স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
দেশের আট বিভাগের ৭০টি পৌরসভায় নিজস্ব রাজস্ব বাড়ানো, ডিজিটাল ওয়ান-স্টপ সেবা ও ই-পেমেন্ট চালু, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহায়তা এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিনিয়োগের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার প্রকল্প নিচ্ছে সরকার। ‘প্রবৃদ্ধি: নির্বাচিত পৌরসভায় স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন’ শীর্ষক এ প্রকল্পে সরকারের অর্থায়ন থাকবে ২৫৪ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। সুইজারল্যান্ডের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা সুইস ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন (এসডিসি) অনুদান দেবে ৪৫ কোটি টাকা।
প্রকল্পটি আগামী রোববার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন তারেক রহমান একনেক সভায় সভাপতিত্ব করবেন।
স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রস্তাবিত এ প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২৯৯ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। পরিকল্পনা কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০৩০ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর আওতায় নির্বাচিত পৌরসভাগুলোতে স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন কাঠামো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া, পৌরসভার সেবার মান ও নিজস্ব রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা বাড়ানো এবং ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ উন্নত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
প্রকল্পের প্রধান কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে ৭০টি পৌরসভায় স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন কাঠামো বাস্তবায়নে অনুদান, পৌরসভার সেবা ডিজিটাল করা, প্রশিক্ষণ ও গবেষণা এবং জাতীয় স্থানীয় সরকার ইনস্টিটিউটের (এনআইএলজি) কার্যক্রমে সহায়তা। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে নারী, যুব ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং স্থানীয় পর্যায়ে টেকসই কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্পের ব্যয় বিভাজন অনুযায়ী, ৭০টি পৌরসভায় স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন কাঠামো বাস্তবায়নে অনুদান হিসেবে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৯৬ কোটি ৯১ লাখ টাকা। পৌরসভাগুলোর ডিজিটাল সেবা চালুর জন্য প্রকল্প অনুদান হিসেবে ৩০ কোটি ৪৫ লাখ টাকা এবং জাতীয় স্থানীয় সরকার ইনস্টিটিউটের জন্য ২৮ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণে ২ কোটি ৯৫ লাখ টাকা এবং গবেষণায় ১৯ কোটি ৮২ লাখ টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
পৌরসভাগুলোতে ডিজিটাল ওয়ান-স্টপ সার্ভিস সেন্টার ও ই-পেমেন্ট ব্যবস্থা চালু হলে নাগরিক ও উদ্যোক্তাদের বিভিন্ন সেবা গ্রহণ সহজ করার সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি পৌরসভার নিজস্ব রাজস্ব বাড়ানো, স্থানীয় ব্যবসার সম্ভাবনা চিহ্নিত করা এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পোদ্যোক্তা এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সহায়তার মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের নথিতে বলা হয়েছে, এর আগে ‘প্রাবৃদ্ধি: স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন’ প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে নির্বাচিত সাতটি পৌরসভায় ‘বাংলা এলইডি মডেল’ চালু করা হয়। পৌরসভা, বেসরকারি খাত ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সমন্বিত অংশগ্রহণের ভিত্তিতে স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নের এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হয়েছিল।
নথি অনুযায়ী, প্রথম পর্যায়ের কার্যক্রমে প্রায় ৩৮ হাজার উদ্যোক্তা এবং ৫০ হাজার সেবাগ্রহীতা সরাসরি উপকৃত হয়েছেন। এ সময়ে প্রায় ৪৯ হাজার ১১১টি নতুন কর্মদিবস সৃষ্টি হয়েছে এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের আয় প্রায় ১২ কোটি টাকা বেড়েছে। সংশ্লিষ্ট পৌরসভাগুলো অতিরিক্ত প্রায় ৮ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করতে সক্ষম হয়েছে। স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন কার্যক্রমকে স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনতে পৌরসভার প্রতিনিধি, বেসরকারি খাত ও অন্যান্য অংশীজনদের নিয়ে স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন কমিটিও গঠন করা হয়।
এই অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতায় নতুন প্রকল্পের আওতা সাতটি পৌরসভা থেকে বাড়িয়ে ৭০টি পৌরসভায় নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পের মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতির সম্ভাবনা কাজে লাগানো, উদ্যোক্তাদের বিকাশ এবং পৌরসভার সেবা ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় দেশের আট বিভাগের নির্বাচিত ‘ক’, ‘খ’ ও ‘গ’ শ্রেণির ৭০টি পৌরসভা অন্তর্ভুক্ত করা হবে। পরিকল্পনা কমিশনের নথি অনুযায়ী, পৌরসভা নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, জনসংখ্যা ও সেবার চাহিদা, দারিদ্র্য ও উন্নয়নঘাটতি, স্থানীয় অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা উন্নয়নের সুযোগ, নিজস্ব রাজস্ব বৃদ্ধির সম্ভাবনা এবং ডিজিটাল সেবা ও ই-পেমেন্ট চালুর প্রস্তুতি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া যোগাযোগব্যবস্থা, আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ভূমিকা এবং জলবায়ু ও ভৌগোলিক ঝুঁকিও বিবেচনায় ছিল।
গত ১৪ জুন ২০২৬ তারিখে পরিকল্পনা কমিশনে অনুষ্ঠিত প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভার সিদ্ধান্তের আলোকে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব পুনর্গঠন করে পাঠানো হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশন প্রকল্পটির মোট ব্যয় ২৯৯ কোটি ৯৯ লাখ টাকা নির্ধারণ করে ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০৩০ সালের মার্চ পর্যন্ত বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছে।
প্রকল্পটির বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি পানি ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য (ভারপ্রাপ্ত সচিব) কবির আহমেদ বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নির্বাচিত পৌরসভাগুলোতে স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন কাঠামো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে, রাজস্ব ও সেবাদানের সক্ষমতা বাড়বে এবং ডিজিটাল সেবা, উদ্যোক্তা সহায়তা ও বিনিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারিত হবে। ভবিষ্যতে এ মডেল দেশের অন্যান্য পৌরসভায়ও সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এসব সুফল প্রকল্প বাস্তবায়ন ও অনুমোদনের পর কার্যক্রমের সফলতার ওপর নির্ভর করবে।
