তাহমিনা তানাকা। জন্ম ও বেড়ে ওঠা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর বর্তমানে ক্যামব্রিয়ান স্কুল অ্যান্ড কলেজে ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বিষয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। শিক্ষা ও শিক্ষাঙ্গনের নানা দিক নিয়ে বণিক বার্তার নিয়মিত আয়োজন ‘শিক্ষালয়’-এ কথা বলেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবিদিন ইব্রাহিম
শিশুর জীবনের ভিত্তি গঠনে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রাথমিক পর্যায়ে শিশুদের পাঠদান করতে গিয়ে আপনারা কী ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন?
প্রাথমিক পর্যায়ে শিশুদের পাঠদান করতে গিয়ে আমাদের সবচেয়ে বড় যে সমস্যাটির মুখোমুখি হতে হয়, তা হলো শিক্ষার্থীদের শিখনপ্রস্তুতিতে অসমতা। প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি হওয়ার সময় একজন শিশুর যে ধরনের প্রাথমিক জ্ঞান ও দক্ষতা থাকার কথা, অনেকেরই তা থাকে না। পরিবারই শিশুর প্রথম শিক্ষালয়। ফলে কেউ পরিবার থেকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে আসে, আবার কেউ তা নিয়ে আসে না। এতে একই শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থীদের শিখন-দক্ষতার মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়, যা সামাল দেয়া আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
এক্ষেত্রে তুলনামূলক পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের আমরা আলাদাভাবে সহায়তা করি। প্রয়োজনে স্কুল ছুটির পর অতিরিক্ত সময় দিয়ে তাদের শেখার ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করা হয়। এভাবে ধীরে ধীরে তারা অন্যদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে।
আপনি একটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করছেন। বেসরকারি স্কুলগুলোর প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো কী বলে মনে করেন? মানসম্মত শিক্ষার্থী পাওয়া, নাকি কারিকুলাম—কোনটি বেশি কঠিন?
বেসরকারি স্কুলগুলোর ক্ষেত্রে মানসম্মত শিক্ষার্থী পাওয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তুলনামূলক মেধাবী শিক্ষার্থীদের অনেক অভিভাবকই বেসরকারি স্কুলের উচ্চ বেতন ও টিউশন ফি বহন করতে আগ্রহী হন না। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানে ভালো মানের শিক্ষার্থী আকৃষ্ট করা কিছুটা কঠিন হয়ে পড়ে।
অনেক দেশে দেখা যায়, স্কুলেই শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও বাড়ির কাজের বড় অংশ শেষ করা হয়। বিপরীতে বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত বাড়ির কাজের চাপের অভিযোগ রয়েছে। আপনাদের প্রতিষ্ঠানে পাঠদান ও বাড়ির কাজের বিষয়টি কীভাবে পরিচালিত হয়?
আমাদের স্কুলে এ বিষয়ে কঠোর তদারকি ব্যবস্থা রয়েছে। অধ্যক্ষ কিংবা প্রধান কার্যালয় থেকে নিয়মিত পাঠদান ও বাড়ির কাজের পরিমাণ পর্যবেক্ষণ করা হয়। কোনো দিন বাড়ির কাজের চাপ বেশি হয়ে গেলে তা সংশোধনের জন্য দ্রুত নির্দেশনা দেয়া হয়। আমাদের স্কুলের অভিভাবকরাও এ বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন।
এছাড়া শিক্ষাবর্ষ চার ধাপে মূল্যায়ন করা হয়—ইভ্যালুয়েশন-১, ইভ্যালুয়েশন-২, প্রথম সামষ্টিক মূল্যায়ন ও বার্ষিক মূল্যায়ন। এসব মূল্যায়নের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সিলেবাস ভাগ করা থাকে। ফলে নির্দিষ্ট কোনো অধ্যায় বা বিষয় শেষ করতে গিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে না। আমরা ক্লাসে পড়া শেষ করার চেষ্টা করি। যারা পারে না তাদেরকে ক্লাস শেষে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়।
একটি আদর্শ শ্রেণীকক্ষে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত কেমন হওয়া উচিত? আপনাদের প্রতিষ্ঠানে এক্ষেত্রে কী ধরনের চর্চা রয়েছে?
বিষয়টি মূলত শ্রেণীকক্ষে পাঠদানের সময় ও ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সাধারণত প্রতিটি ক্লাসের সময় ২৫ থেকে ৪০ মিনিটের মতো হয়ে থাকে। এত অল্প সময়ে একজন শিক্ষককে পাঠদান, শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখা এবং সবার শেখা নিশ্চিত করতে হয়। ফলে শিক্ষক শ্রেণীকক্ষে প্রবেশ করে পাঠদান শুরু করতেই বেশকিছুটা সময় চলে যায়।
শ্রেণীকক্ষের স্থায়িত্বের কথা বলছিলেন। সেক্ষেত্রে একটি আদর্শ শ্রেণীকক্ষে কতজন শিক্ষার্থী থাকা উচিত বলে মনে করেন?
ক্লাসের সময় যদি তুলনামূলক বেশি হয়, যেমন ৫০ থেকে ৫৫ মিনিট, তাহলে ২৫ থেকে ৩০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে পাঠদান করা সম্ভব। তবে আমাদের স্কুলে সাধারণত প্রতি শ্রেণীতে ১৫ থেকে ২০ জন শিক্ষার্থী থাকে। বিশেষ ক্ষেত্রে এ সংখ্যা ২২ থেকে ২৫ জন পর্যন্ত হতে পারে।
স্কুলপর্যায়ের শিক্ষকদের বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। শিক্ষকতার ক্ষেত্রে শিশুমনস্তত্ত্ব বা মনোবিজ্ঞানের জ্ঞান কতটা জরুরি বলে মনে করেন? আপনি নিজেও কি ধরনের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন?
আমার মতে, একজন শিক্ষককে একই সঙ্গে ভালো মনোবিজ্ঞানীও হতে হবে। মাধ্যমিক পর্যায়ে অনেক শিক্ষার্থীই বলে, তাদের কোনো কিছু ভালো লাগে না, আবার অনেকে মোবাইল ফোনে আসক্ত হয়ে পড়ছে। ক্লাসরুমে একজন শিক্ষক কঠোর হতে পারেন কিন্তু করিডোরে যদি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দেখা হয় তখন বন্ধুত্বপূর্ণ হতে হবে। প্রয়োজনে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে চা খাওয়া বা আড্ডা দেয়াও যেতে পারে। দেখা গেছে, ক্লাসের বাইরে কোনো শিক্ষার্থী শিক্ষকের সঙ্গে মন খুলে কথা বলছে, তার সমস্যার কথা জানাচ্ছে। এতে শিক্ষার্থী অনুযায়ী সমস্যা সমাধানের কথা চিন্তা করতে পারেন ওই শিক্ষক।
আমাদের কেমব্রিয়ান স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষার্থীদের মনস্তত্ত্ব ও পাঠদান পদ্ধতি (পেডাগজি) বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের বুঝতে এবং কার্যকরভাবে পাঠদান করতে এসব প্রশিক্ষণ আমাদের অনেক সহায়তা করে।
শ্রেণীকক্ষে দলগত কাজের মাধ্যমে জটিল বিষয়গুলো সহজভাবে বোঝানোর ক্ষেত্রে আপনাদের পদ্ধতি কেমন?
আমাদের পাঠদান পদ্ধতিতে দলগত কাজের সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা রয়েছে। শিক্ষার্থীদের চার-পাঁচজনের ছোট ছোট দলে ভাগ করে দেয়া হয় এবং প্রতিটি দলের জন্য একজন দলনেতা নির্ধারণ করা হয়। দলনেতার নেতৃত্বে শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা করে। পরে তারা আলোচনার ফলাফল শ্রেণীকক্ষে উপস্থাপন করে।
তবে বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়ের মতো বিষয়ে বিভিন্ন সাল, ব্যক্তি ও ঐতিহাসিক ঘটনা মনে রাখার ক্ষেত্রে অনেক শিক্ষার্থীর অনীহা দেখা যায়। দিনের শেষভাগে, বিশেষ করে দুপুর ১২টা বা দেড়টার পর, শিক্ষার্থীরা আরো ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় বাস্তব উদাহরণ, দলগত কাজসহ বিভিন্ন কৌশল প্রয়োগ করে বিষয়গুলো তাদের কাছে সহজবোধ্য করে তোলার চেষ্টা করি।
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কলেজ পর্যায় পর্যন্ত পড়াশোনা করেও বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জ্ঞান ও দক্ষতা সপ্তম শ্রেণীর সমান। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার এ ঘাটতি দূর করতে কোন সমস্যাগুলোর সমাধান সবচেয়ে জরুরি বলে মনে করেন?
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার মান টেকসইভাবে উন্নত করতে হলে প্রথমেই শিক্ষার্থীদের মনস্তত্ত্ব বুঝতে হবে। সব শিক্ষার্থীর শেখার ধরন, আগ্রহ ও সক্ষমতা এক নয়। তাই তাদের প্রয়োজন ও সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে পাঠদান পদ্ধতি ও শিক্ষণকৌশল নির্ধারণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রাথমিক পর্যায়ে পাঠ্যবইয়ের বিষয়গুলো শেষ করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা সেগুলো ঠিকমতো বুঝতে পারছে কিনা, নিজেরা প্রয়োগ করতে পারছে কিনা, তা নিশ্চিত করা জরুরি। অনেক সময় দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা যোগ-বিয়োগ বা ভাগের নিয়ম না বুঝেই মুখস্থ করে ফেলে। এতে হয়তো পরীক্ষায় পাস করে কিন্তু বিষয়টি সম্পর্কে প্রকৃত ধারণা তৈরি হয় না। তাই মুখস্থনির্ভরতার পরিবর্তে বিষয় বুঝে শেখার ওপর গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।
দেখা গেছে, অনেকে প্রাথমিকে ভালো করার পরও মাধ্যমিকে গিয়ে খারাপ করছে, বখে যাচ্ছে। বর্তমানে বাসায় মোবাইল ফোন ও অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইসের অতিরিক্ত ব্যবহার শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে উঠছে। ছোটবেলায় বই পড়ার অভ্যাস এবং দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখার যে সক্ষমতা গড়ে ওঠার কথা, শর্টস ভিডিও ও রিলস দেখার অভ্যাসের কারণে তা ব্যাহত হতে পারে। পাশাপাশি বিভিন্ন গেমস ও ইন্টারনেটভিত্তিক বিনোদনে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করার ফলে মাধ্যমিক পর্যায়ে এসে অনেক শিক্ষার্থীর পড়াশোনার ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়। ফলে প্রাথমিক পর্যায়ে তৈরি হওয়া ভালো ভিত্তিও একসময় দুর্বল হয়ে পড়ে।
মোবাইল আসক্তি থেকে দূরে রাখতে হলে শিশুদের পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি অন্যান্য বই পড়তে উৎসাহিত করতে হবে। বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলায় অংশ নেয়ার সুযোগ করে দিতে হবে। বাবা-মা, শিক্ষকসহ সবার সম্মিলিত উদ্যোগ লাগবে।
ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্লাটফর্ম এখন শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। অনেকে অনলাইনে কোচিং করছেন, প্রাইভেট পড়ছেন; লেকচার দেখছেন। শিক্ষার্থীদের জন্য সহায়ক হিসেবে এ মাধ্যমগুলো কাজ করে নাকি এতে বিধি নিষেধ আরোপ দরকার?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইতিবাচক ও নেতিবাচক—দুই ধরনের প্রভাবই রয়েছে। শিক্ষার্থীরা অনেক সময় পড়াশোনার প্রয়োজনে মোবাইল ফোন ব্যবহার শুরু করে। যেমন শিক্ষকের দেয়া পিডিএফ বা ডায়েরির ছবি দেখার জন্য ফোন হাতে নেয়। কিন্তু পরে অন্য অ্যাপ, গেম বা ভিডিওতে চলে যায়। এভাবে পড়াশোনার জন্য ডিভাইস ব্যবহার করতে গিয়ে অনেকে অপ্রয়োজনীয় কাজে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করে।
এক্ষেত্রে অভিভাবকদের সচেতনতা ও নজরদারি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সন্তান কতক্ষণ ডিভাইস ব্যবহার করছে, কী ধরনের কনটেন্ট দেখছে এবং পড়াশোনার প্রয়োজনে ব্যবহার শেষ হওয়ার পরও ফোনে সময় কাটাচ্ছে কিনা—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের খেয়াল রাখতে হবে।
ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলোতে শিশুদের পড়াশোনা, বই পড়া ও ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহারের ভারসাম্য নিয়ে আলোচনা রয়েছে। বিভিন্ন দেশেও শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। আমাদের দেশেও শিক্ষার্থীদের বয়স ও প্রয়োজন বিবেচনায় ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের বিষয়ে সচেতনতা তৈরি এবং উপযুক্ত নীতিমালা প্রণয়ন করা প্রয়োজন। তবে প্রযুক্তি থেকে শিক্ষার্থীদের পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন না করে এর ইতিবাচক ব্যবহার নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
স্কুলপর্যায়ে ফার্স্ট, সেকেন্ড বা থার্ড হওয়ার প্রতিযোগিতা এবং শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থীদের মেধাক্রম নির্ধারণের প্রচলন রয়েছে। এ ধরনের প্রতিযোগিতা শিশুদের মানসিক বিকাশে কী প্রভাব ফেলে বলে মনে করেন?
শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয় হওয়ার প্রতিযোগিতা অনেক সময় তাদের ওপর অতিরিক্ত মানসিক চাপ তৈরি করে। এতে শেখার আনন্দের পরিবর্তে অন্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। যারা প্রত্যাশিত অবস্থানে আসতে পারে না, তাদের মধ্যে হতাশা বা আত্মবিশ্বাসের ঘাটতিও দেখা দিতে পারে।
শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করা বা অন্যদের তুলনায় এগিয়ে থাকা নয়; বরং জ্ঞান অর্জন, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ব্যক্তিত্বের বিকাশ। এক্ষেত্রে দলগত কাজ, পারস্পরিক সহযোগিতা ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ বাড়ানো জরুরি। ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে সহযোগিতা ও দলগতভাবে শেখার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়। আমাদেরও এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে শিক্ষার্থীরা একে অন্যের প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ার পরিবর্তে একে অন্যের কাছ থেকে শিখতে পারে।
মাধ্যমিক পর্যায়ে একজন শিক্ষার্থী যখন শৈশব পেরিয়ে কৈশোরে পদার্পণ করে, তখন তার শারীরিক ও মানসিক নানা পরিবর্তন ঘটে। এসব পরিবর্তন তার পড়াশোনা ও আচরণেও প্রভাব ফেলতে পারে। আপনারা বিষয়গুলো কীভাবে মোকাবেলা করেন?
সপ্তম শ্রেণী বা এ বয়সের শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনেক সময় অন্যমনস্কতা কিংবা আচরণগত পরিবর্তন দেখা যায়। এর পেছনে অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার, পারিবারিক সমস্যা কিংবা বয়ঃসন্ধিকালীন শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন—বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। তাই প্রথমেই সমস্যার প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করার চেষ্টা করি।
কারণ বুঝে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ, পরামর্শ প্রদান ও অভিভাবকসুলভ সম্পর্কের মাধ্যমে তাদের সহায়তা করা হয়। কৈশোরে আবেগীয় ও মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন স্বাভাবিক। তবে এ সময় শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা ও সহায়তা না পেলে তার প্রভাব পড়াশোনার ফলাফল ও আচরণে পড়তে পারে।
এ কারণে শিক্ষকদের শুধু পাঠদান করলেই চলে না; শিক্ষার্থীদের মানসিক অবস্থাও বুঝতে হয়। তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, সমস্যার কথা নির্দ্বিধায় বলার সুযোগ তৈরি করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক দিকনির্দেশনা দেয়া জরুরি। এক্ষেত্রে শিক্ষককে একই সঙ্গে পথপ্রদর্শক ও সহায়তাকারীর ভূমিকা পালন করতে হয়।
শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশে খেলাধুলা, সংগীতচর্চা ও অন্যান্য সহশিক্ষা কার্যক্রমের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ? এসব কার্যক্রম কীভাবে তাদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার মনোভাব গড়ে তুলতে পারে?
পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা, সংগীতচর্চা ও অন্যান্য সহশিক্ষা কার্যক্রম শিশুদের সার্বিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এসব কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা শৃঙ্খলা, পারস্পরিক সহযোগিতা ও বন্ধুত্বের মূল্য বুঝতে শেখে। খেলাধুলা তাদের নিয়ম মেনে চলা, দলগতভাবে কাজ করা এবং জয়-পরাজয়কে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করার মানসিকতা গড়ে তুলতেও সহায়তা করে।
শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান অর্জন বা পরীক্ষায় ভালো ফল করা নয়; শিক্ষার্থীদের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক বিকাশ নিশ্চিত করাও এর অংশ। তাই বিদ্যালয়ে পাঠদানের পাশাপাশি খেলাধুলা, সংগীতচর্চা ও দলগত কর্মকাণ্ডের পর্যাপ্ত সুযোগ থাকা প্রয়োজন।
শিক্ষক হিসেবে টিনএজ শিক্ষার্থীদের আবেগগত পরিবর্তন, ব্যক্তিগত সম্পর্কের প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণ কিংবা মোবাইল ফোনের ব্যবহারজনিত সমস্যাগুলো কীভাবে পর্যবেক্ষণ করেন?
বর্তমান সময়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আবেগগত টান ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার প্রবণতা নিয়ে আমাদের সচেতন থাকতে হয়। অনেক সময় দেখা যায়, ভালো ফল করার পরও নবম শ্রেণীতে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে কোনো কোনো শিক্ষার্থী পড়াশোনায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। এ ধরনের পরিবর্তনের পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। তাই শুধু ফলাফলের দিকে নজর না দিয়ে শিক্ষার্থীদের মানসিক অবস্থা ও আচরণগত পরিবর্তনও পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।
এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অভিভাবকদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পরিবারের অন্তত একজন বিশ্বস্ত সদস্যের সঙ্গে শিক্ষার্থীর এমন সম্পর্ক থাকা প্রয়োজন, যেখানে সে শ্রদ্ধা ও আস্থার সঙ্গে নিজের কথা বলতে পারে। এতে কোনো সমস্যায় পড়লে কিংবা ভুল সিদ্ধান্ত নেয়ার ঝুঁকি তৈরি হলে শিক্ষার্থী সহজেই সহায়তা চাইতে পারে। পরিবারের সঙ্গে এ খোলামেলা যোগাযোগ শিক্ষার্থীদের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে এবং পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখতে সহায়তা করতে পারে।
অভিভাবকদের সঙ্গে স্কুল কর্তৃপক্ষের নিয়মিত মতবিনিময় সভা হয়? স্কুল ও পরিবারের মধ্যে যোগাযোগ ও সমন্বয় কীভাবে আরো কার্যকর করা সম্ভব?
শিক্ষার্থীদের সঠিকভাবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—উভয়েরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে পঞ্চম, অষ্টম ও দশম শ্রেণীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে অভিভাবকদের সঙ্গে শিক্ষকদের নিয়মিত যোগাযোগ থাকা প্রয়োজন। এসব শ্রেণীতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, মানসিক অবস্থা ও ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবনের প্রস্তুতির বিষয়ে বাড়তি মনোযোগ দেয়া জরুরি।
আমাদের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, অভিভাবক সভায় অনেক সময় মায়েরা উপস্থিত থাকলেও বাবারা কর্মব্যস্ততার কারণে আসতে পারেন না। অথচ সন্তানের শিক্ষা ও বিকাশের দায়িত্ব মা-বাবা উভয়েরই। তাই অভিভাবক সভায় উভয়ের অংশগ্রহণ এবং শিক্ষকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষার্থীদের ইতিবাচকভাবে গড়ে তুলতে শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা ও সহযোগিতার সম্পর্ক থাকতে হবে। স্কুলে একজন শিক্ষার্থী কেমন করছে, কোথায় তার ঘাটতি রয়েছে কিংবা আচরণে কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে কিনা—এসব তথ্য পরিবারের সঙ্গে ভাগাভাগি করা প্রয়োজন। একইভাবে বাসায় শিক্ষার্থীর আচরণ ও পড়াশোনার পরিস্থিতি সম্পর্কে অভিভাবকদেরও শিক্ষককে জানানো উচিত। এ ধরনের সমন্বিত উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের সমস্যা সময়মতো চিহ্নিত করতে এবং তাদের যথাযথ বিকাশ নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে।
শ্রেণীকক্ষকে আকর্ষণীয় করে তোলা এবং ভিজ্যুয়াল উপস্থাপনার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পাঠে আগ্রহ বাড়াতে আপনারা কী ধরনের পদ্ধতি অনুসরণ করেন?
আমরা শ্রেণীকক্ষে নিয়মিত প্রজেক্টর ব্যবহার করি এবং প্রয়োজনীয় স্লাইড তৈরি করে ক্লাসে যাই। যেমন নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সম্পর্কে পড়ানোর সময় প্রচলিত লেকচার পদ্ধতির বাইরে গিয়ে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ছবি দেখাই। ছবিগুলো দেখে তারা যেন বিষয়টি শনাক্ত করতে পারে বা পাঠের মূল প্রসঙ্গ অনুমান করতে পারে, সে সুযোগ তৈরি করি। তারা নিজেরা বিষয়টি চিহ্নিত করতে পারলে আমরা তা হোয়াইটবোর্ডে লিখে আলোচনা শুরু করি। শুধু বক্তৃতা বা লেকচারের তুলনায় ছবি ও অন্যান্য দৃশ্যমান উপকরণের মাধ্যমে শেখা বিষয় শিক্ষার্থীদের মনে দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সুযোগ বেশি থাকে। তাই পাঠদানকে কার্যকর ও আকর্ষণীয় করতে আমরা এ ধরনের পদ্ধতি অনুসরণের চেষ্টা করি।
পড়াশোনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ব্যবহার বাড়ছে। অনেক শিক্ষার্থী বাড়ির কাজ ও অ্যাসাইনমেন্ট তৈরিতে চ্যাটজিপিটির মতো এআই টুল ব্যবহার করছে। এ প্রবণতাকে কীভাবে দেখেন? এর নেতিবাচক প্রভাব মোকাবেলায় আপনারা কী করছেন?
বর্তমানে অনেক শিক্ষার্থী বাড়ির কাজ বা বিভিন্ন শিক্ষামূলক কাজ নিজে না করে সরাসরি চ্যাটজিপিটি কিংবা অন্য এআই টুলের সাহায্যে উত্তর তৈরি করে জমা দিচ্ছে। এতে কাজটি সম্পন্ন হলেও শিক্ষার্থী নিজে কতটা শিখছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। কারণ নিজে চিন্তা করা, তথ্য বিশ্লেষণ করা এবং নিজের ভাষায় উত্তর লেখার মধ্য দিয়েই প্রকৃত শেখার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
এ কারণে আমরা শিক্ষার্থীদের এ ধরনের কাজে সরাসরি এআইয়ের ওপর নির্ভর করতে নিরুৎসাহিত করি। তাদের পাঠ্যবই ভালোভাবে পড়তে, বিষয়বস্তু বুঝতে এবং নিজেদের জ্ঞান ও চিন্তাশক্তি কাজে লাগিয়ে উত্তর তৈরি করতে উৎসাহিত করি। প্রযুক্তি ব্যবহার করে কাজ শেষ করাই শিক্ষার উদ্দেশ্য নয়; বরং এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীর জ্ঞান ও দক্ষতা কতটা বাড়ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
১২ বছর পড়েও ঠিকমতো ইংরেজি শিখতে পারছে না অনেক শিক্ষার্থী। আমাদের ভাষা শিক্ষার গলদ কোথায়? সরকারের তৃতীয় ভাষা শেখানোর উদ্যোগ বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ কোথায়?
ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রেও বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় একটি ভাষা শেখার সুযোগ তৈরি করা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে তার আগে আমাদের বিদ্যমান ভাষা শিক্ষার দুর্বলতাগুলো দূর করা জরুরি। দীর্ঘ ১২ বছর ইংরেজি পড়ার পরও অনেক শিক্ষার্থী ইংরেজিতে, এমনকি বাংলাতেও, যথাযথভাবে লিখতে পারে না। এর পেছনে শিখন পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ভাষা শেখানোর ক্ষেত্রে কার্যকর ও শিক্ষার্থীবান্ধব পদ্ধতি অনুসরণ করা অত্যন্ত জরুরি। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরো কর্মমুখী করা প্রয়োজন। শিল্প খাতের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পাঠ্যক্রম তৈরি করা গেলে শিক্ষার্থীরা বেশি উপকৃত হবে।
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় কী ধরনের পরিবর্তন আনা প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?
শিক্ষা ব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে হলে প্রথমেই শিক্ষকদের শিক্ষার্থীদের মনস্তত্ত্ব বুঝতে হবে। একজন শিক্ষককে শুধু বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান দিলেই হবে না; শিক্ষার্থীদের বয়স, মানসিক বিকাশ, আগ্রহ ও শেখার ধরনও বুঝতে হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠ্যক্রম ও বইয়ের অপ্রয়োজনীয় বৈচিত্র্য কমিয়ে মানসম্মত পাঠ্যবই নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শিক্ষকদের বিএড ও অন্যান্য পেশাগত প্রশিক্ষণের মানও বাড়াতে হবে, যাতে তারা আধুনিক ও কার্যকর পাঠদান পদ্ধতি প্রয়োগ করতে পারেন। শ্রেণীকক্ষের পাঠদানের পাশাপাশি খেলাধুলা, দলগত পড়াশোনা ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বিকাশের সুযোগ তৈরি করতে হবে। এভাবে জ্ঞান, চিন্তাশক্তি ও দলগতভাবে কাজ করার সক্ষমতার সমন্বয় ঘটাতে পারলেই একটি দক্ষ ও যোগ্য প্রজন্ম গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
