সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ আধুনিক প্রযুক্তির অন্যতম মৌলিক উপাদান। বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর বা চিপের বাজার যখন বিলিয়ন থেকে ট্রিলিয়ন ডলারের দিকে এগোচ্ছে, তখন বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়? এ প্রশ্নের উত্তরে যে জবাব পাওয়া যায় তা আশাব্যঞ্জক নয়। তবে সরকারের জাতীয় সেমিকন্ডাক্টর টাস্কফোর্স গঠন এবং উল্কাসেমি ও নিউরাল সেমিকন্ডাক্টরের মতো প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগ আশার আলো দেখাচ্ছে।
একটি টি-শার্ট রপ্তানি করে বাংলাদেশ যে আয় করে, তার তুলনায় চিপের নকশা ও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলসেবা থেকে অনেক বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সুযোগ রয়েছে। কারণ চিপ ডিজাইনে বড় কারখানা বা বিপুল কাঁচামাল লাগে না। প্রয়োজন দক্ষ প্রকৌশলী, উন্নত সফটওয়্যার ও আন্তর্জাতিক গ্রাহকের আস্থা। এই সক্ষমতা কাজে লাগাতে পারলে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি শক্তিশালী জ্ঞানভিত্তিক নতুন রপ্তানি খাত গড়ে উঠতে পারে। তবে সম্ভাবনাকে বাস্তব শিল্পে রূপ দিতে দক্ষতা, অবকাঠামো, নীতির ধারাবাহিকতা ও প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
বাড়ছে চিপের চাহিদা
চিপ বা সেমিকন্ডাক্টর আধুনিক ইলেকট্রনিক যন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সিলিকনের অতি ক্ষুদ্র ও পাতলা পাতের (ওয়েফার) ওপর কোটি কোটি ট্রানজিস্টর, রেজিস্টর ও ক্যাপাসিটর বিশেষ বিন্যাসে সাজিয়ে যে সমন্বিত সার্কিট তৈরি করা হয়, তা-ই চিপ বা ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ফাইভজি নেটওয়ার্ক, বৈদ্যুতিক যানবাহন ও বিশাল ডেটা সেন্টারের বিশ্বব্যাপী প্রসারের কারণে চিপের চাহিদা এখন তুঙ্গে। আধুনিক প্রতিটি স্মার্টফোনে ডজনখানেক এবং একটি বৈদ্যুতিক গাড়িতে কয়েক হাজার পর্যন্ত চিপের প্রয়োজন হয়। বৈশ্বিক এই প্রযুক্তি দৌড়ে সেমিকন্ডাক্টর ছাড়া আধুনিক সভ্যতার চাকা সচল রাখা অসম্ভব।
আরও পড়ুন
বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফরচুন বিজনেস ইনসাইটসের তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর বাজারের আকার ২০২৫ সালে ছিল ৫৯৮ দশমিক শূন্য ৬ বিলিয়ন ডলার। ২০২৬ সালে তা ৬৫৯ দশমিক ৬৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। ২০৩৪ সালে বাজারের আকার ১ হাজার ৪৭৭ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হওয়ার পূর্বাভাসও দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এই খাতের প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। একটি এআই সার্ভারে সাধারণ সার্ভারের চেয়ে ১০ গুণ বেশি চিপ ও মেমোরি মডিউল লাগে।
বৈশ্বিক বাণিজ্য ও ভূ-রাজনীতি
আধুনিক প্রযুক্তির এই যুগে সেমিকন্ডাক্টর বা মাইক্রোচিপ কেবল একটি সাধারণ ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ নয়; বরং এটি বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), স্মার্টফোন, ক্লাউড কম্পিউটিং থেকে শুরু করে অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম–সবকিছুরই মূল মস্তিষ্ক হলো এই চিপ। ফলে এই চিপের বাজার ও সরবরাহব্যবস্থা এখন আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
আরও পড়ুন
বিশ্বের ৯০ শতাংশের বেশি অত্যাধুনিক চিপ তৈরি হয় তাইওয়ানে, যার সিংহভাগ উৎপাদন করে তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি (টিএসএমসি)। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার চলমান প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় তাইওয়ানের ওপর এই একক নির্ভরতাকে বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য একটি বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি কমাতে বহুজাতিক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এখন উৎপাদন ও নকশার কাজ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে দিচ্ছে। এই কৌশলগত প্রবণতা ‘তাইওয়ান প্লাস ওয়ান’ বা ‘চীন প্লাস ওয়ান’ নামে পরিচিত। বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার এই পালাবদলে বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।
শিল্পের তিনটি ব্যবসায়িক মডেল
সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের কাজকে মোটামুটি তিনটি ভাগে দেখা যায়। ফ্যাবলেস প্রতিষ্ঠান চিপের নকশা তৈরি করে, কিন্তু নিজস্ব উৎপাদন কারখানা চালায় না। এনভিডিয়া ও কোয়ালকম এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের উদাহরণ। ফাউন্ড্রি অন্য প্রতিষ্ঠানের নকশা অনুযায়ী সিলিকন ওয়েফারে চিপ তৈরি করে। তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি (টিএসএমসি) এ ক্ষেত্রে পরিচিত নাম। আর অ্যাসেম্বলি, টেস্টিং ও প্যাকেজিং (এটিএমপি) ধাপে চিপ জোড়া লাগানো, পরীক্ষা করা এবং ব্যবহারের উপযোগী করে প্যাকেটজাত করা হয়।
এই তিন ধাপে বিনিয়োগ ও অবকাঠামোর চাহিদা এক নয়। নকশা ও যাচাইয়ের জন্য দক্ষ প্রকৌশলী, কম্পিউটার এবং ইলেকট্রনিক ডিজাইন অটোমেশন (ইডিএ) সফটওয়্যার প্রয়োজন। বিপরীতে, চিপ উৎপাদনের কারখানা বা ফ্যাব স্থাপনে বিপুল পুঁজি, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, অতি বিশুদ্ধ পানি ও অত্যাধুনিক অবকাঠামো লাগে। তাই বাংলাদেশের জন্য শুরুতে নকশা ও যাচাইয়ের কাজ সম্প্রসারণ করা তুলনামূলকভাবে বাস্তবসম্মত। পরবর্তী ধাপে এটিএমপি এবং দীর্ঘ মেয়াদে ফ্যাব্রিকেশন নিয়ে ভাবা যেতে পারে।
সরকারি উদ্যোগ ও লক্ষ্য
বৈশ্বিক প্রযুক্তির বাজারে দীর্ঘদিন পর্দার আড়ালে থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেমিকন্ডাক্টর খাতে বাংলাদেশের নাম জোরেশোরে আলোচনায় আসছে। এর পেছনে রয়েছে কৌশলগত নীতিনির্ধারণী উদ্যোগ এবং তরুণ প্রকৌশলীদের দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা।
গত বছরের ১ জানুয়ারি সরকার বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নেতৃত্বে ১৩ সদস্যের একটি ‘জাতীয় সেমিকন্ডাক্টর টাস্কফোর্স’ অনুমোদন করে। এই টাস্কফোর্সে তিনজন শিক্ষাবিদ, তিনজন দেশীয় শিল্প প্রতিনিধি, তিনজন প্রবাসী বাংলাদেশি ও চারজন সরকারি প্রতিনিধি রয়েছেন। টাস্কফোর্সের মূল দায়িত্ব ছিল দেশের সক্ষমতার ঘাটতি চিহ্নিত করা এবং একটি স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করা। গত বছরের জুলাইয়ে টাস্কফোর্স ২৩ দফা সুপারিশমালা পেশ করে, যেখানে চিপ ডিজাইন এবং এটিএমপি বা টেস্টিং-প্যাকেজিং খাতের ওপর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়।
এর পাশাপাশি ‘বাংলাদেশ সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন’ ‘সিলিকন রিভার’ নামে একটি ক্যাম্পেইন শুরু করেছে। তাদের মূল লক্ষ্য হলো, ২০৩০ সালের মধ্যে এই খাত থেকে ১০০ কোটি মার্কিন ডলার রপ্তানি আয় নিশ্চিত করা। সরকারের পক্ষ থেকেও চিপসংশ্লিষ্ট কাঁচামাল, সফটওয়্যার ও যন্ত্রপাতিতে শুল্ক, ভ্যাট ও অগ্রিম কর ২০৩১ সাল পর্যন্ত প্রত্যাহার করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, যা বিনিয়োগের পরিবেশকে অনেকটাই অনুকূল করেছে।
সরকারের টাস্কফোর্স গঠন ও ২০৩১ সাল পর্যন্ত কাঁচামালে শুল্ক-ভ্যাট তুলে দেওয়ার বিষয়ে উল্কাসেমির সিইও ও প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ এনায়েতুর রহমান বলেন, ‘এটি ইতিবাচক সংকেত, কারণ প্রথমবার রাষ্ট্র এই খাতকে একটু বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে আমাদের আসল সম্পদ কাঁচামাল নয়, দক্ষতা। কাঁচামাল আমদানির চেয়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ-ইন্টারনেট, সহজ লেনদেন আর দক্ষ জনবল বেশি জরুরি। নীতির সুফল মাঠে পৌঁছাতে সময় লাগে। সেই পথ যত ছোট হবে, উপকার তত বাড়বে। তবে আমরা টুলস কেনার ক্ষেত্রে শুল্কছাড়ের সুবিধা পেয়েছি। সরকার টেস্টিং ও প্যাকেজিংয়ের প্রশিক্ষণ নিয়ে কাজ করছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। এই বিষয়গুলো সত্যিই প্রশংসনীয়।’
দেশে কী হচ্ছে
কাগজে-কলমে বড় বড় ঘোষণা ও রোডম্যাপ থাকলেও মাঠপর্যায়ে এই শিল্পের যাত্রা এখনো প্রাথমিক ও ছোট পরিসরে সীমাবদ্ধ। বর্তমানে দেশে ১২ থেকে ১৫টি সক্রিয় চিপ ডিজাইন ও ভিএলএসআই সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। এর মধ্যে উল্কাসেমি, নিউরাল সেমিকন্ডাক্টর ও প্রাইমসিলিকন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
এই প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত বিদেশি ফ্যাবলেস কোম্পানির সাব-কন্ট্রাক্টে ডিজাইন ভেরিফিকেশন, ফিজিক্যাল ডিজাইন এবং ফার্মওয়্যারের মতো জটিল ও নিখুঁত কাজ করে থাকে। সরেজমিনে কয়েকটি ডিজাইন সেন্টারে গিয়ে দেখা যায়, দেশীয় প্রকৌশলীরা ব্যয়বহুল লাইসেন্সভিত্তিক সফটওয়্যার ব্যবহার করে কাজ করছেন। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মীসংখ্যা ৫০ এর অধিক।
তবে আন্তর্জাতিক গ্রাহকদের গোপনীয়তা রক্ষা চুক্তির (এনডিএ) কারণে এই প্রকৌশলীরা কোন বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডের পণ্যের নকশা করছেন, তা প্রকাশ্যে জানাতে পারেন না। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মানের ক্লিনরুম, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, বিশুদ্ধ পানি এবং বন্ডেড ওয়্যারহাউসের মতো যেসব সুবিধা এই শিল্পের জন্য প্রয়োজন, তা হাইটেক পার্কগুলোতে এখনো গড়ে ওঠেনি।
সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে বাংলাদেশের সম্ভাবনা নিয়ে খবরের কাগজের সঙ্গে কথা বলেন উল্কাসেমির সিইও ও প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ এনায়েতুর রহমান। উল্কাসেমির শুরুর গল্প প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘২০০৭ সালে যখন শুরু করি, বাংলাদেশ থেকে চিপ ডিজাইনের কথা কেউ ভাবত না। এমনকি আমি যখন দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিই, প্রবাসী বন্ধুরাও সেখানকার সুন্দর ও সুনিশ্চিত ভবিষ্যৎ ছেড়ে দেশে ফেরাকে পাগলের প্রলাপ ভেবেছিল। দেশে ফেরার পর যখন মাত্র চারজন প্রকৌশলী নিয়ে উল্কাসেমির যাত্রা শুরু হয়, তখন আমাদের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল ক্লায়েন্ট খুঁজে বের করা। এএমডিসহ বেশ কয়েকটি কোম্পানিতে চাকরির সুবাদে পরিচিতি থাকলেও ‘বাংলাদেশে এ কাজ হয়?’–বিদেশি ক্লায়েন্টদের এই সংশয় ভেঙে কাজের মাধ্যমে তাদের আস্থা অর্জন করাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা মূলত প্রকল্পভিত্তিক কাজ করি। একটি চিপের নকশা সম্পন্ন করতে ছয় মাস থেকে শুরু করে এক থেকে তিন বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। উল্কাসেমি চিপের প্রাথমিক নকশা (আরটিএল) তৈরি থেকে শুরু করে উৎপাদন-উপযোগী চূড়ান্ত নকশা (জিডিএস টু) প্রস্তুত করা এবং চিপ তৈরির পর সেটি সঠিকভাবে কাজ করছে কি না, তা পরীক্ষার কাজও করে থাকে।’
একটি টি-শার্টের সঙ্গে চিপ ডিজাইনের মূল পার্থক্য হলো এর প্রযুক্তিগত জটিলতা ও জ্ঞানভিত্তিক মূল্য। দিন যত যাচ্ছে, প্রযুক্তি তত উন্নত ও জটিল হচ্ছে। আর এই জটিল প্রযুক্তিকে কার্যকর করতে প্রয়োজন হচ্ছে আরও উন্নত চিপ। বিশেষ করে, চিপের নোড সাইজ যত ছোট হয়, সীমিত জায়গার মধ্যে কোটি কোটি ট্রানজিস্টর স্থাপন, সেগুলোর মধ্যে সংযোগ তৈরি এবং সংকেত চলাচলের পথ নির্ধারণ তত বেশি জটিল হয়ে ওঠে।
এ ধরনের নকশায় প্রয়োজন হয় উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন প্রকৌশলী, উন্নত প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম, দীর্ঘ সময়ের গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা। একটি ছোট নকশাগত ত্রুটিও পুরো চিপের কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলতে পারে। তাই চিপ ডিজাইন শুধু একটি পণ্য তৈরি নয়; এটি গভীর প্রযুক্তিগত জ্ঞান, প্রকৌশল দক্ষতা ও উদ্ভাবনের সমন্বয়। এ কারণেই একটি চিপের নকশা বিপুল অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি করতে পারে এবং এর মূল্য একটি সাধারণ ভোগ্যপণ্যের তুলনায় বহু গুণ বেশি হতে পারে।
মোহাম্মদ কামরুজ্জামান উল্কাসেমির বাংলাদেশ ডিজাইন সেন্টারে ভিপি হিসেবে যুক্ত আছেন। তার মতে, শুরুতে দেশে সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন অচেনা হলেও বর্তমানে এটি অমিত সম্ভাবনাময় খাত।
তিনি বলেন, একটি চিপের নকশা থেকে টেপ-আউট পর্যন্ত সাধারণত তিন থেকে ছয় মাস সময় লাগে। তবে জটিল সিস্টেম-অন-চিপ-এর ক্ষেত্রে এটি এক থেকে দুই বছর বা তার বেশি সময় লাগতে পারে। বাংলাদেশে বিশ্বমানের চিপ ডিজাইনের পথে প্রধান বাধা উন্নত ইডিএ টুলসের চড়া লাইসেন্স ফি, উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং অবকাঠামো ও প্রসেস টেকনোলজিতে প্রবেশাধিকারের অভাব এবং অভিজ্ঞ নেতৃত্বের ঘাটতি।
দক্ষ জনবল সম্পর্কে তিনি জানান, সংখ্যার চেয়ে গুণগত গভীরতা অত্যন্ত জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয় মূলত ফান্ডামেন্টাল শেখায়, তাই ফ্রেশ গ্র্যাজুয়েটদের উপযোগী করতে ৬ থেকে ১২ মাসের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রবাসীদের ফেরাতে কেবল আহ্বানের পরিবর্তে আধুনিক টুলস ও প্রতিযোগিতামূলক কাজের পরিবেশ তৈরির ওপর জোর দেন তিনি।
সবচেয়ে বড় সম্পদ দক্ষ জনবল
সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর তরুণ মানবসম্পদ। প্রতিবছর বুয়েট, কুয়েট, রুয়েট, চুয়েট, ঢাবিসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ইলেকট্রিক্যাল, ইলেকট্রনিকস ও কম্পিউটার সায়েন্স বিষয়ে ১০ থেকে ১২ হাজার স্নাতক বের হচ্ছেন। তবে ডিজিটাল আইসি ডিজাইন, ভেরিফিকেশন কিংবা ভিএলএসআই প্রযুক্তিতে সরাসরি কাজ করার মতো দক্ষ প্রকৌশলীর সংখ্যা দেশে এখনো এক হাজারের নিচে।
এই ঘাটতি পূরণে সবচেয়ে বড় ভরসা প্রবাসীরা। ইন্টেল, কোয়ালকম, এএমডি, মার্ভেল ও অ্যাপলের মতো বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৫০০ জন বাংলাদেশি সেমিকন্ডাক্টর প্রকৌশলী কাজ করছেন। তাদের সক্রিয় সহযোগিতা, পরামর্শ ও নেটওয়ার্কিংয়ের মাধ্যমে দেশের তরুণদের জন্য প্রশিক্ষণের নতুন দ্বার উন্মোচিত হতে পারে।
পাশাপাশি খরচের দিক থেকেও বাংলাদেশ প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা ভোগ করছে। রাজধানী ঢাকায় একটি ডিজাইন সেন্টারের পরিচালন ব্যয় ভারতের বেঙ্গালুরু শহরের তুলনায় ১৬ থেকে ২০ শতাংশ এবং ফিলিপিন্সের সেবুর তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ কম। এই ব্যয়সাশ্রয়ী পরিবেশই বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশে বিনিয়োগে আকৃষ্ট করার প্রধান চালিকাশক্তি হতে পারে।
কোন ধাপে বেশি সুযোগ
স্বল্প মেয়াদে বাংলাদেশের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত চিপ ডিজাইন, ভেরিফিকেশন ও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলসেবা। এ ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম মূলধনে প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যায়। আন্তর্জাতিক গ্রাহকের নির্ধারিত মান বজায় রাখতে পারলে দক্ষ কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয় বাড়ানো সম্ভব। ডিজাইন সেন্টার প্রতিষ্ঠার ব্যয় প্রতিষ্ঠানের আকার, সফটওয়্যার লাইসেন্স ও জনবলের ওপর নির্ভর করে।
মধ্য মেয়াদে, অর্থাৎ তিন থেকে পাঁচ বছরে এটিএমপি খাতে প্রবেশের প্রস্তুতি নেওয়া যেতে পারে। এ জন্য ক্লিনরুম, মান নিয়ন্ত্রণ, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও পানি, দ্রুত কাস্টমস ছাড় এবং বন্ডেড ওয়্যারহাউসের সুবিধা দরকার। এ ধরনের কারখানা স্থাপনে ২০ থেকে ৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রয়োজন হতে পারে। এই বিনিয়োগের আগে বাজার, সরবরাহব্যবস্থা, দক্ষ জনবল ও বিদেশি অংশীদারদের আগ্রহ যাচাই করতে হবে।
ফ্যাব্রিকেশন সবচেয়ে ব্যয়বহুল ধাপ। একটি আধুনিক ফ্যাব স্থাপনে ১৫ থেকে ২০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগের প্রয়োজন হতে পারে। এ ধরনের প্রকল্পে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, বিপুল পরিমাণ পানি ও বিদ্যুৎ, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন এবং স্থিতিশীল নীতি অপরিহার্য।
বিনিয়োগে বাধা ও প্রতিযোগিতা
খরচ কম হলেও বিদেশিরা বাংলাদেশকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেন কেন? এমন প্রশ্নে মোহাম্মদ এনায়েতুর রহমান বলেন, ‘সেমিকন্ডাক্টরে একটি ভুল নকশার খেসারত হতে পারে মিলিয়ন ডলার। এই খাতে সার্ভার এক মুহূর্তের জন্যও বন্ধ হওয়ার সুযোগ নেই, বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার সুযোগও নেই। তাই ক্লায়েন্টরা খরচের চেয়ে নিরাপত্তা, গোপনীয়তা ও ধারাবাহিকতাকে বেশি গুরুত্ব দেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে সাইবার নিরাপত্তার বর্তমান পরিস্থিতি বেশ উদ্বেগজনক। এর সঙ্গে রাজনৈতিক অস্থিরতা, ইন্টারনেট বিভ্রাট এবং বিদ্যুৎসংকট যোগ হওয়ায় বিদেশি বিনিয়োগকারীরা স্বাভাবিকভাবেই একধরনের অস্বস্তিতে থাকেন। তাদের কাছে আমাদের নকশা বা ডিজাইন কেবল একটি সাধারণ ফাইল নয়, বরং তাদের ব্যবসার মূল ভিত্তি বা প্রাণ। এ কারণে এখানে কাজের খরচ কম হলেও বিদ্যমান ঝুঁকির কারণে তাদের মনের সংশয় সহজে কাটে না।’
‘এই ধারণা ভাঙতে আমাদের নিজেদের নিরাপত্তাব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানের করতে হবে, আর বিকল্প বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি দূতাবাসগুলোর মাধ্যমে কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা চালালে সরকারের পক্ষ থেকে বিদেশি কোম্পানিগুলোকে আস্থা দেওয়া সম্ভব। বড় কোম্পানিগুলো এ দেশে তাদের হাব খুললে বহু মানুষের কর্মসংস্থান হবে। সে সুযোগ কাজে লাগাতে হলে আগে আস্থা তৈরি করতে হবে।’
বাংলাদেশকে প্রতিযোগিতায় নামতে হবে
তথ্যপ্রযুক্তি ও প্রকৌশল খাতে বিশ্ববাজারে নিজের অবস্থান তৈরি করতে বাংলাদেশকে বর্তমানে ভারত, মালয়েশিয়া ও ভিয়েতনামের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হবে। এসব দেশে উন্নত শিল্প অবকাঠামো, আকর্ষণীয় বিনিয়োগ-প্রণোদনা এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থার সুদৃঢ় নেটওয়ার্ক ইতোমধ্যে বেশ শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত। সেই তুলনায় বাংলাদেশের মূল শক্তির জায়গা হলো তরুণ জনবলের প্রাচুর্য এবং প্রকৌশলীদের কাজের ব্যয় তুলনামূলক কম। তবে বর্তমান বৈশ্বিক বাজারে শুধু কম খরচের সুবিধা দিয়ে আন্তর্জাতিক গ্রাহকদের দীর্ঘ মেয়াদে ধরে রাখা সম্ভব নয়। প্রতিযোগিতায় টিকে থেকে বিশ্বস্ততা অর্জন করতে হলে বাংলাদেশকে অবশ্যই কাজের আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নির্ধারিত সময়ে সেবা সরবরাহ, তথ্যের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা এবং মেধাস্বত্ব সুরক্ষার মতো বিষয়গুলোতে শতভাগ আইনি ও বাস্তবসম্মত নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে।
বিনিয়োগকারীদের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, উচ্চগতির তথ্য সংযোগ, দ্রুত কাস্টমস ছাড় ও প্রয়োজনীয় আমদানি সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ। চিপ ডিজাইন প্রতিষ্ঠানের জন্য বিশেষায়িত সফটওয়্যার ও যন্ত্রপাতি আমদানির প্রক্রিয়া সহজ করা দরকার। একই সঙ্গে একক সেবাকেন্দ্র, সেমিকন্ডাক্টর খাতের জন্য সুস্পষ্ট নীতিমালা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রণোদনার ধারাবাহিকতা প্রয়োজন। হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ, আইসিটি বিভাগ, বিডা, বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব স্পষ্ট না হলে উদ্যোগগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে।
অর্থায়নও বড় চ্যালেঞ্জ। দেশীয় শিল্পগোষ্ঠীর বিনিয়োগ, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ এবং ভেঞ্চার ক্যাপিটাল–সব উৎস বিবেচনায় নিতে হবে। বিশেষ তহবিল ও গবেষণা অনুদান নতুন চিপ ডিজাইন প্রতিষ্ঠানকে ব্যয়বহুল লাইসেন্স, প্রশিক্ষণ ও প্রাথমিক গবেষণার খরচ সামলাতে সহায়তা করতে পারে। তবে অর্থায়নের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক গ্রাহক পাওয়ার সক্ষমতা এবং ব্যবসায়িক আস্থা তৈরি করাও জরুরি।
নীতির বাস্তবায়ন
শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আস্থা বাড়াতে নীতি ঘোষণা ও তার বাস্তব প্রয়োগের মধ্যকার ব্যবধান দূর করতে হবে। বিশেষ করে ব্যবসার অনুমোদন পাওয়ার সময়সীমা, প্রযোজ্য কর ও শুল্ক সুবিধা এবং মেধাস্বত্ব লঙ্ঘনের আইনি প্রতিকারের মতো বিষয়গুলোতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক মানের তথ্যনিরাপত্তাব্যবস্থা ও প্রয়োজনীয় সনদ অর্জনে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নীতিগত সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে সরকারি সংস্থাগুলোর কাজে গতি আনতে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব, সময়সীমা ও অগ্রগতি প্রকাশের ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। এতে যেমন নীতির কার্যকারিতা পরিমাপ করা সহজ হবে, তেমনি সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীরাও ঝুঁকি মূল্যায়নের জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্য পাবেন।
সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হবে
বাংলাদেশের সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের সামনে সুযোগ আছে, কিন্তু তা নিশ্চিত সাফল্য নয়। প্রথম দুই বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিএলএসআই ল্যাব, ইডিএ সফটওয়্যারের ব্যবহার এবং হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণে জোর দেওয়া যেতে পারে। পরবর্তী তিন থেকে পাঁচ বছরে এটিএমপি বিনিয়োগের জন্য অবকাঠামো ও নীতিগত প্রস্তুতি নিতে হবে। দীর্ঘ মেয়াদে ফ্যাব্রিকেশনের মতো বড় প্রকল্প বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে তার আগে দক্ষ জনবল, রপ্তানি সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের ভিত্তি গড়ে তোলা জরুরি।
২০৩০ সালের মধ্যে ১ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয়ের লক্ষ্য অর্জন করতে হলে ঘোষণার চেয়ে বাস্তবায়নের অগ্রগতি গুরুত্বপূর্ণ। কত প্রকৌশলী প্রশিক্ষিত হলেন, কত প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক গ্রাহক পেল, কত বিনিয়োগ এল এবং রপ্তানি আয় কত বাড়ল–এসব সূচকে অগ্রগতি নিয়মিত পরিমাপ করতে হবে। সঠিক নীতি, দক্ষ জনবল ও ধারাবাহিক বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে সেমিকন্ডাক্টর খাত বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
