নিজেকে গড়ে তুলতে ৬টি মানসিক পরিবর্তন জরুরি
প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৫৫ পিএম
জীবনে পরিবর্তন আনতে চাইলে আমরা প্রায়ই উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষা করি। ভাবি, ভয় কমলে, আত্মবিশ্বাস বাড়লে কিংবা পরিস্থিতি অনুকূলে এলে নতুন করে শুরু করব। অথচ জীবনের সব অনিশ্চয়তা দূর হওয়ার পরই যে পথচলা শুরু করতে হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। বরং ভয়, দ্বিধা ও সীমাবদ্ধতাকে সঙ্গে নিয়েই এগিয়ে যাওয়ার নাম মানসিক দৃঢ়তা। আর এই দৃঢ়তা অর্জনের প্রথম শর্ত হলো নিজের সঙ্গে সৎ হওয়া।
নিজের ভুল স্বীকার করুন
কোনো কাজে ব্যর্থ হলে পরিস্থিতি, সময় কিংবা অন্য মানুষের আচরণকে দায়ী করা সহজ। কখনো এসব সত্যিই ব্যর্থতার কারণ হতে পারে। তবে নিজের সিদ্ধান্ত বা আচরণের কোনো ভূমিকা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখাও জরুরি। নিজের ভুল স্বীকার করা মানে নিজেকে ছোট করা নয়; বরং কোথায় উন্নতির সুযোগ রয়েছে, তা চিহ্নিত করা। আত্মসমালোচনা যেন আত্মদোষারোপে পরিণত না হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। ভুলকে নিজের অযোগ্যতার প্রমাণ না ভেবে শেখার সুযোগ হিসেবে দেখুন।
অস্বস্তিকে মেনে নিতে শিখুন
নতুন কোনো দায়িত্ব নেওয়া, নিজের মতামত প্রকাশ করা কিংবা দীর্ঘদিনের অভ্যাস বদলানোর ক্ষেত্রে অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। অনেকেই এই অনুভূতিকে এড়িয়ে চলতে গিয়ে পরিচিত গণ্ডির মধ্যেই আটকে থাকেন। অথচ প্রতিটি অস্বস্তিই বিপদের সংকেত নয়। কখনো কখনো এটি নতুন অভিজ্ঞতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার স্বাভাবিক অংশ।
অতীতের ব্যর্থতাকে পরিচয় বানাবেন না
জীবনে প্রত্যাখ্যান, ভুল সিদ্ধান্ত কিংবা ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা থাকতেই পারে। কিন্তু একটি ঘটনা দিয়ে নিজের সম্পূর্ণ সক্ষমতা বিচার করা ঠিক নয়। অতীতে কোনো কাজে সফল হননি বলে ভবিষ্যতেও পারবেন না, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর কারণ নেই। বরং কী কারণে ব্যর্থতা এসেছে, কোন জায়গায় প্রস্তুতির ঘাটতি ছিল এবং পরবর্তীবার কীভাবে ভিন্নভাবে চেষ্টা করা যায়, তা ভাবুন। অতীতের অভিজ্ঞতা কাজে লাগান, কিন্তু সেটিকে ভবিষ্যতের সম্ভাবনার পথে বাধা হতে দেবেন না।
অনুপ্রেরণার অপেক্ষায় থাকবেন না
প্রতিদিন একই রকম উদ্যম বা কাজ করার ইচ্ছা থাকবে না। কিন্তু কেবল ভালো লাগার ওপর নির্ভর করলে প্রয়োজনীয় অনেক কাজই অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তাই বড় লক্ষ্যকে ছোট ছোট কাজে ভাগ করুন। প্রতিদিন অল্প সময় পড়াশোনা করা, নিয়মিত হাঁটা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য নির্দিষ্ট সময় রাখা এ ধরনের অভ্যাস গড়ে তুলুন।
নিজের ওপর আস্থা তৈরি করুন
আত্মবিশ্বাস শুধু ইতিবাচক কথা ভাবার মাধ্যমে তৈরি হয় না। নিজের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েও তা গড়ে ওঠে। তাই একসঙ্গে অনেক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত না নিয়ে এমন লক্ষ্য নির্ধারণ করুন, যা আপনার বর্তমান পরিস্থিতিতে অর্জন করা সম্ভব। কোনো কাজ করার সিদ্ধান্ত নিলে তার জন্য নির্দিষ্ট সময় রাখুন। কোনো কারণে তা পূরণ করতে না পারলে নিজেকে ব্যর্থ ঘোষণা না করে পরিকল্পনাটি পর্যালোচনা করুন। নিজের সামর্থ্য ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে বাস্তব ধারণা রাখাই আত্মবিশ্বাসকে দৃঢ় ভিত্তি দেয়।
প্রয়োজনে সহযোগিতা চান
মানসিকভাবে শক্তিশালী হওয়ার অর্থ সব সমস্যার সমাধান একাই করতে হবে, এমন নয়। দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, দুঃখ কিংবা অনিশ্চয়তা সামলাতে কখনো বিশ্বস্ত মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন হতে পারে। প্রয়োজনে পেশাদার সহায়তা নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্রাম নেওয়া, নিজের অনুভূতি প্রকাশ করা কিংবা কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সময় চাওয়া দুর্বলতার লক্ষণ নয়। বরং নিজের প্রয়োজন বুঝে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার মধ্যেই আত্মসচেতনতা প্রকাশ পায়।
সবশেষে মনে রাখতে হবে, মানসিক দৃঢ়তা মানে আবেগকে অস্বীকার করা নয়; বরং আবেগকে বুঝে পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে শেখা। নিজের সঙ্গে সৎ থাকুন, ভুল থেকে শিক্ষা নিন এবং অন্যের সঙ্গে তুলনা না করে নিজের অগ্রগতি মূল্যায়ন করুন। পরিবর্তনের জন্য নিখুঁত সময়ের অপেক্ষা না করে আজই ছোট একটি পদক্ষেপ নিন। কারণ, নিজের জীবনকে নতুনভাবে গড়ে তোলার শুরুটা হয় নিজের চিন্তা, আচরণ ও সিদ্ধান্তের দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়েই।
/এসএল
আরও পড়ুন
যুদ্ধক্ষেত্রে সেবা, ক্যানভাসে শিল্পের জীবন: সাইদা কামাল
প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৫১ পিএম
সাইদা কামাল ছিলেন একাধারে বীর মুক্তিযোদ্ধা, চিত্রশিল্পী ও শিল্পশিক্ষক। তিনি কবি সুফিয়া কামালের কন্যা। ৭৪ বছরের জীবনে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি আর শিল্পচর্চাকে ধারণ করে রেখেছিলেন তিনি। গত ১৮ অক্টোবর তার জীবনাবসান ঘটে।
মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলো
১৯৭১ সালে সাইদা কামাল ছিলেন ঢাকা আর্ট কলেজের (বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ) তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। যুদ্ধ শুরু হলে তার পরিবার বিভিন্নভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তায় এগিয়ে আসে। মা সুফিয়া কামালের দেশপ্রেম ও আদর্শ তাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে দূরে নিরাপদ জীবন বেছে না নিয়ে তিনি যুক্ত হন মুক্তিযুদ্ধের মানবিক সেবায়।
গায়ক মাহমুদুর রহমান বেনুর দিকনির্দেশনায় ১২ জনের একটি দল নিয়ে তিনি কুমিল্লার দিকে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। তাদের মধ্যে ছিলেন সাংবাদিক শাহাদাত চৌধুরী ও রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী মিলিয়া গণি। তারা প্রথমে চান্দিনায় পৌঁছান। পরে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের সোনামুড়া গ্রামে আশ্রয় নেন। সেখানে চিকিৎসক ডা. আখতার আহমেদের উদ্যোগে একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার খবর পেয়ে তারা যুক্ত হন আহত মানুষের সেবায়।
বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতালে ১৯৭১ সালের জুন থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সেবিকার দায়িত্ব পালন করেন সাইদা কামাল। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি আহত গ্রামবাসীরও চিকিৎসাসেবায় সহায়তা করতেন তিনি। হাসপাতালটি ছিল বনাঞ্চলের একটি বাংলোতে। পর্যাপ্ত খাবার, পোশাক ও ওষুধের অভাব ছিল। তারা তাঁবুতে থাকতেন। কিন্তু এসব প্রতিকূলতা তাদের দায়িত্ব পালনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। দেশের স্বাধীনতা ও মানুষের মুক্তিই ছিল তাদের কাছে মুখ্য।
মুক্তিযুদ্ধে তার অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি লাভ করেন ‘কমান্ডার-ইন-চিফের বিশেষ প্রশংসাপত্র’। এই স্বীকৃতি তার মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকার গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
তুলির টানে শিল্পের জগৎ
মুক্তিযুদ্ধের পর সাইদা কামাল ফিরে আসেন নিজের শিল্পচর্চায়। ১৯৫২ সালে ঢাকায় জন্ম নেওয়া এই শিল্পী ১৯৭২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে অঙ্কন ও চিত্রকলায় স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে ১৯৮৭ সালে ভারতের শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে নকশা বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেন। ১৯৯৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে ল্যান্ডস্কেপ চিত্রকলার কর্মশালায় অংশ নেন। পরবর্তী সময়ে মালয়েশিয়ায় আন্তর্জাতিক শিল্পকর্মশালা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভারমন্ট স্টুডিও সেন্টারে শিল্পী আবাসন কর্মসূচিতেও অংশ নেন তিনি।
তার শিল্পচর্চার পরিসর শুধু দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বাংলাদেশে একক প্রদর্শনীর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যেও তার কাজ প্রদর্শিত হয়েছে। ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির শিল্প আয়োজন, আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে নারী শিল্পীদের প্রদর্শনী এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শিল্প আয়োজনে তার অংশগ্রহণ ছিল। এসব আয়োজনের মধ্য দিয়ে দেশীয় চারুশিল্পের পরিসরে নিজের অবস্থান তৈরি করেন তিনি। শিল্পী হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি শিক্ষকতাও করেছেন সাইদা কামাল।
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি নিয়ে এক সাক্ষাৎকারে তিনি তরুণ প্রজন্মকে স্বাধীনতার মূল্যবোধ শেখানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলেন। তার মতে, দেশের মানুষকে মর্যাদা দিতে হবে এবং স্বাধীনতার সুফল সবার কাছে পৌঁছে দিতে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
২০২৬ সালের ১৮ অক্টোবর ৭৪ বছর বয়সে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে মারা যান সাইদা কামাল। নিউমোনিয়া ও কিডনিসংক্রান্ত জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। যুদ্ধক্ষেত্রে আহত মানুষের পাশে দাঁড়ানো থেকে শুরু করে ক্যানভাসে নিজের সৃজনশীলতার প্রকাশ সাইদা কামালের জীবন একাধিক পরিচয়ের সমন্বয়।
তথ্যসূত্র: দ্য ডেইলি স্টার, প্রথম আলো ও বেঙ্গল ফাউন্ডেশন।
/এসএল
আরও পড়ুন
প্রথম ডেটে যে ৫ তথ্য দেওয়া জরুরি নয়
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:১৯ পিএম
প্রথম ডেট মানেই নিজেকে অন্যের পছন্দমতো করে উপস্থাপন করা নয়। বরং এটি দুজন মানুষের পরস্পরকে জানার, চিন্তাভাবনা বোঝার এবং একসঙ্গে সময় কাটিয়ে স্বাচ্ছন্দ্য যাচাই করার সুযোগ। কিন্তু নতুন কারও সঙ্গে পরিচয়ের সময় অনেকেই তাকে মুগ্ধ করতে গিয়ে নিজের ব্যক্তিগত জীবন, সিদ্ধান্ত কিংবা আচরণের নানা দিক নিয়ে অতিরিক্ত ব্যাখ্যা দিতে শুরু করেন। অথচ সম্পর্কের শুরুতেই সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া বা নিজের প্রতিটি সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দেখানো জরুরি নয়।
ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কথা না বলা
প্রথম সাক্ষাতেই নিজের জীবনের সব কথা খুলে বলতে হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। পরিবার, অতীতের অভিজ্ঞতা কিংবা ব্যক্তিগত কোনো ঘটনা নিয়ে কথা বলতে অস্বস্তি হতে পারে। আবার কিছু বিষয় সম্পর্কে অন্য কাউকে জানাতে আপনি হয়তো আরও সময় নিতে চান। এতে অস্বাভাবিক কিছু নেই। বরং প্রথম ডেটে লক্ষ করুন, আপনার সঙ্গী এই সীমারেখাকে সম্মান করছেন কি না। কারণ সুস্থ সম্পর্ক গড়ে ওঠার জন্য পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ব্যক্তিগত পরিসরের গুরুত্ব রয়েছে।
জীবনের সব পরিকল্পনা শেয়ার না করা
ক্যারিয়ারে এখনো কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসেনি, চাকরি খুঁজছেন কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তায় আছেন এসব কারণে প্রথম ডেটে বিব্রত হওয়ার প্রয়োজন নেই। জীবনের অগ্রগতি সবার ক্ষেত্রে এক রকম হয় না। কেউ দ্রুত নিজের অবস্থান তৈরি করেন, আবার কারও ক্ষেত্রে লক্ষ্য পূরণে সময় লাগে।
নতুন পরিচয়ের শুরুতে নিজের বর্তমান পরিস্থিতিকে নিখুঁতভাবে তুলে ধরার চেষ্টা অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় চাপ তৈরি করে। অথচ জীবনের একটি পর্যায়ের অনিশ্চয়তা দিয়ে একজন মানুষের সামগ্রিক যোগ্যতা বিচার করা যায় না। নিজের পরিকল্পনা ও স্বপ্ন নিয়ে কথা বলতে পারেন, তবে সব প্রশ্নের উত্তর এখনই জানা থাকতে হবে, এমন নয়। বরং নিজের বাস্তব অবস্থান সম্পর্কে সৎ থাকুন। অন্যকে মুগ্ধ করতে গিয়ে কৃত্রিম ভাবমূর্তি তৈরির চেয়ে স্বাভাবিক থাকাই ভালো।
মেসেজের উত্তর দিতে দেরি হওয়া
নতুন পরিচয়ের ক্ষেত্রে কে আগে মেসেজ দিলেন, কত দ্রুত উত্তর এল কিংবা কেন কয়েক ঘণ্টা যোগাযোগ ছিল না–এসব নিয়ে কখনো কখনো অপ্রয়োজনীয় হিসাব শুরু হয়। বিশেষ করে সম্পর্কের শুরুতে অন্যজন কী ভাববেন, সেই চিন্তা থেকে অনেকে ব্যস্ততার কারণ ব্যাখ্যা করতে থাকেন।
কাজ, পড়াশোনা, পরিবার ও নিজের জন্য সময় রাখা দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক অংশ। তাই ব্যস্ততার কারণে মেসেজের উত্তর দিতে দেরি হলে প্রতিবার ক্ষমা চাওয়া বা বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
নিজের স্বভাব নিয়ে আগেভাগে ক্ষমা চাওয়া
‘আমি একটু চুপচাপ’, ‘আমি বেশি কথা বলি’ কিংবা ‘নতুন মানুষের সঙ্গে সহজে মিশতে পারি না’–এ ধরনের কথা প্রথম ডেটে স্বাভাবিকভাবেই বলা যায়। তবে নিজের স্বভাব অন্যজনের অপছন্দ হতে পারে, এমন আশঙ্কা থেকে আগেই ক্ষমা চাওয়া বা নিজেকে ছোট করে দেখানোর প্রয়োজন নেই।
মানুষের ব্যক্তিত্ব একেক রকম। কেউ প্রাণবন্ত, কেউ অন্তর্মুখী; কেউ সহজে কথা বলতে পারেন, আবার কেউ পরিচিত হতে কিছুটা সময় নেন। এসব বৈশিষ্ট্য কাউকে ভালো বা খারাপ মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করে না। তাই কাউকে আকৃষ্ট করার জন্য নিজের স্বাভাবিক আচরণ আড়াল করার দরকার নেই।
এখনো সম্পর্কে না জড়ানোর কারণ
‘এখনো সিঙ্গেল কেন?’ প্রথম ডেটে এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হলে কেউ কেউ নিজের অতীত সম্পর্ক, বিচ্ছেদ কিংবা দীর্ঘদিন একা থাকার কারণ বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করতে শুরু করেন। কিন্তু সম্পর্কে না থাকার জন্য কাউকে জবাবদিহি করতে হবে, এমন নয়।
কেউ হয়তো পড়াশোনা বা ক্যারিয়ারকে গুরুত্ব দিয়েছেন, কেউ ব্যক্তিগত জীবন গুছিয়ে নিতে চেয়েছেন, আবার কেউ উপযুক্ত সঙ্গীর দেখা পাননি। সম্পর্কের অভিজ্ঞতা সবার এক রকম হয় না। তাই নিজের অতীত নিয়ে কতটা কথা বলবেন, সেটি আপনার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত।
প্রশ্নটির উত্তর সংক্ষেপে দেওয়া যায়। যেমন–‘এখনো উপযুক্ত মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়নি’ কিংবা ‘এই সময়টায় নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম।’ চাইলে আরও বিস্তারিত বলতে পারেন, তবে তা যেন নিজের ইচ্ছা থেকেই হয়, অস্বস্তি বা চাপের কারণে নয়। একই সঙ্গে অন্যজন আপনার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও সিদ্ধান্তকে কীভাবে দেখছেন, সেটিও লক্ষ করা জরুরি।
সুতরাং নিজের ব্যক্তিগত সীমারেখা, জীবনের অনিশ্চয়তা, ব্যক্তিত্ব কিংবা অতীত নিয়ে কতটা কথা বলবেন, তা নির্ধারণ করার অধিকার আপনার রয়েছে। একইভাবে অন্যজনের কথাও মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং তার সীমারেখাকে সম্মান করা প্রয়োজন।
/এসএল
আরও পড়ুন
প্রাচীন সাহিত্যকে নতুন চোখে দেখার কবি অ্যান কারসন
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:১১ পিএম
প্রচলিত সাহিত্যিক কাঠামো ভেঙে কবিতা, গদ্য, অনুবাদ ও গবেষণাকে এক সুতোয় গেঁথেছেন কানাডীয় কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক অ্যান কারসন। প্রাচীন গ্রিক পুরাণ, প্রেমের জটিলতা, বিচ্ছেদের বেদনা আর মানুষের অন্তর্জগৎই তার পরিচিত অনুষঙ্গ। সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জনের মধ্য দিয়ে বিশ্বসাহিত্যে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করেছেন তিনি।
সাহিত্যের প্রচলিত সীমানা ভাঙার গল্প
১৯৫০ সালের ২১ জুন কানাডার টরন্টোতে জন্ম অ্যান কারসনের। শৈশব থেকেই ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি তার আগ্রহ ছিল। উচ্চবিদ্যালয়ে পড়ার সময় এক লাতিন ভাষার শিক্ষকের সহায়তায় প্রাচীন গ্রিক ভাষা শেখার সুযোগ পান তিনি। সেই আগ্রহই পরবর্তী সময়ে তাকে প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য ও ধ্রুপদী ভাষা নিয়ে গভীর অধ্যয়নের পথে নিয়ে যায়। টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট মাইকেলস কলেজে পড়াশোনা করে তিনি ধ্রুপদী সাহিত্যে স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন।
কারসনের সাহিত্যিক পরিচয়কে শুধু কবিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না। তিনি কবিতা লেখেন, প্রবন্ধ রচনা করেন, প্রাচীন সাহিত্য অনুবাদ করেন; একই সঙ্গে সাহিত্য ও ভাষার ইতিহাস নিয়ে গবেষণাও করেন। তার লেখায় পাণ্ডিত্য যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে মানুষের আবেগ, আকাঙ্ক্ষা ও নিঃসঙ্গতার সূক্ষ্ম অনুসন্ধান। বিশেষত্ব হলো, তিনি এসব বিষয়কে প্রকাশ করতে প্রচলিত সাহিত্যিক রীতির ওপর নির্ভর করেন না। বরং কবিতা ও গদ্যের মিশ্রণ, অসমাপ্ত বয়ান, চিত্রকলা কিংবা পুরাণের পুনর্ব্যাখ্যার মধ্য দিয়ে তৈরি করেন নিজস্ব প্রকাশভঙ্গি।
পুরাণের চরিত্রে সমকালীন মানুষের গল্প
কারসনের বহুল আলোচিত বই Eros the Bittersweet প্রকাশিত হয় ১৯৮৬ সালে। গ্রিক সাহিত্য ও দর্শনের আলোকে প্রেম, আকাঙ্ক্ষা এবং মানুষের চাওয়া-পাওয়ার জটিলতা বিশ্লেষণ করেছেন তিনি এই গ্রন্থে। তার কাছে প্রেম শুধু সুখের অনুভূতি নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দূরত্ব, অপূর্ণতা ও না পাওয়ার বেদনা। মানুষের আকাঙ্ক্ষা কীভাবে তার অনুভূতি ও সম্পর্ককে প্রভাবিত করে, সেই প্রশ্ন তার লেখায় বারবার ফিরে আসে।
১৯৯৮ সালে প্রকাশিত Autobiography of Red তার অন্যতম পরিচিত রচনা। এটি একই সঙ্গে কবিতা ও উপন্যাসের বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। প্রাচীন গ্রিক কবি স্টেসিকোরাসের বর্ণনায় থাকা ডানাওয়ালা লাল দানব গেরিয়ন এবং বীর হেরাক্লেসের পুরাণকে আধুনিক প্রেক্ষাপটে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছেন কারসন। এখানে পুরাণের চরিত্রগুলো শুধু অতীতের কাহিনির অংশ নয়; তাদের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে প্রেম, পরিচয়, মানসিক আঘাত ও নিজেকে আবিষ্কারের গল্প। প্রচলিত উপন্যাসের কাঠামোর বাইরে গিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, পুরোনো কাহিনিও নতুন সময়ের মানুষের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারে।
তার আরেকটি উল্লেখযোগ্য বই The Beauty of the Husband। ২০০১ সালে প্রকাশিত এই রচনার উপশিরোনাম ‘২৯টি ট্যাঙ্গোতে একটি কাল্পনিক প্রবন্ধ’। প্রেম, বিশ্বাসভঙ্গ ও দাম্পত্য সম্পর্কের জটিলতা এতে উঠে এসেছে। অন্যদিকে, Nox গ্রন্থে ব্যক্তিগত শোক, স্মৃতি ও হারিয়ে যাওয়া সম্পর্কের অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এসব রচনায় কারসন মানুষের অনুভূতিকে সহজ কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছে দেন না; বরং পাঠককে নিজের মতো করে অর্থ খুঁজে নিতে উৎসাহিত করেন।
প্রাচীন গ্রিক কবি স্যাফোর কবিতার খণ্ডাংশ অনুবাদেও কারসনের বিশেষ অবদান রয়েছে। If Not, Winter: Fragments of Sappho গ্রন্থে তিনি স্যাফোর টিকে থাকা কবিতার অংশগুলো অনুবাদ করেছেন। প্রাচীন এই কবির রচনায় প্রেম, আকাঙ্ক্ষা ও আবেগের যে প্রকাশ দেখা যায়, তা আধুনিক পাঠকের কাছেও পৌঁছে দিয়েছেন তিনি। এখানে অনুবাদ শুধু ভাষান্তর নয়; সময়ের ব্যবধান পেরিয়ে একজন প্রাচীন কবির কণ্ঠকে নতুন পাঠকের সামনে তুলে ধরার প্রচেষ্টাও।
নোবেল স্বীকৃতিতে নতুন মাত্রা
চলতি বছরের ৮ অক্টোবর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করা হয় অ্যান কারসনের নামে। সুইডিশ একাডেমি তার প্রাচীন ধ্রুপদী সাহিত্যধারার সঙ্গে সৃজনশীল সংলাপ এবং সমকালীন সাহিত্যের জন্য নতুন রূপ নির্মাণের প্রচেষ্টাকে স্বীকৃতি দিয়েছে।
সাহিত্যকে তিনি এমন একটি পরিসর হিসেবে দেখার সুযোগ তৈরি করেন, যেখানে সব প্রশ্নের উত্তর মেলে না, সব অনুভূতিরও সহজ ব্যাখ্যা থাকে না। কখনো অসমাপ্ত বাক্য, কখনো স্মৃতির টুকরো, কখনো পুরোনো কোনো মিথের পুনর্নির্মাণের মধ্য দিয়ে পাঠককে ভাবতে শেখান তিনি। এটাই তার স্বাতন্ত্র্য।
/এসএল
আরও পড়ুন
প্রযুক্তির জগতে নারীর অগ্রগতির চ্যালেঞ্জ
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:০৮ পিএম
প্রযুক্তি এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; অর্থনীতি, শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা ও রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম চালিকাশক্তি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সফটওয়্যার উন্নয়ন, তথ্যপ্রযুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তার মতো ক্ষেত্রগুলো ভবিষ্যতের কর্মসংস্থান নির্ধারণ করছে। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব এখনো তুলনামূলক সীমিত। ফলে প্রযুক্তির সম্ভাবনা কাজে লাগানোর পাশাপাশি সমান সুযোগ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনেসকোর তথ্যানুযায়ী, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত এই চার বিষয়ে (স্টেম) স্নাতকদের মধ্যে নারীর অংশ মাত্র ৩৫ শতাংশ। গত এক দশকে এই হারেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি। অর্থাৎ, উচ্চশিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও প্রযুক্তিসংশ্লিষ্ট বিষয়ে তাদের প্রতিনিধিত্ব এখনো সীমিত। এর প্রভাব পড়ছে প্রযুক্তি খাতের কর্মসংস্থান ও নেতৃত্বেও।
আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের (আইটিইউ) ২০২৪ সালের ফ্যাক্টস অ্যান্ড ফিগারস প্রতিবেদনেও ডিজিটাল বৈষম্যের চিত্র উঠে এসেছে। বিশ্বে পুরুষদের ৭০ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহার করলেও নারীদের ক্ষেত্রে এই হার ৬৫ শতাংশ। অর্থাৎ, ইন্টারনেট ব্যবহারকারী পুরুষের সংখ্যা নারীর চেয়ে প্রায় ১৮ কোটি ৯০ লাখ বেশি। স্বল্পোন্নত দেশগুলোয় ব্যবধান আরও প্রকট; সেখানে পুরুষদের ৪১ শতাংশের বিপরীতে নারীদের মাত্র ২৯ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন।
এই পরিসংখ্যান শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারের ব্যবধান তুলে ধরে না; প্রযুক্তি শেখা, দক্ষতা অর্জন এবং এ খাতে কাজ করার সুযোগেও অসমতার ইঙ্গিত দেয়। তবে ইন্টারনেট ব্যবহারের পরিসংখ্যান আর প্রযুক্তি পেশায় কর্মরত নারীর অনুপাত এক নয়। দুটি বিষয় আলাদাভাবে বিবেচনা করেই প্রযুক্তি খাতে নারীর অবস্থান বুঝতে হবে।
কেন পিছিয়ে নারীরা?
প্রযুক্তিতে নারীর পিছিয়ে থাকার পেছনে রয়েছে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, শিক্ষার সুযোগ এবং কর্মক্ষেত্রের নানা প্রতিবন্ধকতা। অনেক পরিবারে এখনো বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে ছেলেদের উপযোগী বিষয় হিসেবে দেখা হয়। ফলে ছোটবেলা থেকেই মেয়েরা কম্পিউটার প্রোগ্রামিং, রোবোটিকস কিংবা প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবনের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়তে পারে। অথচ এসব ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জনের জন্য লিঙ্গ নয়, প্রয়োজন আগ্রহ, প্রশিক্ষণ ও নিয়মিত চর্চা।
অন্যদিকে, প্রযুক্তি খাতে প্রবেশের পরও নারীদের নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়। কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য, নেতৃত্বের পদে কম প্রতিনিধিত্ব, পেশাগত নেটওয়ার্কের সীমাবদ্ধতা এবং কাজের পাশাপাশি পরিবারের দায়িত্ব সামলানোর চাপ তাদের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। কিছু কর্মক্ষেত্রে নারীর প্রযুক্তিগত দক্ষতা নিয়েও প্রচলিত ধারণা তাদের আত্মবিশ্বাস ও সুযোগকে প্রভাবিত করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শহর ও গ্রামের নারীদের সুযোগের পার্থক্যও গুরুত্বপূর্ণ। মানসম্মত ইন্টারনেট, ব্যক্তিগত কম্পিউটার, প্রশিক্ষণকেন্দ্র এবং প্রযুক্তি শিক্ষার সুযোগ সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছায় না। বিশেষ করে আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারের মেয়েদের জন্য এসব সীমাবদ্ধতা আরও বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ
প্রযুক্তি খাতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে প্রথমেই শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। বিদ্যালয় থেকেই মেয়েদের কোডিং, ডিজিটাল নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তিনির্ভর সমস্যা সমাধানের সঙ্গে পরিচিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ে পড়াশোনার জন্য বৃত্তি, হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ এবং পরামর্শদাতা কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে।
নারীকে প্রযুক্তির শুধু ব্যবহারকারী হিসেবে নয়, উদ্ভাবক, গবেষক, উদ্যোক্তা ও নীতিনির্ধারক হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ যত বেশি মানুষের অংশগ্রহণে গড়ে উঠবে, ততই তা হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সম্ভাবনাময়।
/এসএল
