সমুদ্রসৈকতে খাবার, ক্যাম্পিং, কনসার্ট ও রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা; শিশুদের বিনোদন থেকে রাতের আকাশে তারা দেখার সুযোগ-কক্সবাজার পর্যটন কার্নিভালে থাকছে নানা আয়োজন।
‘কক্সবাজার পর্যটন কার্নিভাল’ কবে কোথায়?
সমুদ্রসৈকতের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি পর্যটকদের বিনোদনের বাড়তি সুযোগ তৈরি করতে কক্সবাজারে আয়োজন করা হচ্ছে তিন মাসব্যাপী ‘কক্সবাজার পর্যটন কার্নিভাল’। আগামী ১ নভেম্বর শুরু হয়ে ২০২৭ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত চলবে এ উৎসব। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের উদ্যোগে কক্সবাজার শহরের হোটেল শৈবালসংলগ্ন সমুদ্রসৈকত ও ঝাউবনের প্রায় ৩৫ একর জায়গাজুড়ে বসবে এই কার্নিভাল।
আয়োজকদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা চলবে উৎসব। এতে থাকবে প্রায় ১৬টি জোন। খাবার, কেনাকাটা, সংস্কৃতি, খেলাধুলা, শিশুদের বিনোদন, ক্যাম্পিং ও রোমাঞ্চকর কার্যক্রমসহ পর্যটকদের জন্য থাকছে নানা অভিজ্ঞতার সুযোগ।
কক্সবাজার পর্যটন কার্নিভালে কী কী থাকছে?
১. খাবারের জন্য ফুড জোন
দেশি-বিদেশি নানা ধরনের খাবার।
লাইভ ফুড স্টল ও বারবিকিউ।
আইসক্রিম পারলার ও জুস কর্নার।
২. কেনাকাটা ও দেশীয় হস্তশিল্প
মার্কেট জোনে পোশাক ও অলংকারের দোকান।
ক্র্যাফট ভিলেজে মাটির পণ্য ও স্থানীয় কারিগরদের তৈরি বিভিন্ন হস্তশিল্প প্রদর্শন ও বিক্রি।
স্থানীয় উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের পণ্য ও সেবা দেশি-বিদেশি পর্যটকদের সামনে তুলে ধরার সুযোগ।
বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতেও আলোচনা চলছে।
৩. যোগব্যায়াম ও মেডিটেশন
ওয়েলনেস জোনে সূর্যোদয়ের সঙ্গে যোগব্যায়াম।
মেডিটেশনের মাধ্যমে সময় কাটানোর সুযোগ।
৪. শিশুদের জন্য আলাদা আয়োজন
কিডস জোনে শিশুদের আর্ট কার্যক্রম।
বিভিন্ন রাইড ও বিনোদনমূলক আয়োজন।
৫. সমুদ্রসৈকতে ক্যাম্পিং ও রাতের অভিজ্ঞতা
রাত যাপনের জন্য ক্যাম্পিংয়ের ব্যবস্থা।
খোলা আকাশের নিচে পাঠাগার।
নিজেরা বারবিকিউ তৈরি করার সুযোগ।
হ্যামক ও ক্যাম্পফায়ার।
টেলিস্কোপ দিয়ে তারাভরা আকাশ দেখার আয়োজন।
৬. লাইভ আর্ট, ফটো গ্যালারি ও সিনেমা
লাইভ আর্ট প্রদর্শনী।
ফটো গ্যালারি।
খোলা আকাশের নিচে সিনেমা দেখার ব্যবস্থা।
ভার্চ্যুয়াল রিয়েলিটি (ভিআর) জোন।
সার্কাস টেন্ট।
৭. সমুদ্রসৈকতে খেলাধুলা ও রোমাঞ্চকর কার্যক্রম
কার্নিভালে পর্যটকদের জন্য সমুদ্রসৈকতকেন্দ্রিক নানা খেলাধুলা ও অ্যাডভেঞ্চার কার্যক্রম রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
কায়াকিং।
বাঞ্জি জাম্পিং।
গো-কার্ট।
বিচ ফুটবল।
বিচ হ্যান্ডবল।
বিচ ভলিবল।
বিচ কাবাডি।
ব্যাডমিন্টন।
বালু দিয়ে ভাস্কর্য তৈরির আয়োজন।
৮. সূর্যাস্তের সঙ্গে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা
বিচ ভিউ ওপেন থিয়েটারে সমুদ্রের সূর্যাস্ত উপভোগের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক পরিবেশনার ব্যবস্থা থাকবে। সমুদ্রের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সাংস্কৃতিক আয়োজন মিলিয়ে পর্যটকদের জন্য ভিন্নধর্মী অভিজ্ঞতা তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
৯. বিশেষ দিবস ও উৎসবের আয়োজন
বিজয় দিবস, বড়দিন ও ইংরেজি নববর্ষ উপলক্ষেও থাকবে বিশেষ আয়োজন। ফলে তিন মাসের কার্নিভালে বিভিন্ন উৎসব ও দিবস ঘিরে বাড়তি বিনোদনের সুযোগ তৈরি হবে।
১০. পর্যটকদের নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা
কার্নিভালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন, পুলিশ সুপারসহ সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা চলছে।
আয়োজক প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নিরাপত্তাব্যবস্থার পাশাপাশি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আনসার সদস্য মোতায়েনের পরিকল্পনা রয়েছে। ট্যুরিস্ট পুলিশ ও সাধারণ পুলিশের সমন্বিত সহযোগিতায় সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন আয়োজকেরা।
কেন আয়োজন করা হচ্ছে এই কার্নিভাল?
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের মালিকানাধীন হোটেল শৈবাল ও মোটেল লাবনীর ব্যবস্থাপক রায়হান উদ্দিন আহমেদ বলেন, কক্সবাজারকে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তোলা এবং আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্য হিসেবে ব্র্যান্ডিং করার লক্ষ্যেই এ কার্নিভালের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ আয়োজন বাস্তবায়নে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান স্পেল বাউন্ড কমিউনিকেশনসের সঙ্গে কাজ করছে পর্যটন করপোরেশন। এরইমধ্যে ঢাকায় বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান ও অতিরিক্ত সচিব মোঃ সামীমুজ্জামানের উপস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে। এ ছাড়া কক্সবাজারের জেলা প্রশাসকের উপস্থিতিতে পর্যটনসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে মতবিনিময় সভাও হয়েছে।
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান মোঃ সামীমুজ্জামান বলেন, বিশেষ করে বিদেশি পর্যটকদের কাছে কক্সবাজারকে নতুন ও ব্যতিক্রমীভাবে উপস্থাপন এবং তাদের সংখ্যা বাড়ানোর লক্ষ্যেই আন্তর্জাতিক মানের এ কার্নিভালের আয়োজন করা হচ্ছে। পর্যটন করপোরেশনের উদ্যোগে এবং স্পেল বাউন্ড কমিউনিকেশনস লিমিটেডের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত হবে এ কার্নিভাল।
তিনি বলেন, বিগত বছরগুলোতে কক্সবাজারে পর্যটকদের আগমন বাড়লেও বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা তেমন বাড়েনি। তাই পর্যটন মৌসুমে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আবদুল শুক্কুর বলেন, থাইল্যান্ডের ফুকেট ও পাতায়া, মালয়েশিয়ার লংকাউই, ভারতের গোয়া, ইন্দোনেশিয়ার বালি, নেপাল ও ভুটানের মতো জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্যগুলোতে রাতের বিনোদন ও সরাসরি সংগীত পরিবেশনার ব্যবস্থা রয়েছে। বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে কক্সবাজারেও রাত্রিকালীন বিনোদনের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।
সংসদ সদস্য শামীম আরা স্বপ্না বলেন, কক্সবাজারের পর্যটনকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরার প্রক্রিয়া নির্ধারণে সরকারের উচ্চপর্যায়ে একটি শক্তিশালী কমিটি গঠন করা হয়েছে। অতীতে কী হয়েছে, তা নিয়ে পড়ে না থেকে সবার সমন্বিত পরামর্শ নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। এভাবে কক্সবাজারকে একটি অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
পর্যটন ও স্থানীয় অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়তে পারে?
প্রতিবছর কক্সবাজারে ৩০ লাখের বেশি পর্যটকের সমাগম হয়। তবে বিদেশি পর্যটকের উপস্থিতি তুলনামূলক কম। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, সমুদ্র উপভোগের বাইরে পর্যাপ্ত বিনোদনের সুযোগের অভাব পর্যটকদের দীর্ঘ সময় অবস্থান না করার অন্যতম কারণ।
তিন মাসব্যাপী এ কার্নিভালের মাধ্যমে পর্যটকদের অবস্থানের সময় বাড়ানো, দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে কক্সবাজারকে নতুনভাবে তুলে ধরা এবং স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি সঞ্চারের প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। স্থানীয় উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন অংশীজনের জন্যও নিজেদের পণ্য ও সেবা তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে।
আয়োজকদের প্রত্যাশা, সমুদ্রসৈকতের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে খাবার, সংস্কৃতি, খেলাধুলা, রাতের বিনোদন ও অ্যাডভেঞ্চার কার্যক্রম যুক্ত হলে কক্সবাজারে পর্যটকদের অভিজ্ঞতা আরও বৈচিত্র্যময় হবে। দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্য হিসেবে কক্সবাজারের পরিচিতি বাড়াতেও ভূমিকা রাখবে এই কার্নিভাল।
