বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে পরিবর্তনশীল সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। এ পরিবর্তন যদি জনগণের স্বার্থ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি , উৎপাদনে গতিশীলতা এবং মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণ আনতে না পারে তাহলে তা হবে জাতির জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক।
মোঃ. মাঈন উদ্দীন
বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে পরিবর্তনশীল সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। এ পরিবর্তন যদি জনগণের স্বার্থ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি , উৎপাদনে গতিশীলতা এবং মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণ আনতে না পারে তাহলে তা হবে জাতির জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক। এজন্য প্রয়োজন বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বৃদ্ধি। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জনের পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। বেশ কিছুদিন থেকে লক্ষ্য করা যাচ্ছে বিনিয়োগ কর্মসংস্থান ,কৃষি এবং ব্যাংকিং খাতের মত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে মন্থর গতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। অর্থনীতিকে সচল রাখার জন্য মূল ইঞ্জিন গুলো আবার দ্রুত সক্রিয় করতে হবে পাশাপাশি অর্থনীতিতে গতি না আসার সুনির্দিষ্ট কারণ সমূহ চিহ্নিত করতে হবে। বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় সংকট হলো জ্বালানি সংকট। এ সংকট শুধু উৎপাদন ও ব্যবসাকেই ব্যাহত করছেনা বরং পুরো অর্থনীতিকে স্থবির করে দিয়েছে। তাই স্থবিরতা কাটাতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। বিশেষ করি জ্বালানি সংকট সমাধানের টেকসই সমাধান নিশ্চিত করতে হবে। অর্থনীতিকে গতিশীল ও টেকসই করতে প্রয়োজন বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও বিনিয়োগের পরিবেশ নিশ্চিত করা। দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীরা যাতে সহজে আমাদের অর্থনীতিতে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হয় সেজন্য একটি নিরাপদ উপযোগী অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। বেসরকারী খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও অর্থনীতিকে কাঙ্ক্ষিত পরিবেশ তৈরি করতে পারলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে সহায়তা হবে।
মানুষের আয় ও ঋণ পরিস্থিতি : বর্তমানে মানুষের আয় কমছে আর মাথা পিছু ঋণ বেড়েই চলেছে। রাজস্ব আদায়ের হারও কমছে। নতুন বিনিয়োগ হচ্ছে না ফলে উৎপাদনে মন্দা। ফলে রাজস্ব আদায়ের হারও কমছে। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি বাড়ছে সামাজিক নিরাপত্তার আওতা। এছাড়াও বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) আসছে নতুন নতুন প্রকল্প। এ ব্যয় মেটাতে দেশী-বিদেশী ঋণই একমাত্র ভরসা। বিদায়ী অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ব্যাংক থেকে ৪৭ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়েছে সরকার। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে সরকারের ঋণের পরিমাণ হলো ১২ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা। অন্যদিকে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পেছনেও অন্যতম কারণ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের শর্তপূরণ। বিশ্লেষকদের মতে, ইতোমধ্যে দেশ এক ধরনের ঋণের ফাঁদে পড়েছে। তাই ঋণ পরিশোধ এখন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যয়ের খাত। এছাড়াও ২০২৭ সালে আরও কিছু ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হবে। এ অবস্থায় ঋণ আরও বাড়লে পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে তা বলা কঠিন। বিষয়টি হলো , ঋণ নেওয়া সমস্যা নয়। পরিশোধের অক্ষমতাই বড় বিপদ।
বিনিয়োগকারীদের আস্থা : জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে অনেকে বলছিলো নির্বাচন হলে সব পরিবেশ ঠিক হয়ে যাবে। বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনে দ্রুত গতি ফিরে আসবে। কিন্তু এখনো বিনিয়োগ ও উদ্যোগক্তাদের মধ্যে আস্থার সংকট পরিলক্ষিত হচ্ছে। দেশের যে বিশাল উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত চাহিদা তৈরি হয়েছে,তা পূরন করতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণে বিনিয়োগকারীদের জন্য স্বস্তিদায়ক পরিবেশ তৈরির ওপর জোর দিতে হবে। ভিয়েতনামে মৌলিকভাবে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে ফলে তাদের শত বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ এসেছে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন দেশে শক্তিশালী সুশাসন ও জবাবদিহিতা। তাছাড়া ব্যাংক খাতের বর্তমান পরিস্থিতি সুশাসনের প্রয়োজনীয়তা আরো স্পষ্ট হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণে বিনিয়োগকারীদের জন্য স্বস্তিদায়ক পরিবেশ তৈরি করতে হবে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা নিশ্চিত করতে স্বচ্ছ, স্থিতিশীল ও বিনিয়োগবান্ধব নীতিপরিবেশ প্রয়োজন। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত, বৃহৎ শিল্পখাত ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে পর্যালোচনার মাধ্যমে বিনিয়োগ, উদ্ভাবন ও টেকসই প্রবৃদ্ধির অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা যেতে পারে।
এছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ক্লাউড প্রযুক্তি, ডিজিটাল সেবা ও আধুনিক ডেটা অবকাঠামো দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। এজন্য বিনিয়োগের কোন বিকল্প নেই। বিনিয়োগে শুধু ব্যাংক খাতকে ব্যবহার না করে পূঁজিবাজারকে কাজে লাগাতে হবে। পূজি বাজার হলো অর্থ সরবরাহের বিরাট ক্ষেত্র। অর্থায়নের জন্য প্রচলিত উৎসের বাইরে বিকল্প ফাইন্যান্সিং বাড়াতে পুঁজিবাজার শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিতে হবে।
ব্যাংক ও আর্থিক খাতের সংস্কার: সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে হলে মূল্যস্ফীতির একটি টেকসই সমাধান বের করতে হবে। সেজন্য ব্যাংক ও আর্থিক খাতের ভূমিকা রয়েছে। বর্তমানে ব্যাংক খাতের যে নাজুক পরিস্থিতি তাতে বিনিয়োগের পরিবেশ ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনাও একটা বড় চ্যালেঞ্জ। অর্থনীতিকে সঠিকভাবে এগিয়ে নিতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব ও ভূমিকা যথাযথভাবে পালন করতে হবে। ব্যাংক খাতের বর্তমান অনিয়ম ও সমস্যা গুলো দূর করে সেখানে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা আবশ্যক যাতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের উন্নয়নের প্রক্রিয়ায় আস্থার সাথে অংশ নিতে পারে। খেলাপি ঋণের উর্ধ্বমূখী অবস্থা থেকে ব্যাংক গুলোকে বের হয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্রাবিলিটি রিপোর্ট ২০২৫ অনুযায়ী গত বছর সংকটাপন্ন ঋণের পরিমাণ ছিল ১০ লাখ ৯১ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা। তখন মোট বিতরণ করার ঋণ ছিল ১৮ লাখ ২০ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা তার মানে প্রায় ৬০ শতাংশ ঋণই সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে। ২০২৬ সালের জুন শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। এটি ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ।রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান পর্যালোচনা এবং দেশী-বিদেশী প্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষায় অনিয়ম, জালিয়াতি ও বেনামি ঋণের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে এসেছে। ফলে আগে আড়ালে থাকা বিপুল ঋণ এখন খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। এ ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে ব্যাংক খাতকে রক্ষা করতে হলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের সম্পদ জব্দ ও অর্থ আদায়, দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি, ব্যাংকের পরিচালনা ও ঋণ অনুমোদনে রাজনৈতিক প্রভাব বন্ধ এবং নতুন করে খারাপ ঋণ সৃষ্টি ঠেকাতে হবে। এগুলো ধারাবাহিকভাবে করা গেলে পর্যায়ক্রমে খেলাপি ঋণ কমতে পারে।
কর্মসংস্থান বান্ধব ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বড় অংকের পেছনে না ছুটে দেশের সামগ্রিক অবকাঠামো গত পরিবর্তনকে এমনভাবে পরিচালনা করতে হবে যেন তার প্রকৃত সুফল সমাজের প্রত্যেক স্তরের মানুষের পরিলক্ষিত হয়। একটি টেকসই ভারসাম্যপূর্ণ জনবান্ধব অর্থনীতি ও সমাজ গঠনে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের কোন বিকল্প নেই। এজন্য গতানুগতিক ধারায় চললে চলবেনা। কাঠামোগত সংস্কার বেসরকারি বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি এবং সাধারণ মানুষের জীবন যাত্রার মান সুরক্ষার জন্য সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক ও ব্যাংকার।
