গর্ভাবস্থায় মায়ের শরীরে থাইরয়েড হরমোনের মাত্রা স্বাভাবিক থাকা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ শিশুর মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশে এই হরমোন ভূমিকা রাখে। হরমোনের মাত্রা কম বা বেশি হলে মা ও শিশু উভয়ের জটিলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা করানো প্রয়োজন।
থাইরয়েড কী?
থাইরয়েড গলার সামনের দিকে অবস্থিত একটি প্রজাপতি আকৃতির গ্রন্থি। এটি থাইরক্সিন (টি-৪) ও ট্রাইআয়োডোথাইরোনিন (টি-৩) নামের হরমোন তৈরি করে। শরীরের বিপাকক্রিয়া, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও বিভিন্ন অঙ্গের স্বাভাবিক কার্যক্রমে এসব হরমোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মস্তিষ্কের পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত থাইরয়েড স্টিমুলেটিং হরমোন (টিএসএইচ) থাইরয়েড গ্রন্থিকে হরমোন তৈরির সংকেত দেয়। রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে শরীরে এসব হরমোনের মাত্রা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। প্রাথমিক পরীক্ষায় সাধারণত রক্তে টিএসএইচের মাত্রা দেখা হয়। পরীক্ষার ফলাফল ও শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসক টি-৩, টি-৪ বা অন্য পরীক্ষার পরামর্শ দিতে পারেন।
গর্ভাবস্থায় থাইরয়েডের মাত্রা স্বাভাবিক থাকা কেন জরুরি?
গর্ভের শিশুর মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশে থাইরয়েড হরমোন অপরিহার্য। গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে শিশু মূলত মায়ের শরীর থেকে পাওয়া থাইরয়েড হরমোনের ওপর নির্ভর করে। তাই এ সময় মায়ের শরীরে হরমোনের ঘাটতি থাকলে শিশুর বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
থাইরয়েড হরমোনের মাত্রা দীর্ঘ সময় ধরে অস্বাভাবিক থাকলে গর্ভপাত, সময়ের আগে সন্তান জন্ম, কম ওজনের শিশু জন্ম এবং মৃতপ্রসবের ঝুঁকি বাড়তে পারে। পাশাপাশি মায়ের উচ্চ রক্তচাপ, রক্তশূন্যতা ও অন্যান্য জটিলতাও দেখা দিতে পারে। তবে যথাযথ চিকিৎসার মাধ্যমে হরমোনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তাই রোগ শনাক্ত করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা শুরু করা গুরুত্বপূর্ণ।
কখন পরীক্ষা করাবেন?
গর্ভাবস্থার প্রথম দিকেই চিকিৎসকের সঙ্গে থাইরয়েড পরীক্ষা প্রয়োজন কি না, তা নিয়ে আলোচনা করা উচিত। যাঁদের আগে থেকেই থাইরয়েডের সমস্যা রয়েছে, থাইরয়েডের ওষুধ খেতে হয় কিংবা পরিবারে এ রোগের ইতিহাস আছে, তাঁদের বিশেষ নজরদারিতে রাখা প্রয়োজন। পরীক্ষার ফলাফল ও চিকিৎসার ধরন অনুযায়ী পরে আবারও রক্ত পরীক্ষা লাগতে পারে।
গর্ভাবস্থায় টিএসএইচের স্বাভাবিক মাত্রা গর্ভকালীন পর্যায় ও পরীক্ষাগারের নির্ধারিত সীমার ওপর নির্ভর করে। তাই রিপোর্টের একটি সংখ্যা দেখেই নিজে থেকে রোগ নির্ণয় করা বা ওষুধ পরিবর্তন করা উচিত নয়। চিকিৎসক গর্ভাবস্থার সময়কাল, উপসর্গ ও অন্যান্য পরীক্ষার ফলাফল বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন।
থাইরয়েডের সমস্যা দুই ধরনের
হাইপোথাইরয়েডিজম: এ অবস্থায় থাইরয়েড হরমোনের উৎপাদন প্রয়োজনের তুলনায় কম হয়। অনেক ক্ষেত্রে টিএসএইচের মাত্রা বেড়ে যায়। চিকিৎসা না হলে গর্ভের শিশুর বিকাশ এবং মায়ের স্বাস্থ্যে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
হাইপারথাইরয়েডিজম: এ ক্ষেত্রে থাইরয়েড হরমোনের উৎপাদন অতিরিক্ত বেড়ে যায়। টিএসএইচ কমে যেতে পারে এবং টি-৩ বা টি-৪ বেড়ে যেতে পারে। নিয়ন্ত্রণে না থাকলে মায়ের উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্যন্ত্রের সমস্যা ও সময়ের আগে সন্তান জন্মের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
কীভাবে পরীক্ষা করা হয়?
থাইরয়েড পরীক্ষা সাধারণত হাতের শিরা থেকে অল্প রক্ত নিয়ে করা হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে টিএসএইচ পরীক্ষার জন্য বিশেষ প্রস্তুতির প্রয়োজন হয় না। তবে একই দিনে অন্য পরীক্ষা থাকলে সেগুলোর জন্য আলাদা প্রস্তুতি লাগতে পারে। নিয়মিত কোনো ওষুধ খেলে বা সম্প্রতি আয়োডিনযুক্ত কনট্রাস্ট ডাই দিয়ে পরীক্ষা করালে চিকিৎসককে জানানো উচিত।
গর্ভাবস্থায় থাইরয়েডের সমস্যা শনাক্ত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ বন্ধ করা বা মাত্রা পরিবর্তন করা বিপজ্জনক হতে পারে। প্রয়োজনে গাইনি বিশেষজ্ঞের পাশাপাশি হরমোন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।
গর্ভাবস্থায় থাইরয়েডের সমস্যা থাকলেই মা বা শিশুর জটিলতা হবে, এমন নয়। সময়মতো পরীক্ষা, সঠিক চিকিৎসা ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
বিআলো/শিলি