ঝাড়গ্রামের সেই ঝালমুড়িওয়ালা বিক্রমকুমার সাউ।
Published on
:
3 min read
বুদ্ধদেব বেরা
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আলোয় তিনি ‘আলোকিত’। রাতারাতি রাজ্য-রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতেও চলে এসেছিলেন ভোটের সময়ে। ধীরে ধীরে সেই আলো গোটা দেশে, এমনকী সুদূর বিলেতেও ছড়িয়ে দিয়ে এসেছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু মাত্র ছ’মাসের মধ্যেই রাজনীতির রঙ্গমঞ্চের এই আলোকবৃত্ত তাঁর জীবনের প্রায় সবটুকু শুষে নিয়েছে। সাধারণ জীবনযাপনের সুখ-শান্তি এতটাই নিংড়ে নিয়েছে যে, পুজোর রোশনাইও এখন তাঁর কাছে আতঙ্ক-বিষাদের। তাই এই আলো থেকে খানিক দূরে সরে যেতে চাইছেন ঝাড়গ্রামের সেই ঝালমুড়ি বিক্রেতা। এখন দোকানে মোদীর ছবিও টাঙাতে ভয় হয় তাঁর!
ঝাড়গ্রাম কলেজ মোড় থেকে জেলাশাসকের দপ্তরের দিকে মিনিট খানেকের হাঁটাপথ। বাঁ হাতেই পড়ে সেই দোকান। রোজকার মতোই সকাল সাড়ে ১০টার মধ্যে ঝাঁপ খুলেছেন বিক্রমকুমার সাউ। খদ্দেরদের আনাগোনাও শুরু হয়ে গিয়েছে। স্টিলের ডিব্বায় মুড়ি, চানাচুর, বাদাম, তেল, মশলা দিয়ে ঝালমুড়ি বানাতে বানাতে এই সময় অনলাইনকে বিক্রম বলছিলেন, ‘এখন তো পুজো উদ্বোধনের ডাক পাচ্ছি। গিধনি আর পাঁশকুড়া থেকে ফোন এসেছিল। পুরো কথা হয়নি এখনও। তবে বললে হয়তো যেতে হবে। কারণ না গেলে আবার লোকে বলবে: মোদীজি তোকে মোটা করে দিয়েছেন!’
প্রথমবার শুনে কথাটার অর্থ বোধগম্য হয়নি। জিজ্ঞেস করায় বিক্রমই বুঝিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ, তা-ই তো বলে লোকে। প্রধানমন্ত্রী এই দোকান থেকে ঝালমুড়ি কিনে খেয়েছেন বলে আমার নাকি দেমাক বেড়ে গিয়েছে। গালিগালাজও করে অনেকে। বলে, পাঁচ বছর পরে দেখে নেব।’ এ সব শুনে ভয়ই হয় বিক্রমের। ধীর গলায় বলতে থাকেন, ‘মা, বাবা, স্ত্রী আর পাঁচ বছরের ছেলেকে নিয়ে ভাড়াবাড়িতে থাকি। রাগের মাথায় কখন কে, কী করে দেবে! প্রধানমন্ত্রী তো নিজে থেকেই আমার দোকানে এসেছিলেন। আমি একজন বিক্রেতা হিসেবে ওঁকে ঝালমুড়ি দিয়েছি। এতে এত হিংসার কী আছে বুঝি না।’
বিক্রমরা আদতে বিহারের গয়ার বাসিন্দা। ১৫ বছর আগে ঝাড়গ্রাম শহরে এসেছিলেন তাঁরা। শুরুর দিকে ঠেলাগাড়িতে ঝালমুড়ি বিক্রি করতেন বিক্রম। পরে পাঁচ লক্ষ টাকা ঋণ নিয়ে কলেজ মোড়ের দোকানটি কেনেন। মাস তিনেক আগে গয়ায় গিয়েছিলেন সপরিবার। গ্রামের বাড়িতে পাড়া-পড়শিদের ভিড় উপচে পড়েছিল সে দিন। কিন্তু প্রচারের এই চড়া আলো যে নিকষ অন্ধকারও ডেকে আনবে, বুঝতে পারেননি বিক্রম। কথায় কথায় বলেন, ‘ওখানেও কিছু লোক কটূক্তি করেছে। বিজেপি বাদে অন্য সব রাজনৈতিক দলের লোক তারা। হুমকিও দিয়েছে।’
পুজোর সময়েও একই রকম হুমকি-কটূক্তির শিকার হতে হবে বলে আশঙ্কা করছেন বিক্রম। গত বছরও স্ত্রী-ছেলেকে নিয়ে ঘুরেছেন। লাইনে দাঁড়িয়ে ঠাকুর দেখেছেন। কিন্তু এখন তাঁকে ভিড় তাড়া করে। লোকে দেখলেই চিনে ফেলে। এ বার রাস্তাঘাটে বৃদ্ধ মা-বাবা আর স্ত্রী-ছেলের সামনে কোনও বিড়ম্বনায় পড়তে হবে না তো? আপাতত এই চিন্তাতেই ডুবে বিক্রম। এ বিষয়ে জেলা পুলিশ সুপার মানব সিংলার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘উনি (বিক্রম) এ বিষয়ে আমাদের কিছু জানাননি। থানায় জানালেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে নিরাপত্তাও দেওয়া হবে।’
বিক্রমের চিন্তা যে পুরোপুরি অমূলক, তা নয়। কারণ, ভোটপ্রচারে এসে প্রধানমন্ত্রী তাঁর দোকানে ঝালমুড়ি খেয়ে যাওয়ার পর থেকেই নানা রকম হুমকি ফোন এসেছে — অভিযোগ এমনটাই। টেক্সট মেসেজে এবং হোয়াট্সঅ্যাপে বন্দুক দেখিয়ে তাঁকে প্রাণে মারার হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ! এ নিয়ে থানায় অভিযোগও জানান। সেই মতো কিছু দিনের জন্য পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছিল বিক্রমের দোকানে। কিন্তু এখন তা তুলে নেওয়া হয়েছে। তবে সেই সময়ে দোকানে-ভাড়াবাড়িতে পুলিশের তরফে যে সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়েছিল, তা থেকে গিয়েছে। প্রতিমাসে তার বিদ্যুৎ বিল বিক্রমকেই চোকাতে হয়! ক্রোধ চেপে বললেন, ‘গত ৬ মাসে ঝালমুড়ির বিক্রি বেড়েছে ঠিকই। আগে দিনে ২ হাজার টাকার মুড়ি বেচতাম। এখন হয়তো ৩ হাজার টাকার মুড়ি বেচি। কিন্তু তাতে লাভটা কী হলো! মাসে দেড় হাজার টাকা তো সিসি ক্যামেরার বিল দিতে হয়।’
মোদী-সাক্ষাতের পরে বিক্রমের জীবনে অনেক বদলই এসেছে। তাঁর মতে, কিছু সত্যিই ভালো। সে কথা অকপটে স্বীকারও করেন বিক্রম। তবে কিছু বদল তাঁর জীবন অতিষ্ঠও করে তুলেছে! পারিবারিক কলহ দেখা গিয়েছে জমিজমা নিয়ে। দুঃখ করেই বলছিলেন, ‘আমার নিজের মামি আমার খারাপ চাইছে! বলেছে, পাঁচ বছর পরে তো আর থাকতে পারবি না। এখন মনে হচ্ছে, বন্ধুর থেকে তো শত্রু বেড়ে গিয়েছে। এখন মোদীজির ছবি শুধু ফোনেই রয়েছে। কিন্তু ঘরে-দোকানে প্রধানমন্ত্রীর ছবি টাঙাতেও ভয় লাগে আমার!’
নিজের সমস্যার কথা এলাকার বিজেপি নেতাদেরও জানিয়েছিলেন। কিন্তু সাহায্য সেই অর্থে কারও থেকেই মেলেনি বলে জানিয়েছেন বিক্রম। এ বিষয়ে জেলা বিজেপির সহ-সভাপতি দেবাশিস কুন্ডুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে বলেন, ‘উনি শুধু প্রধানমন্ত্রীকে ঝালমুড়ি খাইয়েছেন বলে নয়, প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করাই আমাদের কাজ। আমরা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নই। তবে উনি আমাদের পার্টি অফিসে এসে বিষয়টি জানালে আমরা কিছু একটা করব।’ মমতাপন্থী স্থানীয় তৃণমূল নেতা সুমন সাহু বলেন, ‘ভোটের সময়ে নিরাপত্তা বলয়ে ঘিরে রাখা হয়েছিল বিক্রমকে। আজ উনি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন! ভাবা যায়?’
বিক্রমও ভাবতে পারেনি। বোঝেননি আলোর গভীরেও যে এতটা নিকষ অন্ধকার থাকতে পারে! তাই আপাতত খানিক দূরেই সরে যেতে চাইছেন বিক্রম। কিন্তু তাঁর ভয়, রাজনীতির মাধ্যাকর্ষণ তাঁকে এই কক্ষপথ থেকে ছিটকে যেতে দেবে না!
