জীবিকার তাগিদে পাড়ি জমিয়েছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকায়। দীর্ঘ ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সেখানে ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করছিলেন শরীয়তপুরের ডামুড্যার মারুফ বেপারি। কিন্তু চাঁদার টাকা নিয়ে বিরোধের জেরে গুলিতে প্রাণ হারাতে হলো এই প্রবাসী বাংলাদেশীকে। এখন বিদেশের মাটিতে পড়ে আছে তার মরদেহ। স্বজনদের আকুতি-দ্রুত মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করুক সরকার।
বুধবার (২১ অক্টোবর) রাত ১০টার দিকে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনের বুষ্টার এলাকার কাছাকাছি জুলুটেম্বা নামের একটি লোকেশনে নিজের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে গুলিতে নিহত হন মারুফ বেপারি। স্থানীয় প্রবাসী বাংলাদেশী ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, অতিরিক্ত চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোকে কেন্দ্র করে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।
নিহত মারুফ বেপারির দেশের বাড়ি শরীয়তপুরের ডামুড্যা উপজেলার সিড্যা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম সিড্যা গ্রামে। তার বাবা মৃত আব্দুস সোবহান বেপারি। তার মৃত্যুর খবর বাড়িতে পৌঁছানোর পর পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে শোকের মাতম চলছে।
নিহতের পরিচিত প্রবাসী বাংলাদেশী ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, মারুফ দীর্ঘ ১০ বছরের বেশি সময় ধরে জুলুটেম্বা এলাকায় ব্যবসা করছিলেন। ওই এলাকায় ব্যবসা পরিচালনার জন্য স্থানীয় কিছু ব্যক্তি তার কাছে প্রটেকশন মানি বা নিরাপত্তার নামে ৫০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ দক্ষিণ আফ্রিকান র্যান্ড দাবি করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি চাঁদার অতিরিক্ত টাকা দাবি করাকে কেন্দ্র করে তাদের সঙ্গে মারুফের বাক্বিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয় বলে জানিয়েছেন ওই এলাকার প্রবাসী বাংলাদেশী ব্যবসায়ীরা।
তবে হত্যাকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে দক্ষিণ আফ্রিকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় কাউকে আটক করা হয়েছে কি না, তা-ও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
মারুফ বেপারির মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষোভ ও শোক প্রকাশ করেছেন তার স্বজনেরা। নিহতের স্বজন কামরুজ্জামান বেপারি বলেন, ‘চাঁদার জন্য বিদেশের মাটিতে আমার কাকা মারুফ বেপারিকে জীবন দিতে হয়েছে। ওখানকার দূতাবাস কি এগুলো দেখে না?’
তিনি আরও বলেন, ‘তারা চান, সরকার দ্রুত উদ্যোগ নিয়ে তার কাকার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করুক। প্রিয়জনকে হারানোর শোকের মধ্যে এখন পরিবারের সদস্যদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ, কীভাবে দ্রুত মরদেহ দেশে এনে শেষবারের মতো তাকে দেখতে পাবেন।’
কামরুজ্জামান বেপারি আরও বলেন, ‘দক্ষিণ আফ্রিকায় চাঁদার টাকার জন্য প্রবাসী বাংলাদেশীদের হত্যার খবর প্রায়ই শোনা যায়। এ ধরনের ঘটনা বন্ধে সরকারকে জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে। প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তিদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।’
পরিবারের সদস্যদের দাবি, বিদেশের মাটিতে একজন বাংলাদেশীর এমন মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, পুরো এলাকার মানুষের জন্যই বেদনাদায়ক। দীর্ঘদিন প্রবাসে থেকে পরিশ্রম করে পরিবারের জন্য উপার্জন করা মারুফের এমন মৃত্যুতে তার স্বজনেরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
নিহতের মরদেহ বর্তমানে দক্ষিণ আফ্রিকার স্থানীয় একটি হাসপাতালে রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে মরদেহ দেশে পাঠানোর আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া, সম্ভাব্য সময়সূচি কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
স্বজনেরা বাংলাদেশ সরকার, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশ দূতাবাসের সহযোগিতা কামনা করেছেন। তাদের প্রত্যাশা, প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হবে এবং হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা হবে।
মারুফ বেপারির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর শরীয়তপুরের ডামুড্যা উপজেলার সিড্যা ইউনিয়নের পশ্চিম সিড্যা গ্রামে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্বজন ও পরিচিতজনদের মধ্যে চলছে শোক ও উদ্বেগ। প্রিয়জনের মরদেহ ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় দিন কাটছে পরিবারের সদস্যদের।
প্রবাসে জীবিকার সন্ধানে যাওয়া বাংলাদেশীদের নিরাপত্তা নিয়ে আবারও প্রশ্ন উঠেছে এ ঘটনায়। স্থানীয় প্রবাসী ব্যবসায়ীদের অভিযোগ সত্য হলে, চাঁদাবাজির মতো অপরাধের কারণে একজন বাংলাদেশি ব্যবসায়ীকে প্রাণ দিতে হয়েছে। তাই প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত এবং নিহতের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি পদক্ষেপ প্রত্যাশা করছেন স্বজনেরা।
শরীয়তপুরের ডামুড্যার পশ্চিম সিড্যা গ্রামের মানুষ এখন অপেক্ষায়-কখন দেশে ফিরবে মারুফ বেপারির মরদেহ, কখন শেষবারের মতো তাকে বিদায় জানাতে পারবেন স্বজনেরা।
