- আপলোড সময় : ১৭-১০-২০২৬ ০১:১১:১০ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ১৭-১০-২০২৬ ০১:১৭:০৫ পূর্বাহ্ন
নূরুননাহার লোনা::
হাওরের পানি নেমে যাওয়ার পর আগাম শীতকালীন সবজি চাষে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন কৃষকেরা। মৌসুমের শুরুতেই সবজি বাজারে তুলতে পারলে তুলনামূলক বেশি দাম পাওয়া যায়। সেই আশায় কেউ চাষ করছেন শিম ও লাউ, কেউবা লালশাক, মূলাশাক, পালংশাকসহ বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি। তবে অসময়ের বৃষ্টিপাত ও রোগবালাইয়ের ঝুঁকি আগাম সবজি চাষে কৃষকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থায় লাভজনক উৎপাদন নিশ্চিত করতে উঁচু ও পানি নিষ্কাশনযোগ্য জমি নির্বাচন, উপযুক্ত জাতের বীজ ব্যবহার এবং নিয়মিত পরিচর্যার পাশাপাশি কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ মেনে চলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে কৃষি বিভাগ। চলতি বছর সুনামগঞ্জে আগাম শীতকালীন সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১২ হাজার ৭৭১ হেক্টর জমিতে। গত বছরের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এবার ১১ হেক্টর বেশি জমিতে চাষের পরিকল্পনা রয়েছে। জেলার সদর, বিশ্বম্ভরপুর, দোয়ারাবাজার ও জামালগঞ্জ উপজেলার উঁচু এলাকাগুলোতে আগাম শীতকালীন সবজির চাষ বেশি দেখা যায়। বিশেষ করে সদর উপজেলার জাহাঙ্গীরনগর, সুরমা ও রঙ্গারচর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় কৃষকেরা আগাম সবজি উৎপাদনে ব্যস্ত সময় পার করছেন। সদর উপজেলার জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়নের কৃষক আব্দুল মান্নান বলেন, শীতের শুরুতে সবজি বাজারে তুলতে পারলে ভালো দাম পাওয়া যায়। এ বছর তিনি ১৫ শতক জমিতে শিম ও লাউ চাষ করেছেন। আগাম জাতের লাউ বিক্রি করে ইতোমধ্যে ১০ হাজার টাকার বেশি আয় করেছেন। এছাড়া দুই বিঘা জমিতে লালশাক, মূলাশাক ও পালংশাক চাষ করেছেন। এসব সবজি বাজারে ভালো দামে বিক্রি করতে পারবেন বলে আশাবাদী তিনি। কৃষকেরা বলছেন, আগাম সবজি চাষে উৎপাদন খরচ তুলতে পারা এবং ভালো দাম পাওয়া - দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। মৌসুমের শুরুতে বাজারে সবজির সরবরাহ কম থাকায় তুলনামূলক বেশি দাম পাওয়া যায়। তবে অতিবৃষ্টি কিংবা জমিতে পানি জমে গেলে গাছের গোড়া পচে যাওয়া, ছত্রাকের আক্রমণ ও অন্যান্য রোগবালাইয়ের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, হাওর এলাকায় আগাম সবজি চাষের ক্ষেত্রে প্রথমেই জমির ধরণ বিবেচনায় নিতে হবে। উঁচু ও পানি নিষ্কাশনের সুবিধা রয়েছে - এমন জমি নির্বাচন করা জরুরি। জমি ঝুরঝুরে করে উঁচু বেড তৈরি করতে হবে এবং পাশাপাশি নালা রাখতে হবে, যাতে অতিবৃষ্টির পানি দ্রুত বের হয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে আবহাওয়ার পূর্বাভাসের দিকে নজর রাখতে হবে। এতে সম্ভাব্য বৃষ্টিপাত ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব হবে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ওমর ফারুক বলেন, আগাম সবজি চাষে জমি ও বেড নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষকদের এ বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি পরিচর্যা ও রোগবালাই ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষণ ও সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। সুনামগঞ্জ বৃষ্টিপ্রবণ এলাকা হওয়ায় সবজিখেতে ছত্রাকজনিত রোগের আক্রমণের ঝুঁকি বেশি। এ জন্য নিয়মিত জমি পরিদর্শন এবং রোগের লক্ষণ দেখা দিলে তা শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। তিনি আরও বলেন, পোকামাকড় দমনে অপ্রয়োজনে রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার না করে পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি অনুসরণ করা উচিত। হলুদ আঠালো ফাঁদসহ উপযুক্ত ফাঁদ ব্যবহার করে কিছু ক্ষতিকর পোকা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। আক্রান্ত পাতা ও গাছের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ সংগ্রহ করে জমি থেকে সরিয়ে ফেলতে হবে। তবে রোগ ও পোকাভেদে দমনপদ্ধতি আলাদা হওয়ায় কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ ছাড়া কোনো বালাইনাশক ব্যবহার করা উচিত নয়। কৃষি কর্মকর্তা ওমর ফারুক বলেন, মানুষের যেমন বিভিন্ন ধরনের রোগ হয়, তেমনি গাছপালা ও শাকসবজিতেও বিভিন্ন রোগবালাই দেখা দেয়। তাই সব রোগের জন্য একই ওষুধ কিংবা সব সবজিতে একই কীটনাশক ব্যবহার করা যাবে না। অতিরিক্ত রাসায়নিক সার প্রয়োগের পরিবর্তে সুষম সার ব্যবস্থাপনা এবং জৈব ও ক¤েপাস্ট সারের ব্যবহার বাড়াতে হবে। তিনি জানান, বেগুন, টমেটো, লাউ ও শিমগাছের গোড়া পচে গেলে কিংবা গাছ ঝিমিয়ে পড়লে রোগের কারণ শনাক্ত করা জরুরি। আক্রান্ত গাছের গোড়ার মাটি ও পানি নিষ্কাশনের অবস্থা পরীক্ষা করতে হবে। পাতায় জাবপোকা বা সাদা পোকার আক্রমণ দেখা দিলে আক্রান্ত পাতা সরিয়ে ফেলতে হবে। বেগুন ও টমেটোসহ বিভিন্ন সবজির আক্রান্ত ফল ও ডগা জমি থেকে সরিয়ে নিরাপদভাবে নষ্ট করতে হবে। পাতার নিচে ডিম ও ছোট কীড়া থাকলে সম্ভব হলে হাতে সংগ্রহ করে ধ্বংস করতে হবে। আক্রান্ত উদ্ভিদাংশ জমিতে ফেলে রাখা যাবে না, কারণ এতে রোগবালাই ছড়িয়ে পড়তে পারে। সদর উপজেলার জিনারপুর গ্রামের কৃষাণী সালেহা বেগম বাড়ির আঙিনায় বিভিন্ন জাতের সবজি চাষ করেছেন। তিনি জানান, লালশাক, মূলাশাক, আগাম জাতের টমেটো ও বেগুনসহ নানা ধরনের সবজি লাগিয়েছেন। কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ মেনেই তিনি চাষাবাদ করছেন। এতে পরিবারের সবজির চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বাড়তি সবজি বাজারে বিক্রি করতে পারছেন। সুনামগঞ্জে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে লাউ, শিম, ফুলকপি, বাঁধাকপি, মূলা, টমেটো, মূলাশাক, পালংশাক, লালশাক ও কাঁচামরিচসহ বিভিন্ন ধরনের শীতকালীন সবজির আগাম চাষ করা হয়। এসব সবজির ভালো ফলন পেতে জমি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, আগাছা পরিষ্কার, প্রয়োজন অনুযায়ী সেচ ও সার প্রয়োগ এবং রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে সতর্ক থাকতে হবে। কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, জেলার প্রতিটি উপজেলায় উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের পরামর্শ দিয়ে আসছেন। বীজ নির্বাচন, সার ব্যবস্থাপনা, রোগবালাই দমন কিংবা আবহাওয়াজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় কৃষকেরা স্থানীয় কৃষি অফিসের সহায়তা নিতে পারবেন। এ ছাড়া বালাইনাশক ব্যবহারের ক্ষেত্রে নির্ধারিত মাত্রা ও নিরাপত্তাবিধি মেনে চলতে হবে। বালাইনাশকের মোড়কে উল্লেখ করা ফসল সংগ্রহের বিরতি অনুসরণ করে সবজি বাজারজাত করতে হবে। এতে ভোক্তার স্বাস্থ্য সুরক্ষার পাশাপাশি নিরাপদ সবজি উৎপাদন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। সংশ্লিষ্টদের আশা, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং কৃষকেরা সঠিক সময়ে উপযুক্ত পরিচর্যা ও কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুসরণ করলে সুনামগঞ্জে আগাম শীতকালীন সবজির উৎপাদন বাড়বে। এতে কৃষকের আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে জেলার বাইরেও সবজি সরবরাহের সুযোগ তৈরি হবে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
কমেন্ট বক্স

সুনামকন্ঠ ডেস্ক