রংপুরের পীরগাছা উপজেলার কান্দিরহাট হাই স্কুল এণ্ড কলেজসহ অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আধুনিক ওয়াশ ব্লকগুলো এখন রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ও তদারকির অভাবে সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে পড়ে আছে। সম্প্রতি সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, টিফিনের ফাঁকে শিক্ষার্থীরা মাঠে খেলাধুলা কিংবা ঝালমুড়ির দোকানে ভিড় করলেও হাত পরিষ্কারের জন্য তাদের ভরসা সেই পুরোনো টিউবওয়েল। অথচ করোনা মহামারির সময়ে সংক্রমণ রোধে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে এসব প্রতিষ্ঠানে গড়ে তোলা হয়েছিল উন্নতমানের ওয়াশ ব্লক (ডব্লিউএএসএইচ- ওয়াটার, স্যানিটেশন অ্যান্ড হাইজিন)। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও নিয়মিত সংস্কারের অভাবে সেই জরুরি স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা আজ মুখ থুবড়ে পড়েছে।
করোনা মহামারির তীব্রতার সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় চালুর প্রাক্কালে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে দেশের প্রতিটি অঞ্চলে এই আধুনিক হাত ধোয়া ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয়েছিল। তবে বর্তমান বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, নিয়মিত সাবান-পানির অনুপস্থিতি, পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকা এবং বেসিন ভাঙা থাকায় স্কুলগুলোর সেই স্বাস্থ্যকর পরিবেশ পুনরায় আগের অস্বাস্থ্যকর দশায় ফিরে গেছে। এমনকি অনেক গ্রামীণ এলাকার শিক্ষার্থীরা ‘ওয়াশ ব্লক’ শব্দটির সঙ্গেই পরিচিত নয়। বিশেষ করে পীরগাছা ও মিঠাপুকুর অঞ্চলের বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, করোনাকালে তৈরি হওয়া অনেক অস্থায়ী ওয়াশ স্টেশন ইতিমধ্যে ভেঙে পড়েছে কিংবা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
এ বিষয়ে কান্দিরহাট হাই স্কুল এণ্ড কলেজের সহকারী শিক্ষক আমিনুল ইসলাম জুয়েল জানান, মহামারি-পরবর্তী সময়ে রক্ষণাবেক্ষণের বড় ধরনের স্থবিরতা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকি ও জবাবদিহিতার অভাবেই মূলত এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে ওয়াশ ব্লক মেরামত বা নিয়মিত সাবান-হ্যান্ডওয়াশ কেনার জন্য কোনো স্থায়ী ফান্ড বা বরাদ্দ না থাকায় ছোটখাটো ত্রুটিগুলোও আর ঠিক করা হয় না। অনেক স্থানে স্থায়ী ওয়াশ ব্লক নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেওয়া হলেও বছরের পর বছর ধরে তা ঝুলে রয়েছে। এছাড়া মহামারির ধাক্কা কেটে যাওয়ার পর সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হওয়ায় স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনের সেই ধারাবাহিকতা ও সচেতনতা এখন আর আগের মতো দেখা যাচ্ছে না।
রংপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক সিদ্দিকুর রহমান বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর বিদ্যালয়গুলোতে অপরিচ্ছন্ন টয়লেট দৈনিক জীবাণুমুক্ত করার সেই কড়াকড়ি এখন পুরোপুরি উধাও হয়ে গেছে। এর ফলে টয়লেটগুলো আগের মতোই অস্বাস্থ্যকর ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে, যা বিশেষ করে ছাত্রীদের জন্য চরম অস্বস্তির কারণ। অনেক প্রতিষ্ঠানে ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য আলাদা কোনো ওয়াশ ব্লক বা কার্যকর স্যানিটেশন ব্যবস্থা না থাকায় শিক্ষার্থীরা চরম স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। মিঠাপুকুর সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীও ক্ষোভ প্রকাশ করে জানায়, তাদের স্কুলের ওয়াশ ব্লকটিতে কোনো পানির সংযোগ বা সাবান নেই, বাধ্য হয়ে তাদের টিউবওয়েলের পানি ব্যবহার করতে হয়।
শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষা এবং যেকোনো ধরনের সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে বিদ্যালয়গুলোতে দ্রুত স্বাস্থ্যকর পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন সচেতন শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় সুধী সমাজ। তারা অবিলম্বে সরকারি অনুদান এবং স্থানীয় উদ্যোগের মাধ্যমে অকেজো ওয়াশ ব্লকগুলো সংস্কার এবং নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে বাধ্যতামূলক করার জোর দাবি জানিয়েছেন।
