মালয়েশিয়ায় অবৈধ অভিবাসনবিরোধী অভিযান জোরদার করেছে দেশটির অভিবাসন বিভাগ। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত ২৮৭ দিনে দেশজুড়ে ১১ হাজারের বেশি অভিযান চালিয়ে ৬৫ হাজারেরও বেশি বিদেশি নাগরিককে আটক করা হয়েছে। এ সময়ে ১ লাখ ৪৬ হাজারের বেশি বিদেশির নথিপত্র যাচাই করা হয়। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ৪৫ হাজারেরও বেশি জনকে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগের উপমহাপরিচালক (অপারেশন) দাতুক লোকমান এফেন্দি রামলি এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ২৮৭ দিনে প্রতিদিন গড়ে ৩৮টির বেশি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এ সময়ে দৈনিক গড়ে ৫১১ জন বিদেশির নথিপত্র যাচাই এবং ২২৮ জনকে আটক করা হয়েছে।
লোকমান এফেন্দি রামলি জানান, অভিবাসন আইন লঙ্ঘন প্রতিরোধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে কর্তৃপক্ষ। এসব অভিযানে বৈধ ভ্রমণ নথি বা অবস্থানের অনুমতিপত্র না থাকা, অনুমোদিত সময়ের বেশি অবস্থান এবং পাস বা ওয়ার্ক পারমিটের অপব্যবহারের মতো ঘটনা শনাক্ত হচ্ছে।
আটক ও দেশে ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদের মধ্যে বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া ও মিয়ানমারের নাগরিক উল্লেখযোগ্য।
সম্প্রতি কেলান্তান রাজ্যের কুবাং কেরিয়ানে ইউনিভার্সিটি সায়েন্স মালয়েশিয়ার একটি বিশেষায়িত হাসপাতালের নির্মাণস্থলে অভিযান চালানো হয়। সেখানে ৫৭ জন বিদেশির কাগজপত্র যাচাই করে অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের সন্দেহে ৫৫ জনকে আটক করা হয়েছে। পরবর্তী তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার জন্য তাদের নিয়ে যাওয়া হয়।
মালয়েশিয়া থেকে অবৈধ পথে বিদেশি নাগরিকদের বের করে নেওয়ার সঙ্গে জড়িত একটি চক্রের সন্ধান পেয়েছে অভিবাসন বিভাগ। এ ঘটনায় মিয়ানমারের ১১ নাগরিককে আটক করা হয়েছে। তাদের মধ্যে একজনকে বাকি ১০ জনকে অবৈধভাবে দেশ ছাড়তে সহায়তাকারী পরিবহনকারী হিসেবে সন্দেহ করা হচ্ছে।
অভিবাসন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কেলান্তানের ওয়াকাফ চে ইয়ে এলাকার একটি হোটেলে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়। আটক ব্যক্তিদের বয়স ২০ থেকে ৩৪ বছরের মধ্যে। বাকি ১০ জন জোহর বাহরু ও কুয়ালালামপুর থেকে এসে ওই এলাকায় অবস্থান করছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
লোকমান এফেন্দি জানান, মালয়েশিয়া থেকে বের করে দেওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য প্রত্যেকের কাছ থেকে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ রিঙ্গিত নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে তাদের শনাক্ত করা হয়। এ ঘটনায় আরও কেউ জড়িত রয়েছেন কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযানের কারণে মালয়েশিয়ার অভিবাসন ডিপোগুলোতে ধারণক্ষমতার তুলনায় বেশি চাপ তৈরি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাতুক সেরি সাইফুদ্দিন নাসুতিওন ইসমাইল।
তিনি জানান, মালয়েশিয়াজুড়ে অভিবাসন ডিপোগুলোর মোট ধারণক্ষমতা প্রায় ২০ হাজার জন। নিয়মিত অভিযানে আটক বিদেশি নাগরিকদের সেখানে রাখার কারণে বিভিন্ন ডিপোতে চাপ বাড়ছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিদেশি নাগরিকদের অবস্থান শনাক্ত করতে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের ভিত্তিতে বিশেষ এলাকাভিত্তিক মানচিত্র তৈরি করেছে অভিবাসন বিভাগ। এর মাধ্যমে বিদেশিরা কোথায় বসবাস করেন, অবস্থান করেন বা একত্র হন, তা চিহ্নিত করা হচ্ছে।
আটক ব্যক্তিদের মধ্যে বৈধ নথিবিহীন বিদেশি, মেয়াদোত্তীর্ণ পাস ব্যবহারকারী, অনুমতিপত্রের অপব্যবহারকারী এবং শরণার্থী হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিরাও রয়েছেন। প্রত্যেকের আইনগত অবস্থান বিবেচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এসব অভিযানে অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষও অংশ নিচ্ছে।
একই সংবাদ সম্মেলনে মালয়েশিয়ার কারাগারগুলোতে বন্দির সংখ্যা ও মাদক-সংশ্লিষ্ট অপরাধের চিত্র তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানান, দেশটির ৪১টি কারাগারে বর্তমানে প্রায় ৯০ হাজার বন্দি রয়েছেন। তাদের আনুমানিক ৭৫ শতাংশ মাদক-সংশ্লিষ্ট অপরাধে জড়িত।
বন্দিদের বড় একটি অংশ বিপজ্জনক মাদক আইন, ১৯৫২-এর বিভিন্ন ধারার আওতায় সংশ্লিষ্ট অপরাধে দণ্ডিত বা আটক রয়েছেন। কেলান্তানের কোটা ভারুর পেঙ্গকালান চেপা কারাগার অতিরিক্ত বন্দির চাপের মুখে থাকা কারাগারগুলোর একটি।
বয়সভিত্তিক তথ্য তুলে ধরে সাইফুদ্দিন নাসুতিওন বলেন, ১৫ থেকে ৩৯ বছর বয়সীরা বন্দিদের মধ্যে সবচেয়ে বড় গোষ্ঠী। ১৫ বছরের কম বয়সীদের মাদক-সংশ্লিষ্ট অপরাধে জড়িয়ে পড়াও উদ্বেগজনক। বেকার ব্যক্তিদের মধ্যে মাদকের অপব্যবহারের প্রবণতা বেশি বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মালয়েশিয়ার পূর্ব উপকূলীয় অঞ্চলে কৃত্রিম মাদকের ব্যবহার বেশি। অন্যদিকে, পশ্চিম উপকূলে কৃত্রিম ও অ-কৃত্রিম—উভয় ধরনের মাদকের ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। সহজলভ্যতার কারণে কৃত্রিম মাদকের ব্যবহার বাড়ছে বলে জানান তিনি।
কেলান্তান, কেদাহ, পারলিস ও তেরেঙ্গানু রাজ্যে প্রতি এক লাখ মানুষের বিপরীতে মাদক-সংশ্লিষ্ট অপরাধের হার জাতীয় গড়ের চেয়ে বেশি। কেদাহর পেনদাং জেলায় এ হার সর্বোচ্চ। এরপর রয়েছে কেলান্তানের কুয়ালা ক্রাই।
এ ছাড়া কেলান্তানের তুমপাত, তানাহ মেরাহ ও বাচোক এবং তেরেঙ্গানুর বেসুত জেলায় প্রতি এক লাখ মানুষের বিপরীতে মাদক-সংশ্লিষ্ট অপরাধের হার এক হাজার ছাড়িয়েছে।
সাইফুদ্দিন নাসুতিওন বলেন, এসব তথ্য কাজে লাগিয়ে মাদক প্রতিরোধ ও আইন প্রয়োগের কার্যক্রম আরও সুনির্দিষ্ট করা হবে। এ জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জাতীয় মাদকবিরোধী সংস্থা, পুলিশ ও রাজ্য সরকারগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
মালয়েশিয়ায় অবৈধ অভিবাসনবিরোধী অভিযান জোরদার হওয়ার পাশাপাশি আটক ব্যক্তিদের রাখার ব্যবস্থা এবং কারাগারে অতিরিক্ত বন্দির চাপ সামলানো দেশটির কর্তৃপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন
