ্য প্রবেশ সীমিত করার পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। কয়েক মাস পর এই সপ্তাহে মেয়েদের সকালের নাশতায় শুধু চা ও রুটি দিতে হয়েছে হুদাকে। ডিম ও দুধের মতো প্রয়োজনীয় খাবার বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না, পাওয়া গেলেও দাম নাগালের বাইরে।
হুদা বলেন, ‘আমরা সঙ্গে সঙ্গেই এর প্রভাব টের পেয়েছি। ডিম বা দুধ পাওয়া যাচ্ছিল না। আর আমাদের কাছে বেশি করে খাবার কিনে রাখার মতো টাকাও নেই।’
কোনো দিন টিনজাত শিমের সঙ্গে স্থানীয় মসলা বা জা’তার দিয়ে খাবার খান তাঁরা। খাবারের সংকট বাড়লে চায়ে রুটি ডুবিয়ে খেয়েই দিন পার করতে হয়। এতে মেয়েদের স্বাস্থ্যের ওপর কী প্রভাব পড়বে, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হুদা। তাঁর বড় মেয়ে সালমার শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় গাজা সিটির আল-রানতিসি হাসপাতালে তার চিকিৎসা চলছে। চিকিৎসক মেয়ের পুষ্টিকর খাবারের দিকে নজর দিতে বলেছেন।
হুদার ভাষ্য, পুষ্টিকর খাবারের অভাবে তাঁর মেয়েরা পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারছে না। প্রায়ই মাথা ঘোরানো ও ক্লান্তিতে ভুগছে তারা।
কমেছে খাদ্যসহায়তা
গত ১৪ অক্টোবর গাজায় বাণিজ্যিক পণ্য প্রবেশ বন্ধ করে দেয় ইসরায়েল। এতে খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হয়। পণ্যবাহী প্রতিটি ট্রাক গাজায় প্রবেশ করাতে ব্যবসায়ীদের ১০ হাজার ইসরায়েলি শেকেল দেওয়ার দাবি নিয়ে বিরোধের জেরে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
১৯ অক্টোবর ইসরায়েল জানায়, ধীরে ধীরে বাণিজ্যিক পণ্য প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে। গাজায় ত্রাণ ও বাণিজ্যিক পণ্য প্রবেশ সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা ইসরায়েলি সামরিক সংস্থা কো-অর্ডিনেটর অব গভর্নমেন্ট অ্যাকটিভিটিজ ইন দ্য টেরিটরিজ (কোগাট) জানায়, ব্যবসায়ীরা তাদের জানিয়েছেন, হামাস ওই অর্থ দেওয়ার দাবি প্রত্যাহার করেছে। তবে হামাসের দাবি, যুদ্ধকবলিত মানুষের সহায়তার জন্য গঠিত তহবিলে এটি স্বেচ্ছায় দেওয়া অনুদান।
এদিকে অর্থের অভাবে গাজায় খাদ্যসহায়তা কমানোর ঘোষণা দিয়েছে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি)। ১৯ অক্টোবর সংস্থাটি জানায়, সেপ্টেম্বরে যেখানে ১৬ লাখ মানুষকে সহায়তা দেওয়া হয়েছিল, অক্টোবরে তা কমিয়ে ১১ লাখে নামানো হয়েছে।
একই সঙ্গে খাদ্যসহায়তার পরিমাণও অর্ধেক করা হয়েছে। আগে পরিবারগুলোকে দুটি খাদ্যপ্যাকেট দেওয়া হলেও এখন দেওয়া হচ্ছে একটি প্যাকেট ও তুলনামূলক কম পরিমাণ গমের আটা। প্রতিদিন গরম খাবার বিতরণের সংখ্যাও আড়াই লাখ থেকে কমিয়ে দেড় লাখ করা হয়েছে।
ডব্লিউএফপির তথ্য অনুযায়ী, গাজার প্রায় ১৪ লাখ মানুষ—মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ—সংকটজনক বা তার চেয়েও গুরুতর মাত্রার খাদ্য অনিরাপত্তায় রয়েছে।
অপুষ্টির ঝুঁকিতে আরও বেশি শিশু
গাজায় বাস্তুচ্যুত ৪০ বছর বয়সী রাইদা সোবোহ তাঁর নয় সদস্যের পরিবারকে নিয়ে চরম খাদ্যসংকটে দিন কাটাচ্ছেন। উত্তর গাজার বেইত লাহিয়া থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে এখন গাজা সিটিতে বসবাস করছেন তিনি। পরিবারের খাবারের জন্য দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় কমিউনিটি রান্নাঘর বা ‘তেক্কিয়া’র ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে তাঁকে।
রাইদা বলেন, রান্নাঘরে খাবার থাকলে তাঁরা সেখান থেকে খাবার পান। তাঁর সন্তানদের সকালে সাধারণত চা দেওয়া হয়। দুপুরে কমিউনিটি রান্নাঘর থেকে খাবার পাওয়া গেলে তা খায়। রাতে কখনো ফালাফেল, ভাত, ডাল বা পাস্তা জোটে। তবে প্রায় আট মাস ধরে তাঁদের খাদ্যতালিকায় দুধ, মাংস, ডিম ও পনির নেই। প্রায় এক মাস আগে শেষবারের মতো সবজি কিনেছিলেন তিনি।
জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয়বিষয়ক দপ্তর (ওসিএইচএ) জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরে গাজায় অপুষ্টির চিকিৎসার জন্য ২ হাজার ৮০০-এর বেশি শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৩৬০ জনের বেশি ছিল তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত। গত ১৯ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সংস্থাটি জানায়, ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী প্রায় তিন হাজার শিশুকে প্রতি মাসে অপুষ্টির চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
এ ছাড়া আগস্টে প্রকাশিত ইউনিসেফ-সমর্থিত এক পুষ্টি জরিপে দেখা গেছে, জরিপকারীদের প্রবেশাধিকার থাকা এলাকাগুলোতে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ১২ দশমিক ২ শতাংশ খর্বাকৃতির সমস্যায় ভুগছে। দীর্ঘদিনের অপুষ্টি ও স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হলে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়।
গাজা সিটির শিশু বিশেষজ্ঞ ও পুষ্টিবিদ ডা. মোহাম্মদ বি আলরাই সতর্ক করে বলেছেন, গাজায় খাদ্য সরবরাহে দীর্ঘস্থায়ী বিধিনিষেধ শিশুদের অপুষ্টির পরিস্থিতি আরও খারাপ করতে পারে। সুষম খাবার না পাওয়ায় শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও সুস্থ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
তাঁর মতে, দুর্ভিক্ষের আগের পরিস্থিতির তুলনায় কিছুটা উন্নতি হলেও হাসপাতালগুলোতে মাঝারি ও তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশু আসছে। পাঁচ বছরের কম বয়সীদের পাশাপাশি ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুরাও আক্রান্ত হচ্ছে।
আলরাই জানান, কিছু শিশুর তীব্র অপুষ্টির পাশাপাশি পা ফুলে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, যা শরীরে প্রোটিনের মারাত্মক ঘাটতির সঙ্গে সম্পর্কিত। পর্যাপ্ত প্রোটিন না পেয়ে শুধু শর্করানির্ভর একটি খাবার খেয়ে দিন কাটানো পরিবারগুলোর শিশুদের মধ্যে এ সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘সীমান্ত ক্রসিংগুলো খোলা থাকা অবস্থায়ও আমরা এমন রোগী পেয়েছি। অপুষ্টি থেকে সেরে উঠতে শিশুদের এক-দুই মাস যথেষ্ট নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তিন থেকে ছয় মাস লাগে। পরিস্থিতি এভাবে চলতে থাকলে অপুষ্টির রোগী আরও বাড়বে।’
রাইদা সোবোহও তাঁর সন্তানদের দুর্বল হয়ে পড়ার কথা জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, শিশুরা দিনের বেশির ভাগ সময় ঘুমিয়ে কাটায় এবং সামান্য কাজ করলেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। পরিবারের নির্ভরযোগ্য কোনো আয়ের উৎস নেই। তাঁরা যে এলাকায় থাকেন, সেটি আনুষ্ঠানিক শরণার্থীশিবির হিসেবে স্বীকৃত নয়। ফলে কিছু শিবিরের বাসিন্দারা যে সহায়তার কুপন ও স্বাস্থ্যবিধিসামগ্রী পান, তা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন তাঁরা।
রাইদা বলেন, ‘আমি আশা করি, কেউ আমাদের সাহায্য করবে এবং এই কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়াবে। যুদ্ধ শেষ হোক, পরিস্থিতির উন্নতি হোক এবং সীমান্ত ক্রসিংগুলো খুলে দেওয়া হোক, যাতে পণ্যের দাম কমে আসে।’
সূত্র: আল জাজিরা
এমএস/
