রাজধানী ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরাতে মরিয়া সরকার। নগরে চালু থাকা ৯৮টি সচল রুটকে পুনর্বিন্যস্ত করে ৩২টি রুটে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা চলছে। একই সঙ্গে ঝিমিয়ে পড়া ‘বাস রুট র্যাশনালাইজেশন’ প্রকল্পকে গতি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর আওতায় ঢাকা আঞ্চলিক পরিবহন কমিটিতে (আরটিসি) ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের একচ্ছত্র আধিপত্য এবার খর্ব করা হচ্ছে।
সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ঢাকার কোনো সড়কে একাধিক কোম্পানির বাস চলবে না। বাস পরিচালনার জন্য বেসরকারি মালিকদের নির্দিষ্ট কোম্পানির অধীনে আসতে হবে তবে বাস্তবতা বলছে, নগরে এক রুটের ওপর দিয়ে আরেক রুট চলে যাওয়ায় (রুট ওভারল্যাপিং) এই ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক বাস পরিচালনার পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে পারে।
রুট পারমিটে অসংলগ্নতা
বাস রুট পুনর্বিন্যাস না হওয়াকে ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক বাস পরিচালনার উদ্যোগ বাস্তবায়নে বড় বাধা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। ঢাকায় রুট পারমিট দেওয়ার দায়িত্বে রয়েছে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ), বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এবং ঢাকা আঞ্চলিক পরিবহন কমিটি (আরটিসি)। এক কমিটির সঙ্গে অন্য কমিটির কার্যকর সমন্বয় না থাকায় সংকটের আবর্ত থেকে বের হতে পারছে না রাজধানীর বাস রুট ব্যবস্থাপনা।
আরও পড়ুন
রাজধানীতে বাস রুট বিন্যাসের মূল দায়িত্ব ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ)। কিন্তু পরিবহনের মালিকরা এই কর্তৃপক্ষের কোনো সিদ্ধান্ত মানতে নারাজ। এদিকে রাজধানী বাদে সারা দেশে এই দায়িত্ব বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ)। অসাধু বাসমালিকরা বিআরটিএর কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশ করে সিলিং নম্বর, রুট পারমিট নিয়ে মিথ্যা তথ্য দিয়ে যখন যেমন খুশি বাস রুটের অনুমোদন নিয়ে নিচ্ছেন।
শুধু বিআরটিএর হস্তক্ষেপই নয়, সংকট আরও বাড়িয়েছে ঢাকা আঞ্চলিক পরিবহন কমিটি (আরটিসি)। সেই কমিটিতে পরিবহন খাতসংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা রয়েছেন। তবে বাস রুট নির্ধারণ করেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। অভিযোগ রয়েছে, ডিটিসিএর আপত্তির পরেও আরটিসি বাসমালিকদের অযাচিতভাবে রুট পারমিট দিচ্ছে। এখানে বড় অঙ্কের টাকা ঘুষ লেনদেনের গুরুতর অভিযোগও রয়েছে।
আরও পড়ুন
ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক বাস চলাচল
রাজধানীতে ৯৮টি সচল রুটে কোন কোম্পানির কতসংখ্যক বাস চলছে (সিলিং নম্বর), এই বাসগুলোর প্রকৃত মালিক কারা, মালিকরা ঠিকমতো কর পরিশোধ করছেন কি না কিংবা এসব বাসের ফিটনেস, রুট পারমিট আদৌ আছে কি না–এসব প্রশ্ন উঠেছে বারবার।
২০২২ সালে রাজধানীর মোহাম্মদপুর থেকে গুলিস্তান পর্যন্ত ঢাকা নগর পরিবহনের আওতায় সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক বাস পরিচালনা করা হয়। তবে পরিকল্পনা মাফিক এই রুটে বাস চলতে পারেনি এক বছরও। বেসরকারি বাসমালিকদের দৌরাত্ম্যে ‘ঢাকা নগর পরিবহন’ চলতে পারেনি। বেসরকারি বাসমালিকদের অজুহাত ছিল, কোম্পানিভিত্তিক বাস চালাতে গিয়ে তাদের আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। একই কারণ দেখিয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) তাদের সব বাস এই রুট থেকে প্রত্যাহার করে নেয়।
গুলিস্তান-মিরপুর রুটের বিহঙ্গ পরিবহন, বিকল্প পরিবহন; মতিঝিল-মোহাম্মদপুর রুটের মিডলাইন পরিবহন, যাত্রাবাড়ী-টঙ্গী রুটের তুরাগ পরিবহনের বাসমালিক ও চালকদের সঙ্গে কথা বলেন খবরের কাগজের প্রতিবেদকরা। কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনার আগে তারা লাভের অঙ্ক বুঝে নিতে চান। যদি তাদের আশ্বস্ত করা যায় যে, দ্বিগুণ লাভ হবে, কেবল তখনই তারা ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক বাস পরিচালনায় যোগ দিতে রাজি হবেন।
গুলিস্তান থেকে শহরতলির উদ্দেশে মিনিবাস পরিচালনা করেন–এমন একটি বাস মালিক সমিতির নেতা আলমগীর হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘বলা হচ্ছে, একটা রুটে শুধু এক কোম্পানির বাস চলবে। কিন্তু ঢাকায় এক রুটের ওপর দিয়ে আরও ৪-৫টা রুট চলে যায় (রুট ওভারল্যাপিং)। সেটা তো কখনো সমাধান করা যাবে না। এক রুটে এক কোম্পানির ধারণাটা ভুল। সব বাসমালিক স্বতন্ত্রভাবে বাস পরিচালনা করতে চান। নির্দিষ্ট কোম্পানির অধীনে গেলে কতটা শেয়ার (লভ্যাংশ) পাবে, জরুরি মুহূর্তে কোনো ঋণ বা অনুদান পাওয়া যাবে কি না, বাসের জরুরি মেরামত করতে গেলে কী করতে হবে, তা আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়। কর্তৃপক্ষ যদি লাভের অঙ্ক আমাদের বোঝাতে না পারে, তবে কোম্পানির অধীনে আমরা যাব না।’
সচল রুটের সংখ্যা ৩২টিতে নামিয়ে আনা হবে
রাজধানীর ৯৮টি সচল বাস রুট পুনর্বিন্যস্ত করে ৩২টিতে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। আগামী বছরের এপ্রিল-মে মাসের মধ্যে ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট কোম্পানির বাস পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আরটিসি কমিটি খেয়ালখুশিমতো যেন বাস রুটের অনুমোদন দিতে না পারে, সে জন্য এবার সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগকে রুট বিন্যাসের কর্তৃত্ব দেওয়া হয়েছে।
রুট বিন্যাসের আলোচনায় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে ঢাকার চারপাশে বৃত্তাকার পথ (সার্কুলার বাস রুট) নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এই বৃত্তাকার পথের নকশা আগেই দিয়েছিল বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ (বিবিএ)। তাই বৃত্তাকার বাস রুটের প্রস্তাব আপাতত স্থগিত থাকছে।
বেসরকারি বাসমালিকদের সহজ শর্তে ছাড় নয়
আধুনিক নগর পরিবহনব্যবস্থা বাস্তবায়নে সরকার এবার বেসরকারি বাসমালিকদের ছাড় দিতে নারাজ। আগামী দুই মাসের মধ্যে বাসমালিকদের নিজ উদ্যোগে সব বাসের প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ মেরামত, ডেন্টিং ও পেইন্টিং সম্পন্ন করার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত দুই মাসের মধ্যে যেসব বাস মেরামত বা সংস্কার করা হবে না, সেগুলো ঢাকা মহানগরে চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হবে এবং আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ সিদ্ধান্তে নড়েচড়ে বসেছে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। নগর পরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে ও ফিটনেসবিহীন গাড়ি বন্ধে ১৬ সদস্যের একটি তদারকি টিম গঠন করা হয়েছে গত ১০ অক্টোবর। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট স্টপেজে গাড়ি থামানো এবং যাত্রী ওঠানামা নিশ্চিত করার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করবে সংগঠনটি।
নগরে যত্রতত্র বাস থামিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সুযোগ বন্ধে আধুনিক বাস স্টপেজ ব্যবস্থার ওপর জোর দিচ্ছে সরকার। এখন যেসব বাস স্টপেজ আছে, সেগুলোর বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় আধুনিকায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনকে। অথচ ডিটিসিএর পক্ষ থেকে সেই তালিকা অনেক আগেই ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনকে দেওয়া হয়েছিল। তা নিয়ে খবরের কাগজেও নানা অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। গত বছরের জানুয়ারিতে ডিটিসিএ ট্রাফিক সার্ভের পরে বাস স্টপেজের সার্বিক চিত্র তুলে ধরেছিল। কিন্তু সেই প্রতিবেদনের তোয়াক্কা করেনি ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন।
দুই সিটি করপোরেশনের পরিবহন বিভাগে যোগাযোগ করা হলে তারা জানায়, ডিটিসিএর জরিপের তথ্য তাদের কাছে নেই।
বাস করিডরকে প্রাধান্য দিতে হবে: অধ্যাপক সাইফুন নেওয়াজ
বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সাইফুন নেওয়াজ বলেছেন, সরকার যত পরিকল্পনাই গ্রহণ করুক না কেন, নগরে বাস রুটকে প্রাধান্য না দিলে নগর পরিবহনব্যবস্থাই ধসে পড়বে।
তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা যতই মেট্রোরেল, মনোরেল ডিজাইন করি না কেন, আমাদের বাস করিডরকেই প্রাধান্য দিতে হবে। নগরের রাস্তায় বাস চলাচলের জন্য মাত্র ৭ শতাংশ জায়গা ফাঁকা থাকে। বাকিটা জুড়ে চলে ব্যক্তিগত যান, ব্যাটারিচালিত নানা অবৈধ যান। আর সড়কে দখলদারত্ব তো চলছেই। আমরা বাসকে যদি র্যাপিড ট্রান্সপোর্ট করতে না পারি, যদি বাসের জন্যই নির্ধারিত লেন করতে না পারি, তবে কোনো পরিকল্পনাই আসলে সফল হবে না।’
