• গত ১৮ সেপ্টেম্বর লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার একটি জঙ্গল থেকে লাশ উদ্ধার।
• তিনজন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
• পুলিশের কাছে অনুরোধ, দ্রুত চার্জশিট দেওয়া হোক: বাবা
• মামলাটি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি, শিগগির চার্জশিট দেব: তদন্ত কর্মকর্তা
দেলোয়ার হোসাইন আকাইদ, কুমিল্লা
আপডেট :
১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৬: ২৯

এক মাস আগে হারানো ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যার বিচার শুরুর অপেক্ষায় দিন কাটছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নাহিদা বেগম ও তাঁর পরিবারের। আসামিরা গ্রেপ্তার হয়েছেন, তিনজন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন। তবু জমা পড়েনি অভিযোগপত্র। সন্তান হারানোর শোকের সঙ্গে এখন স্বজনদের
তাড়া করছে বিচার পাওয়ার অপেক্ষা। যদিও পুলিশ বলছে, মামলাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই ও বিশ্লেষণ শেষে শিগগির আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হবে।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে কুমিল্লার কোটবাড়ি গন্ধমতী এলাকার বাসা থেকে মায়ের আইফোন নিয়ে
ছবি তুলতে বের হয় অপ্রতিম।
পরদিন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের অদূরে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার একটি জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই রাতেই অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন তার বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার।
ফিরোজ শাহরিয়ার বলেন, ‘অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের এক মাস পার হয়েছে। আসামিরা গ্রেপ্তার হয়েছে, তাদের মধ্যে তিনজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন। এরপরও চার্জশিট দিতে দেরি হচ্ছে কেন, তা বুঝতে পারছি না। পুলিশ তখন এক মাসের মধ্যে চার্জশিট দেওয়ার কথা বলেছিল। আমি পুলিশের কাছে অনুরোধ করব, দ্রুত চার্জশিট দেওয়া হোক।’
ফিরোজ শাহরিয়ার আরও বলেন, ‘মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে অনুরোধ, ঘটনার সব রহস্য উদ্ঘাটন করে দ্রুত চার্জশিট দিন। তদন্তে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব তথ্য
যেন উঠে আসে। আমরা প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে দ্রুত বিচার চাই।’
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সদর দক্ষিণ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) রাজিব আহমেদ বলেন, ‘অপ্রতিম হত্যা মামলাটি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। মামলার তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই ও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। আমরা কাজ করছি, শিগগির চার্জশিট দেব।’
মামলার নথি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার চার আসামির মধ্যে তিনজন আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে দুজন অপ্রাপ্তবয়স্ক। গত ২০ সেপ্টেম্বর কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের ১ নম্বর আমলি আদালতের বিচারক আবিদা সুলতানা মলির কাছে জবানবন্দি দেন সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯) এবং ১৬ ও ১৫ বছর বয়সী দুই কিশোর। অপর আসামি সিয়াম (১৮) স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেননি।
জবানবন্দিতে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, অপ্রতিমের ব্যবহৃত আইফোন নেওয়ার উদ্দেশ্যে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তবে হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্য কোনো কারণ বা ব্যক্তি জড়িত ছিলেন কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তুহিনের সঙ্গে অপ্রতিমের পাঁচ-ছয় মাস ধরে পরিচয় ছিল। সিয়ামের মোটরসাইকেলে ঘুরে ছবি তোলা ও টিকটক ভিডিও তৈরির জন্য অপ্রতিম তাদের সঙ্গে বের হতো। অপ্রতিমের আইফোনের প্রতি তুহিন ও সিয়ামের আগ্রহ ছিল।
জবানবন্দি অনুযায়ী, ঘটনার আগে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে তুহিন ও সিয়ামের দেখা হয়। সেখানে অপ্রতিমের আইফোন নেওয়া এবং তাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় বলে তুহিনের জবানবন্দিতে উঠে এসেছে। পরে টিকটকের মাধ্যমে যোগাযোগ করে অপ্রতিমের সঙ্গে দেখা করার ব্যবস্থা করা হয়। ঘটনার দিন বেলা ২টার পর কোটবাড়ির বোর্ড মার্কেট এলাকায় অপ্রতিমের সঙ্গে ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরের দেখা হয়। পরে সে তার ১৫ বছর বয়সী বন্ধুকে নিয়ে অপ্রতিমকে লালমাই পাহাড়ের দিকে নিয়ে যায়। জবানবন্দির বর্ণনা অনুযায়ী, আইফোন নেওয়ার পর তা তুহিনের হাতে দেওয়া হয়। ফোন নেওয়াকে কেন্দ্র করে অপ্রতিমের সঙ্গে তুহিনের কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে অপ্রতিমকে মারধর করা হয়। ফোনটি বিক্রি করে পাওয়া অর্থ দুই কিশোরকে ভাগ দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল।
২০ সেপ্টেম্বর কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান সংবাদ সম্মেলনে জানান, অপ্রতিমের মায়ের আইফোন নেওয়ার উদ্দেশ্যে তাকে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার নির্জন জঙ্গলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। মোবাইল ফোনটি নেওয়ার সময় বাধা দিলে তাকে বাঁশের লাঠি দিয়ে আঘাত করা হয়। এতে তার মৃত্যু হয়। ওই সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার দ্রুত অভিযোগপত্র দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন।

