খাওয়ার পর রক্তে শর্করার মাত্রা কতটা বাড়বে, তা নির্ভর করে কী খাচ্ছেন, কতটা খাচ্ছেন এবং শরীরের বিপাকক্রিয়া কেমন, তার উপর। কিন্তু খাওয়ার সময় পাশে কে রয়েছে, তারও কি কোনও ভূমিকা থাকতে পারে?
সাম্প্রতিক এক গবেষণা সেই সম্ভাবনার দিকেই ইঙ্গিত করছে। গবেষকদের পর্যবেক্ষণ, একা খাওয়ার তুলনায় প্রিয় সঙ্গীর সঙ্গে খেলে খাওয়ার পর রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা তুলনায় কম বাড়তে পারে। সায়েন্স অ্যাডভান্সেস পত্রিকায় প্রকাশিত গবেষণাটিতে খতিয়ে দেখা হয়েছে, ঘনিষ্ঠ মানুষের সান্নিধ্য শরীরের স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ায় কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
একই খাবার, বদল শুধু সঙ্গীতে
গবেষণায় অংশ নিয়েছিলেন ১০৮ জন, অর্থাৎ, ৫৪ যুগল। প্রত্যেককে দু’বার একই ধরনের নির্দিষ্ট পরিমাণ কার্বোহাইড্রেট-সমৃদ্ধ খাবার খেতে দেওয়া হয়। একবার একা এবং অন্যবার নিজের প্রেমিকের সঙ্গে। খাবারে ছিল ১০২ গ্রাম সাদা গমের পাউরুটি। অর্থাৎ, খাবারের ধরন ও পরিমাণ একই রেখে দুই পরিস্থিতিতে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রার তুলনা করেন গবেষকরা।
দেখা যায়, সঙ্গীর সঙ্গে খাওয়ার ক্ষেত্রে, খাবারের দু’ঘণ্টা পর রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা একা খাওয়ার তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ কম ছিল। পাশাপাশি, সঙ্গীর উপস্থিতিতে রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধির হারও তুলনায় কম দেখা যায়। গ্লুকোজের মাত্রা আগের অবস্থায় ফিরে আসার প্রক্রিয়াও ছিল দ্রুততর।
খাওয়ার সময়, বডি মাস ইনডেক্স (বিএমআই) এবং মানসিক চাপের মতো বিষয়গুলিও বিবেচনায় রেখেছিলেন গবেষকরা। তার পরেও এই সম্পর্কের ইঙ্গিত বজায় ছিল। তবে এই ফলাফল থেকে বলা যায় না যে, সঙ্গীর সঙ্গে খেলেই প্রত্যেকের রক্তে শর্করা কম বাড়বে।

শুধু শর্করা নয়, প্রভাব অন্য ক্ষেত্রেও
গবেষণাটি শুধু রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়েই সীমাবদ্ধ ছিল না। শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং মানসিক চাপের প্রতিক্রিয়াও পরীক্ষা করেন গবেষকরা। তাঁদের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ঠান্ডার মধ্যে কাছের মানুষের উপস্থিতি শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে এবং মানসিক চাপের প্রতিক্রিয়া কমাতে পারে। মা ও শিশুর যুগলকে নিয়ে করা পরীক্ষাতেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গিয়েছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয়, এই প্রভাবের জন্য শারীরিক স্পর্শ অপরিহার্য নয়। অর্থাৎ, ঘনিষ্ঠ মানুষের উপস্থিতিই শরীরের কিছু স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকরা।
কেন এমন প্রভাব পড়ে?
এর পিছনে সুনির্দিষ্ট জৈবিক প্রক্রিয়া এখনও স্পষ্ট নয়। গবেষকদের অনুমান, ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মধ্যে বেড়ে ওঠার ফলে মস্তিষ্কের শক্তি ও শরীরের বিভিন্ন কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণকারী ব্যবস্থার সঙ্গে সামাজিক পরিবেশের যোগ তৈরি হতে পারে। তবে ইনসুলিনের ক্ষরণ, ইনসুলিনের কার্যকারিতা, হরমোন এবং স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্রের ভূমিকা বুঝতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
সিঙ্গাপুরে প্রায় ১২০০ জন প্রাপ্তবয়স্কের ২০,৬২৯টি খাবারের তথ্য বিশ্লেষণ করেও দেখা গিয়েছিল, একা খাওয়ার তুলনায় বন্ধুদের সঙ্গে খেলে খাওয়ার পর রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কম থাকতে পারে। তবে সেই গবেষণায় মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাস পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল। এই গবেষণায় একই ব্যক্তির ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতিতে একই খাবারের প্রতিক্রিয়া তুলনা করা হয়েছে। ফলে দু’টি গবেষণার পদ্ধতি এক নয়।

সঙ্গত অভ্যাস, চিকিৎসার বিকল্প নয়
প্রিয়জনের সঙ্গে খাওয়াকে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের কোনও প্রমাণিত পদ্ধতি হিসেবে না দেখাই ভালো। সুষম খাবার, নিয়মিত শরীরচর্চা, চিকিৎসকের পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের কোনও বিকল্পও এটি নয়।
তবে শরীরের সুস্থতা যে শুধু খাবার, ব্যায়াম বা ওষুধের উপরই নির্ভর করে না, সামাজিক পরিবেশও তাতে ভূমিকা রাখতে পারে, এই গবেষণা সেই সম্ভাবনাকে সামনে এনেছে। প্রিয়জনের সঙ্গে এক টেবিলে বসে খাওয়ার মানসিক স্বস্তির পাশাপাশি শরীরের বিপাকক্রিয়াতেও কোনও প্রভাব পড়ে কি না, তা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণার প্রয়োজন।
