নদীতে মাছ ধরা বন্ধ, ঘাটে সারি সারি নোঙর করা নৌকা। তীরে পড়ে আছে জাল, নিস্তব্ধ মাছবাজার ও আড়ত। মা ইলিশ রক্ষায় সরকারের ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা মেনে সাগরে নামছেন না হাতিয়ার জেলেরা। কিন্তু মাছ ধরা বন্ধ থাকলেও থেমে নেই সংসারের খরচ। তার ওপর সরকারি সহায়তা মিলছে না অনেকেরই। ফলে খাবার জোগানো, নৌকার কিস্তি পরিশোধ, শ্রমিকের মজুরি ও পুরোনো দেনা সামলাতে গিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন জেলে পরিবারের সদস্যরা।
হাতিয়ার মেঘনা নদী ও বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক মৎস্য অর্থনীতিতে নিষেধাজ্ঞার প্রভাব পড়েছে সর্বত্র। মৎস্য কার্যালয়ের তথ্যমতে, উপজেলায় নিবন্ধিত জেলে ২৪ হাজার ৬০ জন। তাদের মধ্যে ১৫ হাজার জনের জন্য ২৫ কেজি করে চাল বরাদ্দ এসেছে। অর্থাৎ নিবন্ধিত জেলেদের একটি বড় অংশই এই বরাদ্দের বাইরে রয়েছেন। অন্যদিকে, উপজেলার ছোট-বড় প্রায় ২০টি মাছঘাটে রয়েছে প্রায় ১০ হাজার মাছ ধরার নৌকা। এসব নৌকায় কাজ করেন বিপুলসংখ্যক জেলে ও মাঝি-মাল্লা। তাদের পাশাপাশি আড়তদার, মাছ ব্যবসায়ী, বরফকলের শ্রমিক ও পরিবহনকর্মীদের জীবিকাও নির্ভর করে মাছ ধরা ও বিক্রির ওপর।
ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষায় ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে সরকার। এ সময়ে মাছ ধরা, পরিবহন ও বিপণন বন্ধ থাকায় কর্মহীন হয়ে পড়েছেন মৎস্য খাতের সঙ্গে যুক্ত বহু মানুষ। নিষেধাজ্ঞা মেনে চললেও প্রয়োজনের তুলনায় কম সহায়তা পাওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে জেলেদের মধ্যে।
উপজেলার সূর্যমুখী মাছঘাটে গিয়ে দেখা যায়, মাছবাজারজুড়ে সুনসান নীরবতা। খালের পাশে তাঁবু টাঙিয়ে কেউ পুরোনো জাল মেরামত করছেন, কেউ নতুন জাল বুনছেন। কেউ আবার সারাচ্ছেন ট্রলারের ছোটখাটো ত্রুটি। নিষেধাজ্ঞা শেষ হলে আবার সাগরে নামতে হবে, তাই প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা। তবে মাছ ধরে দেনা শোধ করে সংসারে স্বস্তি ফেরানোর স্বপ্ন দেখলেও হাতে টাকা না থাকায় অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তাদের।
জেলে মনির হোসেন বলেন, আয় বন্ধ, কিন্তু খরচ থেমে নেই। পরিবারের খাবার, সন্তানদের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও নৌকা পরিচালনার খরচ মেটাতে হচ্ছে। মৌসুমের শুরু থেকেই আশানুরূপ মাছ পাইনি। নিষেধাজ্ঞার আগে শেষ দিকে মাছ কিছুটা বেশি পেলেও সেই আয় দিয়ে পুরোনো দেনা শোধ করা সম্ভব হয়নি। সরকার যে আইন দিয়েছে, আমরা তা মানছি। কিন্তু সরকারি কোনো সহযোগিতা না পাওয়ায় পরিবার-পরিজন নিয়ে খুব কষ্টে দিন কাটছে।
প্রায় ২০ বছর ধরে মাছ ধরার পেশায় থাকা আকবর হোসেনের দুর্ভোগ আরও বেশি। তিনি বলেন, নদীতেই আমাদের জীবন-মরণ। এখনো একটি জেলে কার্ড পাইনি। মৌসুমের শুরুতে তেমন মাছ পাইনি। যখন মাছ পাওয়া শুরু হয়েছে, তখনই সরকার ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। সরকারের আইন মেনে সাগরে নামিনি। কিন্তু আমার পরিবারে আট থেকে ১০ জন সদস্য। সরকারি কোনো সহযোগিতা না পাওয়ায় খুব কষ্টে দিন কাটছে।
জেলে কার্ড থাকা সত্ত্বেও সহায়তা না পাওয়ার অভিযোগ নবীর উদ্দিনের। তিনি বলেন, আমরা পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞা মেনে চলছি। আমার জেলে কার্ড আছে, কিন্তু এক মুঠো চালও পাইনি। ছয় বছর আগে কার্ড করেছি। এ পর্যন্ত মাত্র দুইবার চাল পেয়েছি। আমরা কীভাবে চলি, আমাদের সংসার কীভাবে চলে, তা একমাত্র আল্লাহই জানেন। এখন সহায়তা না পেলে আর কবে পাব?
জেলেদের পাশাপাশি লোকসানে পড়েছেন মাছ ব্যবসায়ীরাও। সূর্যমুখী ঘাটের মাছ ব্যবসায়ী কামাল উদ্দিন বলেন, এই ঘাটে প্রায় দুই হাজার জেলে রয়েছেন। তাদের মধ্যে মাত্র ২৬০ জনের জেলে কার্ড আছে। কার্ডধারীদের মধ্যেও ১০০ থেকে ১২০ জনের মতো চাল পান। সরকার যে আইন করেছে, জেলেরা তা মানছেন। কিন্তু তাদের যে সহযোগিতা পাওয়ার কথা, তা পাচ্ছেন না। এতে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। আমরা আড়তদাররাও লোকসানে আছি। মাছ ধরার মৌসুমে অভিযান শুরু হওয়ায় জেলেদের কাছে পাওনা টাকা আদায় করতে পারিনি।
সহায়তা না পাওয়ার অভিযোগের বিষয়ে হাতিয়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফয়জুর রহমান বলেন, হাতিয়ায় লক্ষাধিক জেলের মধ্যে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ২৪ হাজার ৬০ জন। তাঁদের জন্য বরাদ্দ এসেছে মাত্র ১৫ হাজার জেলের। ইউনিয়নভিত্তিক চাল বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বরাদ্দের তুলনায় জেলের সংখ্যা বেশি হওয়ায় সবাইকে সহায়তা করা সম্ভব হয়নি। তবে অন্যান্য উপজেলার তুলনায় হাতিয়ার জেলেরা নিষেধাজ্ঞা মেনে চলছেন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে বরাদ্দ বাড়ানোর চেষ্টা করব।
