রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার পশ্চিম ঝিকরা গ্রামের কর্মকারপাড়ায় একই আঙিনায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে মসজিদ ও মন্দির। একদিকে ভেসে আসে আজানের ধ্বনি, অন্যদিকে শোনা যায় পূজার শঙ্খধ্বনি। উপাসনালয় দুটি আলাদা, ধর্মীয় বিশ্বাসও ভিন্ন; কিন্তু মানুষে মানুষে নেই বিভেদের দেয়াল। ঈদে মুসলিম প্রতিবেশীর বাড়িতে যান হিন্দু পরিবারের সদস্যরা, পূজায় পাশে দাঁড়ান মুসলিম যুবকরা। উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি থেকে শুরু করে বিপদে-আপদে সহযোগিতা- সবখানেই তাদের পরিচয়, তারা একই গ্রামের মানুষ।
ধর্মীয় বিভাজনের নানা আলোচনা যখন সমাজে ঘুরেফিরে আসে, তখন পশ্চিম ঝিকরার এই সহাবস্থান যেন ভিন্ন এক বার্তা দেয়। এখানে সম্প্রীতি কেবল মুখের কথা নয়; পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বন্ধুত্ব আর দৈনন্দিন জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে তা হয়ে উঠেছে সামাজিক সংস্কৃতি।
সরেজমিনে দেখা যায়, কর্মকারপাড়ায় একই আঙিনায় অবস্থিত কালী মন্দির ও পশ্চিম ঝিকরা জামে মসজিদ। পাশাপাশি দুটি উপাসনালয় থাকলেও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন নিয়ে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরোধের কোনো নজিরের কথা জানাননি স্থানীয়রা। বরং একে অপরের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বজায় রেখেছেন শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০০৫-০৬ সালের দিকে কর্মকারপাড়ায় কালী মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর সেখানে শারদীয় দুর্গোৎসব, কালীপূজাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান হয়ে আসছে। পরে ২০২১ সালে মন্দিরের পাশের জায়গায় স্থানীয়দের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় পশ্চিম ঝিকরা জামে মসজিদ। একই আঙিনায় দুই উপাসনালয় গড়ে ওঠার পর শুরুতে কারও কারও মনে কিছুটা শঙ্কা থাকলেও সময়ের সঙ্গে তা কেটে যায়। পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সহযোগিতায় গড়ে ওঠে দুই সম্প্রদায়ের মানুষের নিবিড় সম্পর্ক।
মন্দির কমিটির সভাপতি উত্তম কর্মকার বলেন, এই মন্দিরে দুই দশকের বেশি সময় ধরে পূজা হয়ে আসছে। পাশে মসজিদ হওয়ার পর প্রথমে ভেবেছিলাম, কোনো সমস্যা হবে কি না। কিন্তু কখনো কোনো সমস্যা হয়নি। আজানের সময় আমরা মাইকের শব্দ বন্ধ রাখি। আমরাও চাই, সবাই যার যার ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান শান্তিপূর্ণভাবে পালন করুক। মুসলিম ভাইদের সঙ্গে আমাদের কখনো দ্বন্দ্ব হয়নি।
মন্দিরের সভাপতি উত্তম কর্মকারের সঙ্গে মসজিদ কমিটির সভাপতি মো. মুশফিকুর রহমানের বন্ধুত্ব এই সম্প্রীতিরই একটি উদাহরণ। ধর্মীয় পরিচয় আলাদা হলেও তাদের সম্পর্কের মধ্যে নেই দূরত্ব।
মুশফিকুর রহমান বলেন, আমি মসজিদের সভাপতি, আর আমার বন্ধু উত্তম কর্মকার মন্দিরের সভাপতি। আমরা আলাদা ধর্মের হলেও একসঙ্গে আড্ডা দিই, একে অপরের দাওয়াতে যাই। ঈদে তারা আসেন, পূজায় আমরাও যাই। দিন শেষে আমরা সবাই একই গ্রামের মানুষ। এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয়।
শুধু ব্যক্তিগত বন্ধুত্বেই সীমাবদ্ধ নয় এই সম্প্রীতি; ধর্মীয় উৎসবেও এর প্রতিফলন ঘটে। স্থানীয়দের ভাষ্য, দুর্গাপূজার সময় মুসলিম যুবকেরা মন্দিরের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় সহযোগিতা করেন। একইভাবে ঈদের সময় হিন্দু যুবকেরাও মসজিদসংলগ্ন এলাকায় মানুষের চলাচল ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সহায়তা করেন। এক সম্প্রদায়ের আনন্দে অন্য সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ তাদের কাছে ব্যতিক্রমী কোনো ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিনের সামাজিক বন্ধনেরই প্রকাশ।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, ধর্মীয় পরিচয় মানুষের বিশ্বাসের অংশ হলেও প্রতিবেশী হিসেবে একে অপরের পাশে থাকা আরও বড় সামাজিক দায়িত্ব। সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি, পারিবারিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ এবং প্রয়োজনে সহযোগিতার মধ্য দিয়ে তারা এই সম্পর্ক ধরে রেখেছেন। তাদের কাছে সম্প্রীতির অর্থ শুধু পাশাপাশি বসবাস নয়; বরং ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষের অধিকার ও অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা।
চারঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, পশ্চিম ঝিকরার কর্মকারপাড়ার এই চিত্র সারাদেশের জন্য একটি উদাহরণ। উৎসব কখনো একা পালন করা যায় না। সবার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণেই উৎসব সুন্দর হয়। এখানকার মানুষ তা প্রমাণ করেছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই সম্প্রীতি অটুট রাখতে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।
স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য, সময়ের সঙ্গে সমাজে নানা মতপার্থক্য তৈরি হলেও পশ্চিম ঝিকরায় ধর্ম মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। বরং দীর্ঘদিনের আন্তরিকতা ও সহযোগিতার মধ্য দিয়ে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে তৈরি হয়েছে আস্থার বন্ধন।
