গত ক’দিন লুচি, খিচুড়ি, ইলিশ, মাটন... পুজোর আনন্দের আতিশয্যে ভাজাভুজি, মিষ্টি, নরম পানীয় যথেচ্ছ খাওয়া হয়েছে। এ বার নিয়মে ফেরার পালা। অতিরিক্ত যে ওজন বেড়েছে, তা কমিয়ে ফেলা জরুরি। রাত জেগে ঠাকুর দেখা, খাওয়াদাওয়ার অনিয়ম— পুজো মিটে গেলেও শারীরিক ক্লান্তি থেকে যায়। তার সঙ্গে পেট ফাঁপা, পেট খারাপ, কোষ্ঠকাঠিন্য, মাথা ব্যথা, জৌলুসহীন ত্বক... আনুষঙ্গিক নানা সমস্যা দেখা দেয়। সে সব কাটিয়ে ফের ঝরঝরে হতে এ সময়ে দরকার ডিটক্স ডায়েট।
কী করবেন?
ডিটক্স খাবার এবং ডিটক্স পানীয়— দুই মিলে একযোগে ডিটক্স ডায়েট। পুষ্টিবিদ কোয়েল পালচৌধুরী বলছেন, “একটানা দীর্ঘ দিন নয়, তিন থেকে সাত দিনের এই ডায়েটে মূলত জোর দেওয়া হয় জল, ফল ও আনাজের উপরে। এ সময়ে প্যাকেটজাত এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার না খাওয়াই ভাল। অতিরিক্ত নুন-যুক্ত চিপস, চানাচুর, ভুজিয়া বাদ দিন। নরম পানীয়, প্যাকেটজাত ফলের রসও এড়িয়ে চলুন।” অ্যালকোহল এবং তামাকজাত পণ্য কিছু দিন বন্ধ থাক। ওজন কমাতে চাইলে খাদ্যতালিকা থেকে মিষ্টি একেবারে বাদ দিতে হবে।
ডিটক্স ডায়েট
পুষ্টিকর ব্যালান্সড খাওয়াদাওয়া, যেখানে অতিরিক্ত তেলমশলা, অ্যাডিটিভিস, প্রিজ়ারভেটিভস থাকবে না। সুতরাং শরীরকে ডিটক্স করতে প্রথমেই চিপস, ইনস্ট্যান্ট নুডলসের মতো খাবার বাদ দিন। কোয়েল বলছেন, “বাইরের খাবার ছেড়ে ঘরোয়া খাবার খান। রান্নায় তেল, ঘি, মাখনের ব্যবহার কমান। হালকা সহজপাচ্য খাবার খান। খিচুড়ি, ডালিয়া সুষম খাবার, তা খেতে পারেন। তবে পুজোর মতো ঘি, মশলা দিয়ে নয়, হালকা ভাবে তৈরি করুন। বাড়িতে পাতা দই উপকারী।” সকালের জলখাবারে ওটস, দই খেতে পারেন। তার সঙ্গে মরসুমি ফল, ড্রাই ফ্রুটস মিশিয়ে নিন। পেট ভরবে, স্বাস্থ্যকরও হবে। চিড়ে, সুজি, কর্নফ্লেক্স খাওয়া যায়। ওজন কমাতে হলে কার্বোহাইড্রেটস কমিয়ে প্রোটিন ও ফাইবার জাতীয় খাবার বেশি খান। চিকেন, ডিম, মাছ যেন অবশ্যই রোজকার খাদ্যতালিকায় থাকে। তবে পাঁঠার মাংস বাদ দিতে হবে। সবুজ আনাজপাতি ও মরসুমি ফল খাবারে বেশি থাকুক। যে সব ফল এবং সবজিতে জল ও ফাইবারের ভাগ বেশি, খাবার তালিকায় সেগুলো পরিমাণে বেশি রাখুন। বাঙালি রান্নায় ব্যবহৃত মশলাপাতিতে অ্যান্টি-ইনফ্লামেটরি গুণ থাকে। শরীরকে ডিটক্স করতে সেগুলো উপকারী। তবে তরকারি খাওয়ার ইচ্ছে না থাকলে সুপ বা স্মুদি বানিয়েও খেতে পারেন। খাওয়ার পাতে রাখুন স্যালাড।
চিয়া, তিসি, সূর্যমুখী, তিল সব ধরনের বীজ খাওয়াই ভাল। সকালের জলখাবারে সব ধরনের বীজ ভিজিয়ে রেখে ওটসের সঙ্গে খেতে পারেন। মুখরোচক কিছু খেতে হলে এই বীজ দিয়েই বেকড চিপস বানিয়ে নিতে পারেন। খেতে ভাল লাগবে, স্বাস্থ্যকরও হবে। তা ছাড়া, ড্রাই ফ্রুটস, স্ন্যাক্সে ছোলা, মটর, মাখানার মতো খাবারও রাখতে পারেন।
ডিটক্স ওয়াটার
কোয়েলের পরামর্শ, বিপাক হার বাড়াতে খান ডিটক্স ওয়াটার। সারা দিনে চার থেকে পাঁচ লিটার জল খেতেই হবে। জলের সঙ্গে সঙ্গে শরীর থেকে টক্সিন বার হয়ে যায়। বজায় থাকবে ত্বকের আর্দ্রতাও। শুধু জলের পরিবর্তে ইনফিউজ়ড ওয়াটার খেতে পারেন, তাতেও শরীরের ডিটক্স ক্রিয়া বাড়বে। সাধারণ জল একটা বোতলে ভরে তাতে নানা ফল বা আনাজ টুকরো করে কেটে, হার্বস দিয়ে ৫-৬ ঘণ্টা ফ্রিজে রেখে দিলেই তৈরি হয়ে যাবে ইনফিউজ়ড ওয়াটার। ফলের খোসা সমেত টুকরো করতে হবে। সারা দিনে সেই জল অল্প অল্প করে খাওয়া যেতে পারে। তবে একবারে বেশি পরিমাণে বানাবেন না। এক বোতল জল বানানোর দেড় থেকে দু’ঘণ্টার মধ্যে শেষ করে ফেলা ভাল। রাতের বেলা এক গ্লাস জলে মৌরি, মেথি ভিজিয়ে রাখুন। পরের দিন সেই জল যে কোনও সময়ে খেতে পারেন। এতে অ্যান্টিঅক্সিড্যান্টস থাকে। মৌরি-মেথি ভেজানো জল অ্যাসিডিটি দূর করে এবং হজমে সহায়ক।
শরীর থেকে টক্সিন দূর করা, ওজন কমানো, ত্বক ভাল রাখা ছাড়াও রক্তচাপ, কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণেও সাহায্য করবে ডিটক্স জুস। ফল-আনাজের রস শরীরকে হাইড্রেটেড রাখবে, চনমনে ভাব ফিরিয়ে আনবে, ক্লান্তি কাটাবে। পছন্দ মতো মরসুমি ফল, আনাজ দিয়ে জুস বানাতে পারেন। শসা, আপেল, আঙুর, তরমুজ, গাজর, বিট, লেবু, আদা, পালং, পার্সলে, সেলেরি, পুদিনা, আমলকী... পছন্দ মতো তিন-চারটে উপাদান বেছে নিয়ে জুস বা স্মুদি তৈরি করে খেতে পারেন। তবে তাতে আলাদা করে চিনি দেবেন না। ডায়েটে নানাবিধ ফলের রস যোগ করলে ওজন কমানোও সহজ হয়। এই সময় আবহাওয়ার বদল হয়। জ্বর, সর্দিকাশি বেড়ে যায়। খাদ্যতালিকায় ভিটামিন সি, অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট সমৃদ্ধ খাবারদাবার রাখা ভাল। গ্রিন-টি বা কোনও ভেষজ চা দিনে কয়েক বার খেতেই পারেন। তবে কফি খাওয়ার পরিমাণ কমান। রোজ একই ধরনের ডিটক্স পানীয় খাওয়ার বদলে পাল্টে পাল্টে খেতে পারেন। এই সময় থেকেই বাতাসে শুষ্কতার পরিমাণ বাড়ে। ফলে শরীরে অতিরিক্ত জলের প্রয়োজন হয়।
- লেবু-পুদিনা, আপেল-দারুচিনি, শসা-লেবু-পুদিনা-আদা ইত্যাদি খুব পরিচিত ডিটক্স ওয়াটার।
- ডাবের জল খান নিয়মিত।
- আগের রাতে জলে মৌরি ভিজিয়ে রাখুন। পরের দিন ছেঁকে খান। ডায়াবিটিসের সমস্যা না থাকলে এর মধ্যে মিছরি বা বাতাসা দিতে পারেন। শরীর ঠান্ডা হবে।
- সকালের জলখাবারের সঙ্গে এবিসি জুস, অর্থাৎ আপেল, বিট, গাজর একসঙ্গে ব্লেন্ড করে স্মুদি বানিয়ে খান। স্বাদ বাড়াতে লেবুর রস দিতে পারেন।
- ক্যারট-পার্সলে জুসও উপকারী। তাতে আদা ও পাতিলেবুর রস দিন। ভিটামিন এ, সি সমৃদ্ধ এই জুস কোলেস্টেরল, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করবে।
- চিয়া সিডস শরীরের জন্য ভাল। রাতেই এক গ্লাস জলে ১ চা-চামচ চিয়া সিডস ভিজিয়ে দিন। সকালে ফুলে উঠলে খেয়ে নিন। এতে ফাইবার আছে। পেট পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করবে।
সময় মেনে খেতে হবে
অবেলায় খাওয়াদাওয়ায় শরীর বেশি খারাপ হয়। উৎসবের দিনে নিয়ম মেনে চলা সম্ভব হয় না সব সময়ে। তবে এ বার ডিটক্স ডায়েটের সঙ্গে ঘড়ির কাঁটার দিকেও খেয়াল রাখতে হবে। কোয়েল বলছেন, “রাতের খাওয়াদাওয়া তাড়াতাড়ি সারুন। বেলা অবধি খালি পেটে থাকবেন না। পরিমিত আহার জরুরি। একসঙ্গে অনেকটা খাওয়া, দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকা দুটোই ক্ষতিকর। সঙ্গে দরকার পর্যাপ্ত বিশ্রাম।” বেশি রাত জাগলে তার প্রভাব চেহারাতে তো বটেই, স্বাস্থ্যেও পড়ে। ক্লান্তি কাটাতে তাই খাওয়াদাওয়ার পাশাপাশি ভাল করে ঘুমাতে হবে। সঙ্গে শারীরচর্চা করুন। প্রয়োজনে ডিজিটাল ডিটক্স অর্থাৎ সমাজমাধ্যম, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো থেকে কিছু দিন নিজেকে সরিয়ে রাখুন। বিশেষত, ঘুমের আগে মোবাইল থেকে দূরে থাকুন।
আমাদের শরীরের ডিটক্সিফিকেশনের নিজস্ব কিছু ব্যবস্থা রয়েছে। কিডনি, লিভার নিজেরাই বর্জ্য পদার্থ শরীর থেকে বার করে দিতে পারে। তাই প্রয়োজন থাকলে ডিটক্স ডায়েট করুন। ডিটক্স ডায়েট ও ওয়াটারের মাধ্যমে শরীরে কিছু উপকারী খনিজ, ভিটামিন ঢোকে, যা ক্লান্তি কাটাতে, শরীরকে চনমনে করতে পারে। কোনও শারীরিক সমস্যা থাকলে পুষ্টিবিদ বা চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ডায়েট করুন।
