ফুটবলের মাঠে হলুদ কার্ড কিংবা লাল কার্ড দেখানোর দৃশ্যটি দর্শকদের কাছে বেশ পরিচিত! রেফারির পকেট থেকে কার্ড বের করা, খেলোয়াড়ের সামনে সেটি উঁচিয়ে ধরা-কখনো প্রতিবাদ, কখনো বিস্ময়, কখনো উত্তেজনা। কয়েক দশক ধরে এই দৃশ্য ফুটবলের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু সেই চেনা ছবিতেই এবার প্রযুক্তির নতুন সংযোজন। রেফারির হাতে কাগজের কার্ডের বদলে দেখা গেল মোবাইল ফোনের মতো দেখতে একটি ইলেকট্রনিক যন্ত্র। প্রশ্ন উঠেছে, ফুটবল কি তাহলে ধীরে ধীরে প্রবেশ করছে কার্ড দেখানোর ডিজিটাল যুগে?
ঘটনাটি উরুগুয়ের। গত বৃহস্পতিবার উরুগুয়ে কাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল ন্যাসিওনাল ও রেনতিস্তাস। ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্বে থাকা রেফারি এদুয়ার্দো ভারেলা এক খেলোয়াড়কে সতর্ক করতে পরিচিত হলুদ কার্ডের পরিবর্তে তুলে ধরেন একটি ডিজিটাল ডিভাইস। মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে দৃশ্যটি। কেউ একে ফুটবলের ভবিষ্যৎ বলছেন, কেউ আবার প্রশ্ন তুলছেন, এত দিনের ঐতিহ্যবাহী কার্ড দেখানোর রীতির কি এবার পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে?
আপাতদৃষ্টিতে নতুন যন্ত্রটি কার্ড দেখানোর বিকল্প মনে হলেও এর উদ্দেশ্য আরও বিস্তৃত। মূলত রেফারিদের প্রশাসনিক কাজ সহজ করতেই এই উদ্যোগ। এত দিন মাঠে কোনো খেলোয়াড়কে হলুদ কিংবা লাল কার্ড দেখানোর পর রেফারিকে সেটি নিজের নোটবুকে লিখে রাখতে হতো। ম্যাচ শেষে সেই তথ্য আবার ডিজিটাল ব্যবস্থায় সংরক্ষণ করতে হতো। একই তথ্য দুবার নথিভুক্ত করার এই প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ এবং বাড়তি কাজেরও। নতুন ডিভাইসটি সেই ঝামেলা কমানোর লক্ষ্যেই তৈরি।
প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘রেফে’র উদ্যোগে চালু হয়েছে পরীক্ষামূলক এই ব্যবস্থা। প্রকল্পটির পরিচালক মাউরো সাকো ও তার সহযোগী ডিয়েগো দে লা পেনার মাথায় ধারণাটি আসে তিন বছরেরও বেশি আগে। একদিন বৃষ্টির মধ্যে ফুটবল ম্যাচ দেখতে গিয়ে তারা ভাবছিলেন, মাঠে রেফারিরা এখনো কেন হাতে লিখে শাস্তিমূলক সিদ্ধান্তের তথ্য সংরক্ষণ করেন। সেই ভাবনা থেকেই প্রচলিত ব্যবস্থাকে ডিজিটাল করার পরিকল্পনা।
নতুন যন্ত্রটিতে রয়েছে একাধিক বোতাম। নির্দিষ্ট বোতাম চাপলেই স্ক্রিনে হলুদ কিংবা লাল কার্ড দেখা যায়। শুধু কার্ড প্রদর্শনই নয়, এর মাধ্যমে ম্যাচের বিভিন্ন ঘটনা নির্দিষ্ট সময়সহ স্বয়ংক্রিয়ভাবে রেকর্ড হয়। ফলে রেফারিকে আলাদা করে নোট নেওয়া কিংবা পরে কম্পিউটারে তথ্য টাইপ করার প্রয়োজন পড়ে না। তথ্যগুলো সরাসরি উরুগুয়ে ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের ‘কমেট’ প্ল্যাটফর্মে পাঠানোর উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে ব্যবস্থা।
ডিভাইসটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, এটি ব্যবহারের জন্য ওয়াইফাই সংযোগের প্রয়োজন হয় না। ভবিষ্যতে খেলোয়াড় পরিবর্তন, পেনাল্টিসহ ম্যাচের অন্যান্য ঘটনাও এর মাধ্যমে নথিভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এমনকি এসব তথ্য সরাসরি সংবাদমাধ্যমে পাঠানোর সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছেন উদ্যোক্তারা। কেবল কার্ড দেখানো নয়, ম্যাচের তথ্য ব্যবস্থাপনাতেও বড় পরিবর্তন আনতে পারে এই প্রযুক্তি।
প্রথম পরীক্ষায় অবশ্য ইতিবাচক অভিজ্ঞতার পাশাপাশি কিছু সীমাবদ্ধতাও সামনে এসেছে। রেফারি ভারেলার কাছে যন্ত্রটি ব্যবহার করা আরামদায়ক মনে হয়েছে। এর সফটওয়্যারও দ্রুত কাজ করে। তবে পুরোনো পদ্ধতিতে কার্ড দেখানোর যে নাটকীয়তা, নতুন ব্যবস্থায় সেটি কিছুটা অনুপস্থিত বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, দ্রুত কার্ড দেখানোর চিরচেনা জাদুকরি মুহূর্তটি কিছুটা হারিয়ে গেলেও প্রশাসনিক কাজে এটি রেফারিদের যথেষ্ট সহায়তা করবে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা এখনো দৃশ্যমানতা। এর আগের একটি পরীক্ষায় সূর্যের আলোয় স্ক্রিনের রং স্পষ্ট দেখা না যাওয়ায় উদ্যোগটি বাতিল করতে হয়েছিল। বৃহস্পতিবারের ম্যাচেও স্টেডিয়ামের দর্শক ও টেলিভিশনের সামনে থাকা দর্শকদের অনেকে বুঝতে পারেননি, রেফারি আসলে কোন রঙের কার্ড দেখিয়েছেন। অথচ ফুটবলে কার্ডের রং শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, সেটিই খেলোয়াড়ের শাস্তির ধরন বুঝিয়ে দেয়।
এ সমস্যা কাটাতে ডিভাইসটির চারপাশে এলইডি আলো সংযোজনসহ বিভিন্ন পরিবর্তন নিয়ে কাজ করছেন নির্মাতারা। প্রকল্পটির সহযোগী পরিচালক দে লা পেনার মতে, হলুদ কার্ডকে হলুদ এবং লাল কার্ডকে লাল হিসেবেই স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হতে হবে। মাঠের গ্যালারি থেকে শুরু করে টেলিভিশনের পর্দা-সব জায়গার দর্শকের কাছে সিদ্ধান্তটি পরিষ্কার হওয়া জরুরি!
নতুন প্রযুক্তি নিয়ে অনলাইনেও তৈরি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কেউ বিষয়টিকে ফুটবলের আধুনিকায়নের স্বাভাবিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ প্রচলিত কার্ডের জায়গায় মোবাইলসদৃশ যন্ত্রের ব্যবহার নিয়ে মজা করছেন। এমনকি এ নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা মিমও। তবে নেতিবাচক মন্তব্যকে খুব একটা গুরুত্ব দিতে চান না উদ্যোক্তারা। তাদের বিশ্বাস, নতুন কোনো উদ্ভাবন প্রতিষ্ঠিত হতে সময় লাগে।
‘রেফে’ ইতিমধ্যে তাদের ব্র্যান্ড নিবন্ধন করেছে এবং ডিভাইসটির হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যারের পেটেন্ট নিয়েছে। প্রকল্পটির ডেভেলপমেন্ট কার্যক্রমের ভিত্তি চীনে। এখন তাদের লক্ষ্য প্রযুক্তিটিকে আরও উন্নত ও পরিশীলিত করা। ভবিষ্যতে দক্ষিণ আমেরিকা ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা কনমেবল এবং আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থা ফিফার স্বীকৃতি পাওয়ার প্রত্যাশাও রয়েছে তাদের।
তবে এই একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ দেখেই ফুটবলের চিরচেনা হলুদ-লাল কার্ডের দিন শেষ হয়ে যাচ্ছে, এমনটা ভাবার সুযোগ নেই। বরং রেফারির প্রশাসনিক কাজকে প্রযুক্তিনির্ভর করার একটি প্রচেষ্টা হিসেবেই আপাতত একে দেখা যেতে পারে। ফুটবলে প্রযুক্তির ব্যবহার নতুন নয়; ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) থেকে গোললাইন প্রযুক্তি-বিভিন্ন পর্যায়ে এর প্রয়োগ হয়েছে। এবার সেই প্রযুক্তির ছোঁয়া লাগতে যাচ্ছে রেফারির পকেটের কার্ডেও!
